দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে তিনজনের মৃত্যু ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে মারা গেছেন।
ডেঙ্গুতে বরগুনায় সরকারি হিসাবে ১৫ জনের মৃত্যু, বেসরকারি হিসাব বলছে জেলায় অন্তত ৬৫ জন মারা গেছে
বরগুনায় ৮ মাসে আক্রান্ত ছাড়ালো ৯ হাজার, এখন ১০২ জন
হাসপাতালে
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অন্য দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি মাসের প্রথম ছয় দিনে ডেঙ্গুতে ২৯ জনের মৃত্যু হলো।
বৃহস্পতিবার,(০৬ নভেম্বর ২০২৫) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, গতকাল বুধবার সকাল ৮টা থেকে আজ সকাল ৮টা পর্যন্ত ১ হাজার ৩৪ জন রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের হাসপাতালগুলোয় ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হয়েছেন ৩৭১ জন।
দুই সিটির বাইরে ঢাকা বিভাগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ১৮৮। ঢাকার বাইরে বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১৩৪ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। সব মিলিয়ে এবার এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে ৭৬ হাজার ২৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন ৭২ হাজার ৩৮৮ জন।
চলতি বছর এখন পর্যন্ত ৩০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে গত মাসে মারা গেছেন ৮০ জন, যা চলতি বছর এখন পর্যন্ত কোনো এক মাসে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ মৃত্যু। গত মাসে ডেঙ্গু নিয়ে সর্বোচ্চ ২২ হাজার ৫২০ জন দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর আগে সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুতে ৭৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১৫ হাজার ৮৬৬ জন।
চলতি বছরের জুনে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে শুরু করে। ওই সময় অনেক বিশেষজ্ঞ বলেছিলেন, এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ বড় আকারের হতে পারে। কিন্তু সরকার ডেঙ্গু প্রকোপ কমাতে তেমন কোনো জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। গত জুলাই মাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা জুনের দ্বিগুণ হয়ে যায়। আগস্টে মৃত্যু ও সংক্রমণ সামান্য কমে। কিন্তু সেপ্টেম্বরে তা আবার বেড়ে যায়। সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ১৫ হাজার ৮৬৬ জন। অক্টোবরে প্রায় সাত হাজার রোগী বেড়েছে।
এ প্রেক্ষিতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু দমন কেবল সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়,এটিএকটি জনসম্পৃক্ত সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। প্রতিটি পরিবারকে বুঝতে হবে যে তাদের বাসাবাড়ির এক কোণায় জমে থাকাসামান্য পানি থেকেওডেঙ্গুরবিস্তার ঘটতে পারে। এজন্য সিটি করপোরেশন,শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় সংগঠনগুলোরঅংশগ্রহণেনিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে,সপ্তাহে প্রতি শনিবার ১০ মিনিট করে একটি ক্যাম্পেইন চালু করা যেতে পারে। যেখানে প্রত্যেক নাগরিক নিজ নিজবাসা বা কর্মস্থল পরিষ্কার করবেন।এই ভাবে ডেঙ্গু সচেতনতা শিশুদের মধ্যে গড়ে তুলতে হবে শৈশব থেকেই। স্কুলের পাঠ্যক্রমে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও মশা নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্তছোট ছোট অধ্যায় অন্তর্ভুক্তকরা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েপরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ক কোর্স কীটতত্ত্ব অন্তর্ভুক্ত করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বৈজ্ঞানিক ভাবেবিষয়টিবুঝবে এবং সামাজিক নেতৃত্ব দিতে পারবে। ২০০০ সালে ঢাকায় বড় আকারে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়। ওই বছর ৫ হাজার ৫৫১ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এর মধ্যে মারা যান ৯৩ জন। ঘটনাটি সাধারণ মানুষের কাছে নতুন ছিল। ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত ও মারা যান ২০২৩ সালে। সে বছর আক্রান্ত হয়েছিলেন তিন লাখের বেশি মানুষ। মারা যান ১ হাজার ৭০৫ জন।
## ডেঙ্গু আতঙ্ক: বরগুনায় ৮ মাসে আক্রান্ত ছাড়ালো ৯ হাজার, বর্তমানে হাসপাতালে ১০২
ডেঙ্গুর হটস্পট বরগুনায় গত ৮ মাস ধরে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে এডিস মশা। বছরের শুরুতে দেশের সর্বাধিক মানুষ আক্রান্ত হওয়ায় হটস্পট ঘোষিত এ জেলায় এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী জেলায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৯ হাজার ২৯ জন। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন আছেন ১০২ জন।
বরগুনা সিভিল সার্জন অফিসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় বরগুনার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নতুন ভর্তি হয়েছে ১৫ ডেঙ্গু রোগী। বর্তমানে এ হাসপাতালটিতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন আছেন ৫৫ জন। এছাড়া জেলার বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এ নতুন করে আরও ১৪ জন ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে আমতলীতে ২ জন, বামনায় ও বেতাগীতে ৩ জন করে ৬ জন এবং পাথরঘাটা উপজেলায় ৬ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া জেনারেলের হাসপাতাল বাদে জেলার বাকি পাঁচ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে ৪৭ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী চিকিৎসাধীন আছেন।
এ বছর জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বরগুনার বিভিন্ন হাসপাতালে এখন পর্যন্ত চিকিৎসা নিয়েছেন ৯ হাজার ২৯ জন। এদের মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৮ হাজার ৯২৭ জন। আক্রান্ত এসব রোগীদের মধ্যে শুধু বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে এখন পর্যন্ত চিকিৎসা নিয়েছেন ৭ হাজার ৪৪ জন। এবং বাকি পাঁচ উপজেলার বিভিন্ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আরও ১ হাজার ৯৮৫ জন আক্রান্ত রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু আক্রান্ত এবং মৃত্যুর দিক থেকে সদর উপজেলার পর পাথরঘাটা উপজেলার অবস্থান দ্বিতীয়। এ উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৯১০ জন। এদের মধ্যে ওই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে দুইজনের। এছাড়া বরগুনা ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ১২ জন এবং আমতলী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনসহ সরকারি হিসেবে জেলায় মোট ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও অন্তত ৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ বলেন, মার্চ মাসে বরগুনায় ডেঙ্গুর হটস্পট ঘোষণা করার পর বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকার তুলনায় বরগুনা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাখা গেছে। এত সংখ্যক রোগী আক্রান্ত হলেও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাত্র ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে বেসরকারি হিসেবে জেলায় অন্তত ৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।



