বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্তে মায়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিপি) ও জান্তা সেনাবাহিনীর মোট পাঁচ সদস্যকে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
গতকাল দুপুরে ঘুমধুম ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ৪২ নম্বর সীমান্ত পিলার সংলগ্ন গাছবুনিয়া পাড়ায় স্থানীয়দের কাছে আশ্রয় নেয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিজিবি সদস্যরা তাদের আটক করে বিওপিতে নিয়ে যান।
আটক পাঁচজনের পরিচয় নিশ্চিত করেছে বিজিবি। তারা হলেন- মায়ানমারের শান রাজ্যের মোমেক শহরের বাসিন্দা ও বিজিপির সেকেণ্ড ইন্সপেক্টর কো সাইন (৩৫), আয়াওয়ার্দি রাজ্যের প্যান তানাউ শহরের বাসিন্দা ও বিজিপি সদস্য সোয়েথুরা (৩৮), একই রাজ্যের মাগাতুতাও শহরের বাসিন্দা ও বিজিপি সদস্য অং সান হতু (২৫), আয়াওয়ার্দি রাজ্যের বাসিন্দা ও বিজিপি সদস্য কিয়াও জায়ের লিন (৩২) এবং ইয়াঙ্গুন রাজ্যের বাসিন্দা ও জান্তা সেনাবাহিনীর সদস্য মিন মিনও (৪১)।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুপুরের দিকে গাছবুনিয়া পাড়ার লোকজন হঠাৎই বিদেশি পাঁচজন সশস্ত্র সদস্যকে ক্লান্ত-পরিতপ্ত অবস্থায় এলাকায় ঘোরাফেরা করতে দেখেন। পরে তারা জানতে পারেন আটকরা মায়ানমারের বিজিপি ও সেনাবাহিনীর সদস্য, যারা সীমান্তের তুমুল সংঘর্ষ থেকে পালিয়ে জীবন রক্ষার্থে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে ৩৪ বিজিবির অধীন মংজয়পাড়া বিওপির টহল দল ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের আটক করে। সীমান্ত পিলার ৪২ থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে ওই সদস্যরা স্থানীয়দের শরণাপন্ন হয়েছিলেন বলে জানা যায়।
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাজহারুল ইসলাম চৌধুরী আটক হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আটককৃত মায়ানমার নাগরিকদের বিজিবির হেফাজতে রাখা হয়েছে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী নেয়া হবে।
অন্যদিকে নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ওসি মাসরুরুল হক জানান, তাদের এখনও (গতকাল রাত আটটা পর্যন্ত) থানায় হস্তান্তর করা হয়নি। থানায় আনা হলে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে।
সূত্র জানিয়েছে, মায়ানমারে সাম্প্রতিক সময়ে জান্তা সেনাবাহিনী, বিজিপি এবং বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সংঘর্ষ নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিশেষ করে আরাকান ও শান অঞ্চলে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো ভয়াবহভাবে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। এর ফলে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরাও নিরাপত্তাহীনতায় পড়ে সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
বাংলাদেশ সীমান্তে গত কয়েক মাস ধরে গুলিবিনিময়, মর্টারশেল পড়ে আসা এবং সীমান্ত দিয়ে লোকজন অনুপ্রবেশের ঘটনা বাড়ছে। এতে স্থানীয় মানুষজন আতঙ্কের মধ্যে থাকলেও ঘটনাগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
এই পাঁচ সদস্যের আটকের ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বিদেশি নিরাপত্তা সদস্যদের আটক, আশ্রয় বা ফেরত পাঠানো সবকটিই কূটনৈতিক সংবেদনশীলতার মধ্যে পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা দেখাচ্ছে মায়ানমারের অস্থিরতা সরাসরি বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় প্রভাব ফেলছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অনুপ্রবেশ ও আশ্রয় প্রার্থনার সংখ্যা বাড়তে পারে।
সীমান্ত নিরাপত্তা বিশ্লেষণ বলছে, বিজিবির টহল আরও বাড়াতে হবে এবং সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি মায়ানমারের সঙ্গে জরুরি কূটনৈতিক আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
এদিকে ঘুমধুম সীমান্তে মায়ানমার সেনা ও বিজিপির পাঁচ সদস্য আটক হওয়া শুধু একটি সীমান্ত ঘটনা নয় এটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
বাংলাদেশ এখন এমন এক সিদ্ধান্তের মুখোমুখি, যা শুধু সীমান্ত নয়, আঞ্চলিক শান্তি-স্থিতিশীলতার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধের ধাক্কা বারবার বাংলাদেশ সীমান্তে এসে লাগছে, এটাই আজকের বাস্তবতা।



