বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে অতি ডানপন্থিদের আস্ফালন যেমন বেড়েছে, তেমনি সরকারের দিক থেকে আস্কারাও তারা পেয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। তারা বলেন, ‘আগে বাউলের মুক্তির দাবিতে সমাবেশ করলে সেখানে অন্তত হামলা হত না।’ মানিকগঞ্জের বাউল শিল্পী আবুল সরকারকে অবিলম্বে মুক্তি দিয়ে বাউলদের ওপর হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের এই সংগঠন।
গত ২০ নভেম্বর মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় এক গানের আসরে ‘আল্লাহকে নিয়ে কটূক্তি’ করার অভিযোগে বাউল শিল্পী আবুল সরকারকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে তার মুক্তির দাবিতে বাউল-ফকিরদের সমাবেশে হামলা করে ‘তৌহিদী জনতা’, মানিকগঞ্জে বাউলদের হত্যা করারও স্লোগান উঠেছে ‘একটা একটা বাউল ধর, ধইরা ধইরা জবাই কর।’
এই দুই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক বলেছে, ‘শত শত বছর ধরে গ্রামবাংলায় প্রচলিত কবিগান ও পালাগানের যে ঐতিহ্য, তারই এক ধারা হলো বিচার গান। এই ধারার গানে দু’জন স্বভাবকবি/শিল্পী দুটো পক্ষে ভাগ হয়ে যুক্তিতর্ক হাজির করেন। কথা ও গান দুই উপায়ে একপক্ষ অন্যকে তর্কে হারানোর চেষ্টা করেন।’
শিক্ষক নেটওর্য়াক বিবৃতিতে বলেন, ‘সেদিন জীব ও পরম এই দুই পক্ষে লড়াই করছিলেন আবুল সরকার, প্রতিপক্ষের নামও ছিল আবুল সরকার (যিনি ফরিদপুর থেকে এসেছিলেন)। আলোচ্য আবুল সরকার মহারাজ ছিলেন জীবের পক্ষে, পরমকে ছদ্ম আক্রমণই ছিল তার লড়াইয়ের লক্ষ্য। সেদিন দুই কবির দার্শনিক বাহাস চলে চার ঘণ্টা ধরে। সেই চার ঘণ্টা থেকে কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও কেটে অনলাইনে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে, এবং আল্লাহর বিরুদ্ধে কটূক্তি হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। পরে মামলা করা হয়েছে, দ্রুত গ্রেপ্তার করাও হয়েছে।’
শেখ হাসিনার সময়ে শেষের দিকে টাঙ্গাইলের বাউল রীতা দেওয়ানের বিরুদ্ধে একই ছকে একাধিক মামলায় গ্রেপ্তারের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়া হয় বিবৃতিতে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের ভাষ্য, বাউল-ফকিরদের ওপরে কট্টরবাদীদের এ রকম বিদ্বেষ ও হামলা নতুন নয়।
সরকার পতনের পরবর্তী পরিস্থিতি তুলে ধরে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘৫ আগস্টের পরে শত শত মাজার ভাঙা হয়েছে, গানের আসর পণ্ড করা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের বহু ম্যুরাল এবং ভাস্কর্য ধ্বংস করা হয়েছে, পথেঘাটে নারীদের অপমান-অপদস্ত করা হয়েছে, এমনকি ‘ইসলামবিরোধী’ চিহ্নিত করে কবর থেকে লাশ উঠিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এই ‘দঙ্গল-প্রবণতা’ সমাজের সর্বস্তরে দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক।
শিক্ষক নেটওয়ার্ক মনে করছে, কিছু ঘটনা অভ্যুত্থান পরবর্তী অনুমিত বাস্তবতা ধরা গেলেও, বেশিরভাগটাই ‘সরকারের নীরবতা বা প্রশ্রয়ের কারণে হচ্ছে’। সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সমালোচনা করে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘দঙ্গলসন্ত্রাস সমালোচনার বিপরীতে সরকারি দায়িত্ববান ব্যক্তি বলেছেন, তাদের মব না বলে প্রেশার গ্রুপ বলতে হবে এবং সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা আবুল সরকারের গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে হতাশাজনক ভূমিকা রেখেছেন।’
শিক্ষক নেটওয়ার্ক বলছে, বাউল-ফকিররা তৃণমূলে তাদের গান ও দার্শনিক কথনের মাধ্যমে সামাজিক ভারসাম্য ও সম্প্রীতি রক্ষা করেন। কট্টরবাদের বিকাশকে যুক্তিতর্ক দিয়ে শান্ত করেন, যেটা আধুনিক ও সেকুলার ভাবধারার শিক্ষিতজনেরও করার সামর্থ্য নাই। বিশেষত গ্রামে ও তৃণমূলে উদারপন্থা প্রচারের সামর্থ্য যতটা ফকির-বয়াতীদের আছে, ততটা হয়তো নাগরিক উচ্চ শিক্ষিতের নেই বলে মন্তব্য করা হয়েছে বিবৃতিতে। ‘ফলে ফকির-বাউলদের কেবল ফোক বা আবহমান বাংলার সংস্কৃতির প্রতিভূ না ধরে তাদের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভূমিকাকে শনাক্ত করতে পারতে হবে।’ ওদিকে কট্টরপন্থি সালাফি-ওয়াহাবী থেকে জামাতি কারোরই বাউল-ফকিরদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও দার্শনিক তর্ক বা বাহাস মোকাবিলা করার সামর্থ্য নেই। তাই তারা কটূক্তির নামে মামলা করে, উত্তেজনা সৃষ্টি করে বাউল-ফকিরদের গ্রেপ্তারে বাধ্য করে। ‘একদিকে যুক্তি-তর্ক, অন্যদিকে রয়েছে উত্তেজনা ও ধর্মীয় আরোপন দ্বিতীয় দলের মতো করেই সবাইকে ধর্মচর্চা করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনে তারা মানুষকে ইসলাম থেকে খারিজ করবে, সহিংস হবে, মামলা-হামলা করবে। প্রথম দলকে অবশ্য কখনো সহিংস ও উত্তেজিত হতে দেখা যায় না বরং মরমী সাধক হিসেবেই তাদের সমাজে দেখা যায়। বরং তাদের পূর্বসূরি দরবেশ-ফকিরদের উদার ও মরমী ব্যাখ্যার কারণেই এক সময় পূর্বভারতে দলে দলে লোকে ইসলাম গ্রহণ করেছে।’ সরকার ও রাষ্ট্রীয় আইনকানুনকে এসব কিছুর ঊর্ধ্বে থেকে চলতে হয় মন্তব্য বিবৃতিতে বলা হয়, ‘মামলা হলেই গ্রেপ্তার হয় না, প্রাথমিক একটা বিচারের সুযোগ থাকেই, যে গ্রেপ্তারযোগ্য অপরাধ হয়েছে কিনা। ক্ষণিকের ও খণ্ডিত ভিডিও যারা এডিট করে বিশেষ উদ্দেশ্যে ছড়িয়েছে, তারাও অপরাধ করেছে কিনা, তা বিচারের সুযোগ আছে। আবার কারও মুক্তির দাবিতে সমাবেশ করা নাগরিক অধিকার। সেই সমাবেশে হামলা বরং গ্রেপ্তারযোগ্য অপরাধ। অন্যদিকে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর বেশিরভাগই এই অন্যায় গ্রেপ্তারে প্রতিবাদ করেনি। তাদের এই নিরবতাও প্রশ্নযুক্ত।’
বিবৃতিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক আবুল সরকারে বিনাশর্তে অবিলম্বে মুক্তি, যে সব সূত্র থেকে পরিপ্রেক্ষিত বিহীনভাবে ভিডিও ভাইরাল করা হয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা, আবুল সরকারের মুক্তির দাবিতে সমাবেশে হামলাকারীদের সংবাদের/ভিডিওর ফুটেজ দেখে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার ও অন্তর্বর্তী সরকারের দিক থেকে কট্টরবাদী ও দঙ্গলবাজদের অন্যায় ও অগণতান্ত্রিক আব্দার রক্ষা করার চর্চা বাদ দিয়ে বরং সব নাগরিকের জন্য সমান আচরণ নিশ্চিত করার দাবি জানান।



