শনিবার, জানুয়ারি ১০, ২০২৬
হোমসাহিত্যসাময়িকীবিলেতে বাঙালির শিল্পসাহিত্যের প্রতিনিধি

বিলেতে বাঙালির শিল্পসাহিত্যের প্রতিনিধি

সম্পর্কিত সংবাদ

যখনই দেখি আকাশে মেঘ জমে

মনে হয় ওই তো আমার দেশের মেঘ,

ওই তো আমার মাঠের ওপার,

ওই মেঘের নিচে সবুজ ধানক্ষেত,

সাদা বকের দল উড়ে যাচ্ছে-

এই প্রবাসে কোথাও সেরকম নেই।

– শামীম আজাদ

স্বদেশ বলতে যে আত্মার উচ্ছ্বাস- সেটা কেবল একজন প্রবাসীই বুঝতে পারেন। আমাদের প্রতিদিনের ক্লান্তি আর ব্যস্ততার মাঝে লালন করি দেশমাতৃকার অবয়ব, নস্টালজিয়ায় বিদগ্ধ সে আকুতি, আহা! আমার প্রিয় স্বদেশ। আমাদের কবিতা, গান, গল্প আর নাটক বলতে সর্বত্র জুড়ে আছে স্বদেশভাবনা আর অনুভূতি।

শামীম আজাদ শুধু কবি নন; তিনি শিক্ষাবিদও। লন্ডনের বিভিন্ন স্কুলে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্য শেখান এবং প্রবাসী শিশুদের মধ্যে মাতৃভাষার প্রতি আগ্রহ তৈরি করেন। এছাড়া তিনি লন্ডনে “কবিতা ও গল্পের আসর” প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা সাহিত্য ও সংস্কৃতির মিলনস্থল

শামীম আজাদ কেবল প্রবাসী বাঙালির অনুভূতি প্রকাশ করেননি, বরং নতুন প্রজন্ম এবং আন্তর্জাতিক পাঠকদের জন্য বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরছেন। তিনি শুধু লেখক নন, বরং প্রবাসী বাঙালির ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং আবেগের প্রতিনিধিত্ব করছেন।

শামীম আজাদ এক অনবদ্য জীবন জীয়নের অক্সিজেনের মতো। তাঁকে দেখলে মনে হয়- জীবন আসলে থমকে থাকা নয়, জীবন হচ্ছে ক্রিয়েটিভিটির জন্য। জীবন বলতে- শ্বাস যতক্ষণ চলবে তোমাকে কাজ করতে হবে, কারণ জীবন খুবই শর্ট কিন্তু কাজ অনেক বেশি। এত কাজ করতে হবে, যার পরিসংখ্যান দেয়া যাবে না। একটিই কথা কাজ করতে থাকো…।

শামীম আজাদের কর্ম, বাংলাভাষীদের সমাজ ব্যবস্থা ও জীবন আলেখ্যর অভিজ্ঞতাকে লালন করে তাঁর সাহিত্যের কল্প ভাবনা, শব্দ এবং ঢং বাংলিশ উচ্চারণে কবিতায় অনবদ্য শিল্পময় আবহে উপস্থাপিত হয়। তিনি সিলেটী আঞ্চলিক শব্দ, ইংরেজি শব্দ ও প্রমিত বাংলার শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের মাটি, মানুষ ও প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর অবিচ্ছেদ্য ও অটুট সম্পর্ক এখনো বজায় রয়েছে। ব্রিটেনে সর্বাধিক জনপ্রিয় বাঙালি কবি হিসেবে শুধু নয় তিনি বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই পরিচিত।

কবিতার প্রধান বিষয়বস্তু ও শৈলীর মধ্যে তাঁর কবিতায়প্রবাসী জীবনের বিচ্ছিন্নতা, একাকীত্ব এবং নতুন সমাজে খাপ খাইয়ে নেয়ার লড়াই ফুটে ওঠে। শিকড়ের প্রতি গভীর ভালোবাসার প্রকাশ, যেখানে বাংলাদেশের গ্রাম, নদী, মানুষ এবং ঐতিহ্য নিয়ে লেখা কবিতাগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর কবিতায় মানবিক সম্পর্কের গুরুত্ব, প্রেমের সংবেদনশীলতা এবং গভীর আবেগ মূর্ত হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামের কথা তাঁর কবিতায়প্রায়ই বড় একটি জায়গা দখল করে আছে, যা তাঁর দেশপ্রেমকে উপস্থাপন করে। শামীম আজাদের কবিতায় চিন্তার গভীরতা এবং অনুভূতির নিবিড়তা পাঠকদের সাথে সহজেই সংযোগ স্থাপন করতে সাহায্য করে। তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলো বাংলাদেশের কবিতাপ্রেমীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম হিসেবে বিবেচিত।

প্রবাসে থাকা প্রতিটি বাঙালির জীবনের এক আলাদা বাস্তবতা। শামীম আজাদের কবিতা সেই বাস্তবতা অনন্যভাবে ফুটিয়ে তোলে। তিনি নির্মাণ করেন মুক্তচেতনার তীক্ষণ্য উচ্চারণ, যে উচ্চারণ হৃদয়-স্পর্শ অতিক্রম করে বোধকে শাণিত করে, ভাবনাকে নতুন দিকে ঘুরিয়ে দেয়।

শব্দ তাঁর হাতে রূপ নেয় কখনো ধারালো ছুরি, কখনো আবার ভালোবাসায় সুধাবর্ষিত অমিয়ধারা; আর তাঁর উচ্চারণে জন্ম নেয় চিন্তার উদ্ভাসিত নতুন জগত।

যেমন “নিশ্চিত নির্ভর” কবিতায় তিনি লিখেছেন:“সমস্তই টলে গেছে / ঝরে গেছে কত পুরাতন প্রাণ / ঝাপসা হইয়া গেছে / শ্যাষ হয়ে গেছে / সব সোনা

সোনা ধান। / তবু কী আশ্চর্য / এত সব অযুত আঘাতের পরও / কী করে রয়ে গেছে / আস্ত দ্যাশ খান!”

এই কয় কয়টি লাইনে দেখা যায়প্রবাসের একাকীত্ব, দেশের প্রতি নস্টালজিয়া এবং শিকড়ের প্রতি অবিচ্ছেদ্য আকর্ষণ।

শামীম আজাদকে নিয়ে বা তাঁর পরিচিতি নিয়ে বলতে গেলে বর্তমান সময়ে শুধু বাংলা সাহিত্যে শক্তিশালী ভূমিকা রাখছেন তা নয় ইংরেজি সাহিত্যেও সমানভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। বিশেষ করে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি হিসাবে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করছেন, বলতে গেলে এককভাবে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। বিলেতে কয়েক শত বাংলাভাষী কবি সাহিত্যিকদের সরব উপস্থিতি থাকলেও বাংলাভাষায় চর্চার বাহিরে খুব অল্প সংখ্যকই আছেন যারা দ্বিভাষীয় কাজ করছেন। আমরা রীতিমত আতঙ্কিত, বিশেষ করে বিলেতে বাংলা ভাষা-সাহিত্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে, কারণ আগামী প্রজন্ম কতটা বাংলা ভাষা বা সাহিত্য নিয়ে কাজ করবে। বাংলা কবিতা কজন ছেলে মেয়ে পড়ছে বা পড়বে? শামীম আজাদ জানতেন আর সেই ভয়েই হাল ধরেছিলেন উভয় ভাষা নিয়ে কাজ করতে, যাতে তাদের কাছে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে নিয়ে যাওয়া যায়। তাই করছেন, আমাদের প্রজন্ম শুধু নয় ইংরেজি ভাষার ভেতর দিয়ে বাংলা সাহিত্যের একটা শক্তিশালী সংযোগ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। গল্পে, কবিতায়, ছন্দে অথবা নাটকের মাধ্যমে তিনি নিরলস কাজ করছেন দুই ভাষায়।

প্রবাসে থেকেও তিনি মাতৃভূমির সৌন্দর্য, বৃষ্টির ঘ্রাণ, ফুলের রঙ এবং গ্রামের শান্ত জীবনকে কবিতায় জীবন্তভাবে তুলে এনেছেন। তাঁর সাহিত্য পাঠককে শুধুই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, বরং মানুষের আবেগ, স্মৃতি এবং জীবনের গূঢ়তা অনুভব করায়।

শামীম আজাদ কেবল দেশের সৌন্দর্য দেখেননি; তিনি বাংলাদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ এবং সংগ্রামের কথা তাঁর কবিতায় তুলে এনেছেন। যেমন “যুদ্ধ” কবিতায়: “যুদ্ধ মানে নিদারুণ গ্লানি ও ভয় / যুদ্ধে নেই কোনো নিরঙ্কুশ জয় / যুদ্ধ মানেই ক্ষয়, মৃত্যু ও মানুষের প্রতি / সংশয় / যুদ্ধে, পক্ষ-বিপক্ষ উভয়েই / ভয়ের কাছে নিরস্ত্র, সমান ভীত / বিনা শর্তে পরাজিত।”

এখানে যুদ্ধ কেবল ইতিহাস নয়, মানুষের অনুভূতি এবং নৈতিক দ্বন্দ্বের প্রতিফলন।

শামীম আজাদ শুধু কবি নন; তিনি শিক্ষাবিদও। লন্ডনের বিভিন্ন স্কুলে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্য শেখান এবং প্রবাসী শিশুদের মধ্যে মাতৃভাষার প্রতি আগ্রহ তৈরি করেন। এছাড়া তিনি লন্ডনে “কবিতা ও গল্পের আসর” প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা সাহিত্য ও সংস্কৃতির মিলনস্থল।

তিনি কেবল বাংলাতেই নয়, ইংরেজি সাহিত্যের ক্ষেত্রেও সমানভাবে অবদান রেখেছেন। ব্রিটিশ-বাংলাদেশি হিসাবে তিনি দু’ভাষায় বাংলা সাহিত্যকে পরিচিত করেছেন। এটি প্রমাণ করে, শামীম আজাদ শুধু সাহিত্যিক নয়, বরং সংস্কৃতির দূত ও ইতিহাসের ধারক। বাংলা ও ইংরেজি- দুই ভাষাতেই তিনি কবিতার প্রান্তর প্রসারিত করেন শব্দের অন্তরতরঙ্গের উচ্ছ্বাসে, যেখানে কবিতা শুধু রূপ-রসের আস্বাদ নয়, বরং অবস্থান, বোধের স্বাধীনতা এবং চিন্তার নবচেতনা।

তাঁর কবিতা কেবল পাঠ নয়; এটি অন্তর্মুখী যাত্রা, বোধের গভীরে নোঙর, এবং মানবিক ও নান্দনিক অন্বেষণের এক মুক্তাঙ্গন। শামীম আজাদ প্রমাণ করেছেন, কাব্য হলো স্থানান্তরিত ব্যক্তিগত অনুভব এবং সামষ্টিক স্মৃতির সংমিশণ- যেখানে শব্দ, ছন্দ এবং ফর্ম পাঠককে নতুন ঠিকানায় পৌঁছে দেয়, মানবিক বোধকে উদ্বাস্তু থেকে অবলম্বনে পরিণত করে।

শামীম আজাদের কবিতা পাঠকের অভিজ্ঞতাকে বহুমাত্রিক যাত্রা হিসেবে গড়ে তোলে। তাঁর লেখা কেবল শব্দের সংমিশ্রণ নয়; এটি অন্তর্জাগতিক বোধ, সামাজিক সচেতনতা, স্মৃতি, এবং অনুভূতির এক নান্দনিক উন্মেষ। তিনি প্রতিটি মুহূর্তকে দৃশ্যমান এবং অনুভবযোগ্য করে তোলেন। বাস্তবতার স্পর্শ এবং সূক্ষ্ম চিত্রকল্প তাঁর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য। উদাহরণস্বরূপ, “তোমারই কারণে মজুফ”-এ দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা- শীতের স্যুপ, বর্ষার ঝরনা, ট্রেনের শব্দ, কিন্তু তার বর্ণনা পাঠককে সরাসরি মানসিক অভিজ্ঞতা এবং অন্তর্দৃষ্টি-র দিকে ঠেলে দেয়।

“শীত নেমে এলে, / ঊষার উষ্ণতা নিয়ে / গরম স্যুপের বাটি আমারে / জড়াইয়া ধরে।”

এখানে বাস্তবের সরল উপাদানও সুররিয়ালিজমের মাধ্যমে পাঠককে এক বিমূর্ত এবং অনুভূতিমূলক জগতে নিয়ে যায়।

আধুনিক ও পোস্টমডার্ন স্পর্শ স্পষ্ট; শহর, ট্রেন, সোশ্যাল মিডিয়া, ডোনার কার্ডের মতো উপাদানগুলি কবিতায় অন্তর্ভুক্ত। ফ্র্যাগমেন্টেড লাইন, অনিয়মিত ছন্দ, এবং বিস্তৃত বা সংক্ষিপ্ত অনুচ্ছেদ পাঠকের অভিজ্ঞতাকে Non-didactic বা অ-নির্দেশমূলক রাখে। যেমন:

“বর্ষায় বেড়া ভেঙে স্বপ্নরা পালাচ্ছে, / জল ককটেলের শব্দে বেদনাও ভেঙে যাচ্ছে”

কোনো ব্যাখ্যা নেই; পাঠক নিজস্ব অনুভূতি ও প্রতিফলনে প্রবেশ করে। তাঁর সামাজিক সচেতনতা ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ অত্যন্ত শক্তিশালী।

শামীম আজাদের কাব্যশৈলী ও ফর্মে তিনি চিত্রকল্পের বহুমাত্রিকতা, ফ্র্যাগমেন্টেড ন্যারেটিভ, Non-didactic, এসব তাঁর কবিতার উপাদেয়। একদিকে বাস্তববাদী, অন্যদিকে সুররিয়াল এবং বিমূর্ত। তাঁর লেখায় শৈশব-কৌতূহল, ব্যথা, প্রেম, সামাজিক ন্যায় এবং অন্তর্মুখী চিন্তা একসাথে কাজ করে। প্রতিটি কবিতা- যেমন “অতন্দ্রী”, “বৃষ্টি ও ব্যকুলতা”, “উপলব্ধি” শব্দ, ফর্ম, অনুভূতি এবং নান্দনিকতার মিলনস্থল। পাঠক শুধু পড়ে না, বরং অভ্যন্তরীণ যাত্রায় অংশগ্রহণ করে, নিজের বোধের সঙ্গে সংযুক্ত হয়।

শামীম আজাদ দেশে ও বিদেশে নানা সম্মাননার মধ্যে বাংলা সাহিত্যের সর্বোচ্চ সম্মাননা বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হন ২০২৩ সালে। সাথে সাথে তাঁর সাহিত্যকর্ম ও সাংস্কৃতিক অবদানের জন্য বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। তাঁর কিছু উল্লেখযোগ্য সম্মাননার মধ্যে রয়েছে: কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশনের ফেলোশিপ: এই ফেলোশিপের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন দেশে ঘুরে তাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করার সুযোগ পান। চ্যানেল এস লিটারারি অ্যাওয়ার্ড, সংহতি সাহিত্য পুরস্কার ও রেইনবো পুরস্কারসহ তাঁর লেখালেখি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য তিনি অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন। শামীম আজাদ শিকড় সাহিত্য পত্রিকা বা সংহতি পরিবারের একজন অভিভাবক। এই দুই সংগঠন শুধু না বাংলা সাহিত্য পরিষদ, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র যুক্তরাজ্যসহ এমন অসংখ্য বাঙালি, অবাঙালি সংগঠনের সাথে জড়িত এবং পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছেন।

শামীম আজাদের কবিতা যেমন “নিশ্চিত নির্ভর”, “মালিকানা”, “উপলব্ধি” এবং “নিদ্রাকুসুম” প্রমাণ করে, সাহিত্যের মাধ্যমে দেশের প্রতি ভালোবাসা, মানুষের প্রতি সহানুভূতি এবং মানবিক মূল্যবোধ অক্ষয় রাখা সম্ভব।

শুভ জন্মদিন, শামীম আজাদ। আপনার সৃষ্টিশীলতা আমাদের মাঝে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকুক।

সম্প্রতি

আরও খবর