মঙ্গলবার, জানুয়ারি ১৩, ২০২৬
হোমখবরনগর-মহানগরতিন দফা দাবিতে সারাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মবিরতি

তিন দফা দাবিতে সারাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মবিরতি

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

সম্পর্কিত সংবাদ

দশম গ্রেডে বেতনসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলনরত সহকারী শিক্ষকদের ওপর ‘পুলিশি হামলার’ প্রতিবাদে রোববার,(০৯ নভেম্বর ২০২৫) দেশজুড়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মবিরতি পালন হয়েছে। আবার অনেক স্কুলে পাঠদানও হয়েছে।

দাবি আদায়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে কাফনের কাপড় হাতে শপথ শিক্ষকদের

বেতন গ্রেড দুই ধাপ বাড়ানোর প্রস্তাব গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের

বছরে অতিরিক্ত ব্যয় হবে ৮৩২ কোটি টাকা

তিন দাবি আদায়ে কাফনের কাপড় হাতে এদিন রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শপথ নিয়েছেন প্রাথমিক শিক্ষকরা। রোববার বিকেল পৌনে ৪টার দিকে কাফনের কাপড় হাতে শিক্ষকরা শপথ নেন- ‘দশম গ্রেড এবং শতভাগ পদোন্নতি ছাড়া ফিরে যাবেন না।’ তারা শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন।

শপথ শেষে শিক্ষক নেতা আনিসুর রহমান আনিস বলেন, ‘একই যোগ্যতা নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দশম গ্রেড পাচ্ছে। কিন্তু আমরা পাচ্ছি ১৩তম গ্রেড।’

তারা ‘পুলিশি হামলার’ প্রতিবাদে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দারের পদত্যাগ দাবি করেছেন।এদিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেড দুই ধাপ বাড়িয়ে ১১তম করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং অর্থ বিভাগে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে সহকারী শিক্ষকদের বর্ধিত গ্রেডে বেতন দিতে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ৮৩১ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যয় হবে।

আটককৃত শিক্ষকরা এখনও শাহবাগ থানায় রয়েছেন দাবি করে আন্দোলনকারীদের প্লাটফর্ম প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুস বলেছেন, আটককৃতরা ফেরেননি। এজন্য অবস্থান কর্মসূচি চলবে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি চালাবেন।

তিনি আরও বলেন, ‘তিন দফা দাবি বাস্তবায়ন না করা, শাহবাগে নিরীহ শিক্ষকদের ওপর অতর্কিত হামলা, রাবার বুলেট, জলকামান, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে শত শত শিক্ষককে আহত করার দায় হিসেবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করছি।’

দশম গ্রেডে বেতন ছাড়াও প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকদের বাকি দুইটি দাবি হলো- চাকরির ১০ ও ১৬ বছরে উচ্চতর গ্রেড পাওয়া নিয়ে জটিলতা নিরসন এবং শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতির নিশ্চয়তা।

এদিকে প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকদের আরেক অংশ ‘প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সংগঠন ঐক্য পরিষদের’ ব্যানারে একাদশ গ্রেডে বেতন, উচ্চতর গ্রেড নিয়ে জটিলতা নিরসন ও শতভাগ পদোন্নতি নিশ্চিত করতে আগামী ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত সরকারকে সময় বেঁধে দিয়েছে। তবে এই সংগঠনের শিক্ষকরা কর্মবিরতি পালন করছেন না।

এই ঐক্য পরিষদের অন্যতম নেতা ঢাকার কেরানীগঞ্জের চারিগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শাহিনুর আল আমিন জানিয়েছেন, তারা স্কুলে কর্মবিরতি পালন করছেন না ।

তিনি জানান, একাদশ গ্রেডে বেতন, পদন্নোতি ও উচ্চতর গ্রেডের জটিলতা নিরসনে ঐক্য পরিষদের আন্দোলন চলমান। ১৫ নভেম্বরের দাবি পূরণ না হলে তাদের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ২৩ ও ২৪ নভেম্বর অর্ধদিবস কর্মবিরতি, ২৫ ও ২৬ নভেম্বর পূর্ণদিবস কর্মবিরতি এবং ২৭ নভেম্বর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করবেন। এই সময়ের মধ্যে দাবি আদায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি বা ঘোষণা না আসলে পরীক্ষা বর্জন এবং ১১ ডিসেম্বর থেকে আমরণ অনশন কর্মসূচি পালন করবেন তারা।

আন্দোলনরত ‘প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ’ মোর্চায় রয়েছে- প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি (কাশেম-শাহিন), প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি (শাহিন-লিপি), প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতি ও সহকারী শিক্ষক দশম গ্রেড বাস্তবায়ন পরিষদ।

দাবি আদায়ে গতকাল শনিবার সকাল থেকে শহীদ মিনারে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন শিক্ষকরা। ওইদিন বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে তারা ‘কলম বিরতি কর্মসূচি’ পালনে মিছিল নিয়ে শাহাবাগের দিকে এগোতে থাকেন। ৪টার দিকে শাহবাগ থানার সামনে তাদের আটকে দেয় পুলিশ।

এ সময় পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড, জলকামান, লাঠি চার্জ, কাঁদুনে গ্যাসে ওই কর্মসূচি প- হয়ে যায়। দেড় শতাধিক শিক্ষক আহত হওয়ার পাশাপাশি পাঁচজনকে পুলিশ আটক করেছে বলে দাবি শিক্ষক নেতাদের।

তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের দাবি, ‘আন্দোলনকারীদের মধ্য থেকে একটা দল ব্যারিকেড ভেঙে শাহবাগ মোড় পার হয়ে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ কয়েক রাউন্ড সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান নিক্ষেপ করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।’

পুলিশের বাধার মুখে শহীদ মিনারে ফিরে এসে রোববার থেকে কর্মবিরতির কর্মসূচি ঘোষণা করেন শিক্ষকরা। এর আগে গতকাল শনিবার গভীররাতে মোমবাতি প্রজ্বালন করে ‘পুলিশের হামলার’ নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

বেতন গ্রেড ১১তম করার প্রস্তাব:

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেড দুই ধাপ বাড়িয়ে ১১তম করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং অর্থ বিভাগে সম্প্রতি প্রস্তাব পাঠিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে সহকারী শিক্ষকদের বর্ধিত গ্রেডে বেতন দিতে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ৮৩১ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যয় হবে।

গত ৪ নভেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে লিখিতভাবে এ প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। এরআগে অর্থ বিভাগেও এ ধরনের প্রস্তাব পাঠানো হয়। সেখানে ব্যয়ের তথ্য তুলে ধরা হয়।

বর্তমানে সহকারী শিক্ষকরা জাতীয় বেতন স্কেলের ১৩তম গ্রেডে বেতন পান। আর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বর্তমান বেতন গ্রেড ১১তম। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে সম্প্রতি রিট আবেদনকারী ৪৫ জন প্রধান শিক্ষকের বেতন গ্রেড এক ধাপ বাড়িয়ে দশম গ্রেডে উন্নীত করা হয়েছে। এর ফলে দেশের সব প্রধান শিক্ষকের বেতন গ্রেড দশম হওয়ার পথ তৈরি হয়। সেই প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।

এর পাশাপাশি সহকারী শিক্ষকদের বেতন ১১ তম গ্রেডে করার বিষয়েও চেষ্টা চালাচ্ছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে শিক্ষকদের আন্দোলন পরিস্থিতি তুলে ধরার পাশাপাশি শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা হওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই মুহূর্তে কর্মরত সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেড ১১তম করলে বছরে অতিরিক্ত খরচ হবে প্রায় ৮৩২ কোটি টাকা। ভবিষ্যতে শূন্য ১৭ হাজারের বেশি পদে শিক্ষক নিয়োগ করা হলে অতিরিক্ত আরও ৫৫ কোটি ২০ লাখ টাকার মতো প্রয়োজন হবে।

জাতীয় বেতন স্কেলে ১০তম গ্রেডে শুরুর বেতন ১৬ হাজার টাকা। বেতন গ্রেড ১১তম হলে শুরুতে মূল বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকা। আর ১৩তম গ্রেডে শুরুতে একজন শিক্ষকের মূল বেতন হয় ১১ হাজার টাকা। এর সঙ্গে বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা যুক্ত হয়।

এর আগে গতকাল শনিবার খুলনায় এক অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বলেন, সহকারী শিক্ষকেরা যাতে ১১তম গ্রেড পেতে পারেন, সেজন্য তারা অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। বেতন কমিশনকেও (নতুন বেতন কমিশন) জানানো হয়েছে।

বর্তমানে সারাদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে ৬৫ হাজার ৫৬৯টি। এগুলোতে মোট শিক্ষার্থী এক কোটি ছয় লাখের মতো। মোট শিক্ষক আছেন পৌনে চার লাখের বেশি। শিক্ষকদের মধ্যে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ আছে তিন লাখ ৬৯ হাজার ২১৬টি। এর মধ্যে কর্মরত সহকারী শিক্ষক আছেন তিন লাখ ৫২ হাজার ২০৮ জন। ১৭ হাজার ৮টি পদ শূন্য রয়েছে।

গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে বলা হয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী সহকারী শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা স্বীকৃতি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ন্যূনতম দ্বিতীয় শ্রেণী বা সমমানের সিজিপিএসহ স্নাতক বা স্নাতক (সম্মান) বা সমমানের ডিগ্রি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা বিভাগ ও দপ্তরের সমমানের যোগ্যতার কর্মকর্তারা ১০তম গ্রেডে বেতন পান। এজন্য সহকারী শিক্ষকরা দীর্ঘদিন যাবৎ তাদের বেতন গ্রেড উন্নীত করার দাবি জানিয়ে আসছেন।

প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের কাজের গুণগত ও পরিমাণগত দিক দিয়ে আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। এছাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের বেতন গ্রেড বাড়িয়ে ১০তম করার বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা সম্মতি দিয়েছেন। তাই যৌক্তিকতা বিবেচনা করে সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেল ১১তম গ্রেডে উন্নীত করা প্রয়োজন।

সম্প্রতি

আরও খবর