মঙ্গলবার, জানুয়ারি ১৩, ২০২৬
হোমখবরসারাদেশসাধুবাবার বটগাছ: শ্রীমঙ্গলের নীরব ইতিহাস-রক্ষক

সাধুবাবার বটগাছ: শ্রীমঙ্গলের নীরব ইতিহাস-রক্ষক

প্রতিনিধি, শ্রীমঙ্গল

সম্পর্কিত সংবাদ

শ্রীমঙ্গল উপজেলা শহরের ভানুগাছ রোডের ডান পাশে তৎকালীন বিডিআর ক্যাম্পের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক নীরব সাক্ষী—সাধুবাবার বটগাছ। সময়ের প্রবাহে বহু পরিবর্তন এসেছে, বদলে গেছে রাস্তা, বাড়িঘর, মানুষের জীবন—কিন্তু এই শতবর্ষী বটগাছ এখনও প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে, বহন করে চলেছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি আর মানুষের না–বলা গল্প।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে শ্রীমঙ্গল ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধকেন্দ্র। চা-বাগান, বন, হাওর আর শহর—সবখানেই তখন চলেছে স্বাধীনতার জন্য মানুষের সংগ্রাম। পাকিস্তানি বাহিনীর দখলদারিত্ব ও নির্মমতা শ্রীমঙ্গলকে পরিণত করেছিল অন্ধকার এক অধ্যায়ে। সেই সময় বহু মুক্তিকামী মানুষকে ধরে এনে নির্যাতনের পর প্রাণহানি ঘটানো হতো। তাদের অনেকের শেষ আশ্রয় হয়ে উঠেছিল এই বটগাছের নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া ভূরভূরিয়া ছড়া। তাই গাছটি শুধু একটি গাছ নয়; এটি বহু পরিবারের স্মৃতি, বিষাদ আর বেদনার প্রতীক।

১ মার্চ ১৯৭১ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ভাষণের পর শ্রীমঙ্গলে শুরু হয় গণজাগরণ। ন্যাপ নেতা রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী, মোঃ শাজাহান মিয়া ও সৈয়দ মূয়ীজুর রহমানের নেতৃত্বে স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে শহরের রাস্তাঘাট। ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ন্যাপ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তখন প্রতিদিন মিছিল-সমাবেশে স্বাধীনতার দাবি তুলে ধরতেন। মেজর সি আর দত্ত, মেজর নুরুজ্জামান ও কর্নেল ওসমানীর মত বীর সেনানীদের আগমন শ্রীমঙ্গলে প্রতিরোধযুদ্ধে নতুন শক্তি যোগায়। পৌরসভা কার্যালয় পরিণত হয় সংগ্রাম কমিটির কার্যকর কেন্দ্রস্থলে।

কিন্তু ৩০ এপ্রিল ১৯৭১ পাকবাহিনী শ্রীমঙ্গলে প্রবেশ করলে পরিস্থিতি বদলে যায়। শহরের বিভিন্ন স্থানে তারা ক্যাম্প স্থাপন করে এবং শুরু হয় দমন-পীড়ন। বহু মানুষকে ধরে এনে অত্যাচারের পর প্রাণহানি ঘটানো হতো। আর সেই গল্পই নিঃশব্দে ধারণ করে আছে সাধুবাবার বটগাছ ও ভূরভূরিয়া ছড়া।

শ্রীমঙ্গল বিজিবি সেক্টর হেড কোয়ার্টারের পাশে ভুড়ভুড়িয়া পাহাড়ি ছড়া ও সাধুবাবার গাছসংলগ্ন বধ্যভূমিকে সংরক্ষণ করার লক্ষ্যে ২০১০ সালে শ্রীমঙ্গলের বীর মুক্তিযোদ্ধা, সংস্কৃতিকর্মী ও মুক্তচিন্তক তৎকালীন ১৪ ব্যাটেলিয়নের অধিনায়ক কর্নেল নূরুল হুদার (যিনি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদ থেকে সম্প্রতি অবসর নিয়েছেন) নেতৃত্বে ও স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এখানে সুউচ্চ স্মৃতিস্তম্ভ, ঝুলন্ত সেতু নির্মাণসহ বীর শহিদদের স্মৃতি রক্ষায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে নির্মিত হয় শহিদদের তালিকাখচিত স্তম্ভ, মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ‘মৃত্যুঞ্জয়ী ৭১’। বর্তমানে বধ্যভূমির পবিত্র এ অঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৩ ফুট উঁচু স্মারক স্তম্ভ, বেদি ও দৃষ্টিনন্দন তোরণ নির্মাণের কাজ চলছে। এই বিজয়ের মাসেই নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ছুটির দিনগুলোতে প্রচুর দর্শনার্থী এখানে বেড়াতে আসেন, দেখতে আসেন প্রায় শতবছর বয়সী বটকুঞ্জ ও ‘বধ্যভূমি ৭১’।

দীর্ঘ আট মাস পর ৪ ডিসেম্বর ভারতীয় মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বে শ্রীমঙ্গল শত্রুমুক্ত হয়। স্বাধীনতার আনন্দে শহর ভরে উঠলেও সাধুবাবার গাছের ছায়ায় এখনও লুকিয়ে থাকে বেদনাদায়ক দিনের স্মৃতি, যা প্রতিবার এই স্থানের নাম শুনলেই জীবন্ত হয়ে ওঠে বহু মানুষের মনে।

আজও ওই বটগাছের নিচে দাঁড়ালে মনে হয়—ইতিহাস যেন নিঃশব্দে কথা বলে। মুক্তিযুদ্ধের অজানা অধ্যায় আর হারিয়ে যাওয়া মানুষের স্মৃতি এই গাছের প্রতিটি শিকড়ে যেন খোদাই হয়ে আছে। তাই সাধুবাবার বটগাছ শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়; এটি শ্রীমঙ্গলের আত্মার এক অংশ, সময়ের এক অনড় সাক্ষ্য।

সম্প্রতি

আরও খবর