পুরান ঢাকার আদালত পাড়ার অদূরে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের ফটকে দিনে-দুপুরে দুর্বৃত্তরা এক সময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকে ফিল্মি কায়দায় গুলি করে হত্যা করেছে।
সোমবার, (১০ নভেম্বর ২০২৫) বেলা ১১টার দিকে এ হত্যাকা- ঘটে বলে ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপ-কমিশনার মল্লিক আহসান সামী সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।
সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যাওয়ার পর গুলিবিদ্ধ মামুনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন বলে মেডিকেল পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফারুক হোসেন জানান।
মামুনের খালাতো ভাই হাফিজ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার ভাই একজন সাধারণ মানুষ। সে কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না। কারা তাকে হত্যা করেছে, কী কারণে করেছে আমার জানা নেই।’
হত্যাকাণ্ডের পর আদালতের পাশের রাস্তার ও ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ভিডিওতে দেখা যায়, ফুলহাতা টি-শার্ট পরিহিত মামুন দৌড়ে এসে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের ফটকের সামনে দিয়ে প্রবেশ করেন এবং মাস্ক ও ক্যাপ পরা দুই যুবক পেছন পেছন এসে পিস্তল দিয়ে গুলি করে চলে যায়।
ঘটনাস্থলের কাছে দায়িত্বরত একজন নিরাপত্তারক্ষী বলেন, হত্যার শিকার ওই ব্যক্তি সকাল ১০টা ৫১ মিনিটের দিকে হাসপাতালের ফটক দিয়ে বের হয়। প্রধান ফটক পার হয়ে একটু সামনে যাওয়ার পর রাস্তা থেকে তার দিকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় দুই হামলাকারী।
মাস্ক পরিহিত দুই হামলাকারী ফিল্মি কায়দায় হাতে থাকা পিস্তল (ছোট অস্ত্র) দিয়ে গুলি করতে করতে হাসপাতালের প্রধান ফটক থেকে একটু ভেতরে ঢুকে পড়ে। পরে তারা কবি নজরুল কলেজের দিকে দৌড়ে পালিয়ে যায়।
হাসপাতালের তথ্য মতে, নিহত মামুনের বুকে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। তার পিতার নাম এসএম ইকবাল, মোবারক কলোনী লক্ষীপুর সদর। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ঢাকা ন্যাশনাল হাসপাতালের একজন ওয়ার্ড মাস্টার ও সিকিউরিটি ইনচার্জ তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, গুলিতে নিহত মামুন সোমবার, আদালতে একটি হত্যা মামলায় হাজিরা দিতে গিয়েছিল। ২৮ বছর আগের ওই মামলায় হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে সে গুলিতে নিহত হয়।
মামুনের বিরুদ্ধে ১৯৯৭ সালে মামলাটি হয়েছিল। ওই সময় ২৫ বছরের যুবক জাহিদ আমিন ওরফে হিমেলকে ১৯৯৭ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে মোহাম্মদপুরে পিসিকালচার হাউজিং এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয়। ঐ হামলায় হিমেলের বন্ধু সাঈদও আহত হয়। এ ঘটনায় হিমেলের মা জাফরুন নাহার সাতজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ২ থেকে জনকে আসামি করে মামলা করেন। মামলাটি তদন্ত করে গত সেপ্টেম্বর মাসে তারিক সাইফ মামুনসহ ৬ জনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এ মামলার অন্য আসামিরা হলো- ওসমান, মাসুদ ওরফে নাজমুল হোসেন, রতন, ইমন এবং হেলাল। ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২ এ মামলার সোমবার, সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ছিল। আদালতে মামুন হাজিরাও দেয়। তবে কোনো সাক্ষী আদালতে হাজির হয়নি। এজন্য মামলার পরবর্তী তারিখ আগামী বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি সাক্ষ্য গ্রহণের পরবর্তী দিন ঠিক ধার্য করা হয়।
আদালত থেকে বের হয়ে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের কাছে গেলে তাকে গুলি করা হয়। প্রথম গুলি লাগে হাসপাতালের জানালার গ্লাসে। এরপর আরও কয়েক রাউন্ড গুলি করে। এর মধ্যে তিনটি গুলি মামুনের শরীরেবিদ্ধ হয়।
উল্লেখ্য চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলায় মামুন ২০ বছরের বেশি জেল খেটে ২০২৩ সালে জামিনে মুক্তি পায়। এর তিন মাসের মাথায় তেজগাঁও বিজি প্রেস এলাকায় তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল।
জানা গেছে, চিত্র নায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলায় গত বছর ৯ মে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় মামুনসহ ৬ জনকে খালাস দেয়া হয়। তবে ববসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই ওরফে আব্দুল আজিজসহ ৩ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয় এই ট্রাইবুনাল।
নিহত মামুন এক সময় পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ছিল। দুই বছর আগেও তাকে একবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। হত্যাকা-ের পর উপস্থিত স্বজনরা মামুনকে ব্যবসায়ী হিসেবে দাবি করলেও পুলিশ বলছে, মামুন শীর্ষ সন্ত্রাসী, তার অতীত অপরাধের অনেক রেকর্ড রয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ বিভাগের ডিসি মল্লিক আহসান সামী সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘এই মামুন হচ্ছেন সেই ইমাম-মামুন গ্রুপের মামুন। একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পুলিশের খাতায় তার নাম রয়েছে।’
ঘটনার পর পুলিশসহ অন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ভিডিও ফুটেজ দেখে আসামিদের গ্রেপ্তার ও হত্যার নেপথ্য উদ্ঘাটনে কাজ করছেন। আর মামুনের প্রতিপক্ষ ও হুমকিদাতাদেরও চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে।
উল্লেখ্য এর আগেও বিভিন্ন সময় আদালত পাড়ার কাছে প্রধান সড়ক ও আশপাশের রাস্তায় এ ধরনের গুলির ঘটনা ঘটেছে।



