রবিবার, জানুয়ারি ১১, ২০২৬
হোমমতামতউপ-সম্পাদকীয়প্রকৃতার্থে ফকির কারা

প্রকৃতার্থে ফকির কারা

সম্পর্কিত সংবাদ

ফকির শব্দটি দুটি ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়-আধ্যাত্মিক অর্থে যিনি ঈশ্বরের প্রতি সম্পূর্ণ নিবেদিত, এবং সাধারণ অর্থে যিনি দরিদ্র বা ভিক্ষুক। ফকির বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়, যিনি সর্বত্যাগী, পৃথিবীর ভোগবাদ তাকে স্পর্শ করতে পারে না।

ফকিররা প্রতিষ্ঠাকামী নন, বরং বিনীত, অকৃত্রিম ও অনাড়ম্বর। সবকিছু ত্যাগ করলেই একমাত্র ফকির হওয়া যায়। আসল ফকিরীর মতে বাহ্য আলাপ থাকে না-অর্থাৎ তার সবটাই অন্তর্জগতের বিষয়, ধ্যানময় ও নীরবতালব্ধ

ফকির আরবি শব্দ ফাক্ র (দারিদ্র্য) থেকে উৎপত্তি হয়েছে। এর দুটি প্রধান অর্থ রয়েছে-প্রথমত, যিনি নিজের পার্থিব সম্পদ ত্যাগ করে পরমাত্মার ধ্যানে ও জ্ঞানলাভের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন, এমন সুফি সাধক বা সন্ন্যাসী। তবে সব সুফি সাধকই ফকির নন।

ভিক্ষুককেও অনেকে ফকির বলে থাকেন, কিন্তু যারা নিঃস্ব ও ভিক্ষা করে জীবন নির্বাহ করেন, তারা ভিক্ষুক। সমাজে ভিক্ষুক ও ফকিরকে এক করে ফেলা হচ্ছে। ফারসি ‘দরবেশ’ শব্দটিও ফকির শব্দের সমার্থক। তবে সুফি সাধক ও সন্ন্যাসী কেউ কেউ ফকির হতে পারেন, কিন্তু সব সুফি বা সন্ন্যাসী ফকির নন।

ফকিররা সব সময় বাস্তবতায় বিশ্বাসী। তারা মনে করেন, প্রদর্শনবাদ প্রকৃত ধর্ম নয়; পরিপূর্ণ মানবতাই হলো প্রকৃত ধর্ম। ফকিররা বলেন, “নিজেই নিজের ত্রাণকর্তা বা মুক্তিদাতা। নিজে ব্যতীত অন্য কেউ জীবনের পাপ মোচন করবে না, তাই নিজের পাপ নিজেকেই মোচন করতে হবে।” তারা আরও বলেন, “আত্মদীপ প্রজ্বালন করো-নিজের শরণই অনন্য শরণ।”

ফকিররা মনে করেন, মানুষ তার কর্মফলের জন্যই সুখ-দুঃখ ভোগ করে। আবার অন্যভাবে বলা যায়, ফকির শব্দের মানে হলো সর্বহারা-যার কিছুই নেই, এমন হতদরিদ্র ব্যক্তি। এর বহুবচন আরবিতে ফুকারা।

ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক প্রেরণায় কিছু মানুষ সন্ন্যাসী হয়ে যান; দুনিয়ার কোনো ধনসম্পদ তারা চান না। গরিবীয়ানা জীবনযাপনে তাদের কোনো গ্লানি নেই। তবে সব ধর্মেই পার্থিব মোহত্যাগী মানুষ আছে। ফকিররা সমাজকে ধর্মের গোঁড়ামি থেকে মুক্ত করতে চান। তাছাড়া তারা বোঝাতে চেয়েছেন, সম্পদ, লোভ ও কামবাসনাই দুনিয়ার সকল হানাহানির মূল কারণ।

বাংলায় ফকির বলতে মূলত একজন সন্ন্যাসী, সাধু পুরুষ বা দরবেশকে বোঝায়। ফকির শব্দটি মুসলিম ধর্মে ব্যবহার হলেও ভারতীয় উপমহাদেশে এটি গোস্বামী, সাধু, ভিক্ষুক এবং অন্যান্য উপাধির মতো হিন্দু তপস্বী ও রহস্যবাদীদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হয়েছে।

ধর্মের বাহ্য আচার-অনুষ্ঠানে ফকিরদের তেমন আস্থা নেই। লোকদেখানো ধর্মীয় ক্রিয়াকলাপ তাদের অপছন্দ। ফকিররা আত্মমগ্ন, উদাসীন ও আত্মতৃপ্ত। তাদের পার্থিব জগতে বিলাসী জীবনযাপনের বাসনা নেই। উপাস্যকে তারা অন্তরে চান, তাই পার্থিব কিছু চান না।

ফকিররা প্রতিষ্ঠাকামী নন, বরং বিনীত, অকৃত্রিম ও অনাড়ম্বর। সবকিছু ত্যাগ করলেই একমাত্র ফকির হওয়া যায়। আসল ফকিরীর মতে বাহ্য আলাপ থাকে না-অর্থাৎ তার সবটাই অন্তর্জগতের বিষয়, ধ্যানময় ও নীরবতালব্ধ।

‘শাহ’ শব্দটি একটি নির্দিষ্ট বংশ বা পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে ব্যবহৃত হয়। শাহ শব্দটি তাদের বংশপরিচয়ের ইঙ্গিত দেয়, যারা উল্লিখিত ফকিরদের পরম্পরা থেকে এসেছেন। ফকির থেকে আগত মানুষরাই নামের সঙ্গে ‘শাহ’ ব্যবহার করেন। তাই অনুমান করা যায়, এই বংশ এসেছে ঐ ফকির গোত্রীয় মানুষদের মধ্য থেকে।

ফকিররা ঐতিহাসিকভাবে তাদের নামের সঙ্গে ‘শাহ’ ব্যবহার করে আসছেন। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় ফকির সম্প্রদায় রয়েছে। শাহ শব্দটি হিন্দু তপস্বীদের (যেমন সাধু, গুরু, স্বামী এবং যোগী) ক্ষেত্রেও ব্যবহার হতে দেখা যায়। শাহ শব্দটির ব্যবহার মূলত ভারতীয় উপমহাদেশে মুঘল যুগে বিকশিত হয়েছিল।

উত্তর ভারতে ফকিরদের একটি স্বতন্ত্র গোষ্ঠী পাওয়া যায়, যারা সুফি মাজারে বসবাসকারী ফকির সম্প্রদায় থেকে এসেছেন। সকল ধর্মমতে ‘ফকির’ শব্দটি সাধারণত সংসারত্যাগী, আধ্যাত্মিক সাধক বা তপস্বীকে বোঝায়, যারা জাগতিক জীবনের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করে আধ্যাত্মিকতার গভীরে ধ্যানে রত থাকেন।

ইসলামে ফকির বলতে সুফি মুসলিম তপস্বীদের বোঝানো হয়, যারা জাগতিক সম্পদ ত্যাগ করে আল্লাহর উপাসনায় জীবন উৎসর্গ করেন। হিন্দু ধর্মে যোগী বা সন্ন্যাসী সম্প্রদায়কে অনেকেই ফকির বলেন-যারা জাগতিক জীবন ত্যাগ করে আধ্যাত্মিক পথে চলেন।

‘ফকির’ শব্দটি তাই সাধারণ অর্থে এমন ব্যক্তিকে বোঝায়, যিনি সংসার ও জাগতিক জীবন থেকে দূরে থেকে আধ্যাত্মিক সাধনায় মগ্ন থাকেন। এই ধারণাটি সকল ধর্মের তপস্বী বা সন্ন্যাসীদের মধ্যেই দেখা যায়। হিন্দু ধর্মে যারা সংসারত্যাগী বা গৃহবন্ধন থেকে মুক্তি চান, তারা সন্ন্যাসী।

‘ফকির’ বা ‘বাউল’ শব্দ দুটি সাধারণত আধ্যাত্মিক সাধকদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যারা লোকজ ও আধ্যাত্মিক ধারার অনুসারী। লালন শাহ-‘ফকির লালন’, ‘লালন সাঁই’ এবং ‘মহাত্মা লালন’ নামে পরিচিত ছিলেন। বাউলরা বাংলার এক ধরনের আধ্যাত্মিক লোকসংগীত শিল্পী ও সাধক, যারা সুফি ও বৈষ্ণব সহজিয়া দর্শনের সমন্বয়ে আধ্যাত্মিক ও মানবতাবাদী গান পরিবেশন করেন।

অন্যদিকে, ফকির একটি সুফি-ভিত্তিক আধ্যাত্মিক সাধক সম্প্রদায়, যারা মানব জীবনের দর্শন অনুযায়ী আধ্যাত্মিক সাধনা করেন। তবে লালন সাঁই ছিলেন বাউল, কিন্তু তিনি ফকিরও বটে-কারণ মানবতার দর্শনই লালন ফকিরের চিন্তা–চেতনায় গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। তিনি বিশ্বমানবের মধ্যে মানবতার বাণী প্রচার করেছিলেন।

বাউল ও ফকিরের মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, যেখানে অনেক সাধক উভয় পরিচয়ই ধারণ করেন।

প্রকৃত ফকিররা মানবতার বাণী প্রচার করেন, মানবাত্মার মুক্তির জন্য সৎকর্মে উৎসাহ দেন। তারা কোনো তত্ত্বকে হাতিয়ার বানিয়ে মানুষের মন জয় করতে চান না, বা ইন্দ্রজালিক প্রদর্শন করেন না।

তারা বোঝাতে চান, পার্থিব জগতে মোহাবিষ্ট হয়ে মানুষ পাপকর্মে লিপ্ত হয়। ফকিররা কোনো ধর্মের বাণীকে কটাক্ষ করেন না; তারা নিজেদের চিন্তা প্রচার করেন, যা সকল ধর্মের মানুষ ও সমাজের জন্য কল্যাণকর।

[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

সম্প্রতি

আরও খবর