দেশে প্রতি দুটি মেয়ের একটি মেয়ে বাল্যবিয়ের শিকার হচ্ছে। ২০১৯ সালের তুলনায় এ হার ৪ শতাংশ কমলেও বাল্যবিবাহ পরিস্থিতি এখনও উচ্চপর্যায়ে রয়েছে বলে এক জরিপে তথ্য উঠে এসেছে।
বিবিএস ও ইউনিসেফের জরিপ
জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত দুই দফায় প্রায় ৬৩ হাজার পরিবারের ওপর এ জরিপ
২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ১৮ বছর হওয়ার আগে বয়ে হয়েছে ৪৭ শতাংশ, ২০১৯ সালে এ হার ছিল ৫১ শতাংশ
কিশোরী মায়েদের সন্তান জন্ম দেয়ার হার প্রতি হাজারে ৮৩ থেকে বেড়ে ৯২
সি-সেকশন ২০১৯ সালের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫২ শতাংশে
স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান বা হাসপাতালে প্রসব ১৮ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৭১ শতাংশ
শিশুশ্রম ২ শতাংশের
বেশি বেড়ে হয়েছে
৯ শতাংশ
জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বাল্যবিবাহের হার ৬০ শতাংশ থেকে নেমে ৫৬ শতাংশ হয়েছে। স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্র বা হাসপাতালে প্রসব, অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব বেড়েছে। একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অস্ত্রোপচারে (সিজারিয়ান সেকশন বা সি-সেকশন) শিশু জন্মের হার।
তবে নবজাতক থেকে শুরু করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যুর হার কমেছে এবং শিশুশ্রম ও স্কুলের বাইরে থাকা শিশুর হার বেড়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের নতুন প্রকাশিত মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস-বহুনির্দেশক গুচ্ছ জরিপ) প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। রোববার,(১৬ নভেম্বর ২০২৫) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত দুই দফায় প্রায় ৬৩ হাজার পরিবারের ওপর জরিপ পরিচালনা করা হয়। এখানে জাতীয় অগ্রাধিকার ও বৈশ্বিক মানদণ্ডের সঙ্গে সংগতি রেখে ১৭২টি মানদণ্ড এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ২৭টি সূচককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রথমবারের মতো অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুদের মধ্যে রক্তস্বল্পতা, সিসাসহ ভারী ধাতুর দূষণের মাত্রা পরীক্ষার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এর আগে ২০১৯ সালে এমআইসিএসের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল। ওই সময় থেকে কতটুকু অগ্রগতি বা অবনতি হয়েছে, তার তুলনামূলক চিত্র এবারের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
বিবিএসের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার। সম্মানিত অতিথি ছিলেন ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন মোহাম্মদ মাসুদ রানা চৌধুরী, মূল তথ্য উপস্থাপন করেন এমআইসিএসের ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা এমদাদুল হক এবং মুক্ত আলোচনা পর্ব সঞ্চালনা করেন বিবিএসের উপ-পরিচালক আলমগীর হোসেন।
অনুষ্ঠানে রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, বাল্যবিবাহ ও শিশুমৃত্যুর হার প্রমাণ করে অগ্রগতি সম্ভব। সিসাদূষণ ও শিশুশ্রমের মতো সংকট লাখ লাখ শিশুকে সম্ভাবনা থেকে বঞ্চিত করছে। শিশুদের সুরক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
জরিপ প্রতিবেদনে বাল্যবিবাহের দুটি উপাত্ত দেয়া হয়েছে। একটি তথ্যে বলা হয়েছে, ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগে বাল্যবিবাহ হয়েছে ৪৭ শতাংশের, ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে এ হার ছিল ৫১ শতাংশ। আর দেশজুড়ে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বাল্যবিবাহের হার দাঁড়িয়েছে ৫৬ শতাংশে, যেটা আগে ছিল ৬০ শতাংশ।
দেশের প্রতি দুটি কন্যাশিশুর মধ্যে প্রায় একটি কন্যাশিশু অর্থাৎ মোট প্রায় ৩৬ লাখ কিশোরীর এখনও ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে হচ্ছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর ফলে দেশের উৎপাদনশীলতা ও মানবসম্পদের সম্ভাবনায় বছরে ৭-৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হচ্ছে। বর্তমান গতিতে চললে বাল্যবিবাহ নিরসনে ৬৪ বছরের বেশি সময় লাগবে।
অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচনা সঞ্চালনা করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি উন্মুক্ত উপাত্তের দিকে এমআইসিএসের এই প্রতিবেদন একটি গুরুত্বপূর্ণ যাত্রা উল্লেখ করে বলেন, বড় পরিসরে আলোচনার জন্য এই উপাত্ত যেন সহজলভ্য হয়। বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে দুটো উপাত্ত এসেছে। নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে কোনটা ব্যবহার করা হবে, সেই প্রশ্ন থেকে যায়। কোনো ক্ষেত্রে হার কেন বাড়ছে, কোনো ক্ষেত্রে কেন কমছে- সেই পেছনের গল্পগুলো উঠে আসা উচিত। জরিপের মান বাড়াতে হবে।প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন- বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেস্?ম, ওয়াটারএইডের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক খায়রুল ইসলাম, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের জ্যেষ্ঠ ফেলো মাহীন সুলতান, সাবেক সচিব সারোয়ার বারী এবং আইসিডিডিআরবির পুষ্টি গবেষণা বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক থাডেয়াস ডেভিড মে।
জরিপে বলা হয়েছে, কিশোরী মায়েদের সন্তান জন্ম দেয়ার হার প্রতি হাজারে ৮৩ থেকে বেড়ে ৯২ হয়েছে। সি-সেকশন ২০১৯ সালের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫২ শতাংশে। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান বা হাসপাতালে প্রসব ১৮ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৭১ শতাংশ। শিশুশ্রম ২ শতাংশের বেশি বেড়ে হয়েছে ৯ শতাংশ।
এছাড়া মাধ্যমিক স্কুলে পড়ার বয়সী শিশুদের স্কুলে না পড়ার হার ২ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৩৪ শতাংশ; জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর ব্যবহার ৫ শতাংশ কমে ৫৮ শতাংশ এবং মোট প্রজননহার (টিএফআর) ২ দশমিক ৩ থেকে বেড়ে ২ দশমিক ৪ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পাঁচ বছরের কম বসয়ী শিশুদের পাঁচটি বয়সভিত্তিক গোষ্ঠীর প্রতিটি ধাপে শিশুমৃত্যুর হার কমেছে। ৫ বছরের কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে জীবিত জন্ম নেয়া প্রতি হাজার শিশুর মধ্যে ৩৩টি মারা যায়, যা আগে ছিল প্রতি হাজারে ৪০।
খর্বকায় শিশুর হার ৪ শতাংশ কমে হয়েছে ২৪ শতাংশ। কিন্তু শীর্ণকায় শিশুর হার ৩ শতাংশ বেড়ে হয়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ। কম ওজনের শিশুর হার সামান্য বেড়ে ২৩ শতাংশ হয়েছে। অতি ওজনের শিশুর হার কিছুটা কমেছে।
প্রসবপূর্ব সেবা ৪ বার নেয়ার হার ৪৩ শতাংশ। প্রসবপূর্ব সেবা অন্তত একবার নেয়ার হার ৫৮ থেকে বেড়ে প্রায় ৭৬ শতাংশ হয়েছে। তবে মানসম্মত চারবার সেবা নেয়ার হার এখনও অনেক কম, মাত্র ৪৩ শতাংশ।
৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে মাত্র ৫৯ শতাংশের জন্মনিবন্ধন হয়েছে। এর ফলে অনেক শিশু আইনগত পরিচয় এবং সেবাপ্রাপ্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
জরিপের ফলাফলে বলা হয়েছে, ১২-৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৩৮ শতাংশের এবং অন্তঃসত্ত্বা নারীদের প্রায় ৮ শতাংশের রক্তে সিসার মাত্রা নিরাপদ সীমার চেয়ে বেশি। ঢাকা (৬৫ শতাংশ) সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত এলাকা।



