রবিবার, জানুয়ারি ১১, ২০২৬
হোমখবরসারাদেশপদ্মা পাড়ে পর্যটকের ভিড় নিরাপত্তাহীন নৌভ্রমণ আর বাড়তি ভাড়ার অভিযোগ

পদ্মা পাড়ে পর্যটকের ভিড় নিরাপত্তাহীন নৌভ্রমণ আর বাড়তি ভাড়ার অভিযোগ

প্রতিনিধি, লৌহজং (মুন্সীগঞ্জ)

সম্পর্কিত সংবাদ

পদ্মা সেতু, রূপালি ইলিশ আর মুক্ত দক্ষিণা বাতাস। পদ্মা পাড়ের এই অনাবিল সৌন্দর্য দিন দিন টানছে ভ্রমণপিপাসু মানুষকে। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিন ও ছুটির মৌসুমে রাজধানী ঢাকা থেকে হাজারো মানুষ ভিড় জমাচ্ছেন মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তের পুরাতন শিমুলিয়া ফেরিঘাট এলাকায়।
পদ্মা সেতুর প্রকল্প রক্ষা বাঁধ ঘেঁষে সকালবেলার সূর্যোদয় কিংবা বিকেলের সূর্যাস্ত, একই জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রকৃতির অপূর্ব রূপ দেখার সুযোগ মিলছে। ফলে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ও প্রমত্তরিতে নদীভ্রমণ দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে পর্যটকদের কাছে।
সরেজমিনে শুক্রবার সকালে শিমুলিয়া ফেরিঘাট এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পর্যটকদের ইলিশ ভোজনের চাহিদা মেটাতে মাওয়া প্রান্তে গড়ে উঠেছে প্রায় দুই শতাধিক ছোট-বড় খাবার হোটেল। পাশাপাশি নদীর বুকে ভাসমান রেস্তোরাঁয় বিলাসী পরিবেশে ইলিশ খাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি ভাসমান হোটেল, যেখানে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ছে।
তবে পর্যটন সুবিধার দিক থেকে রয়েছে বড় ঘাটতি। পর্যাপ্ত যাত্রী ছাউনি, গাড়ি পার্কিং সুবিধা ও পরিচ্ছন্ন টয়লেট না থাকায় ভোগান্তিতে পড়ছেন বিভিন্ন জেলা থেকে আসা দর্শনার্থীরা। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব অব্যবস্থাপনা দীর্ঘমেয়াদে পর্যটন সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। নদীভ্রমণের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ও প্রমত্তরিতে পর্যটকদের জন্য নেই পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট। অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক উদ্ধার ব্যবস্থাও চোখে পড়েনি। পর্যটকদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে টুরিস্ট পুলিশ কিংবা নৌ পুলিশের দৃশ্যমান তৎপরতাও দেখা যায়নি শিমুলিয়া ফেরিঘাট এলাকায়।
মাওয়া প্রান্তে ঘুরতে আসা পর্যটকদের অভিযোগ, তদারকির অভাবে নদীতে ঘোরানোর পর ফেরার সময় অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। যদিও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অনেক ট্রলারচালক। তবে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি সিদ্দিক মন্ডল দাবি করেন, ঘাট এলাকায় একটি বড় সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে এ ধরনের অনিয়ম চলছে।
ঘাট এলাকায় দেখা গেছে, ঘণ্টাভিত্তিক চুক্তিতে ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকায় ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। আবার জনপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা দিয়েও বিভিন্ন ট্রলারে নদীভ্রমণে অংশ নিচ্ছেন অনেকে। স্পিডবোটে ভ্রমণের জন্য জনপ্রতি নেওয়া হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা।
রাজধানীর গুলশান থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা এক ব্যাংক কর্মকর্তা আব্দুর রব দেওয়ান বলেন, পরিবার নিয়ে একটু প্রশান্তির জন্য পদ্মা পাড়ে এসেছি। কিন্তু পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদারকি চোখে পড়েনি। যে যার মতো করে ট্রলার চালিয়ে টাকা আদায় করছে।
জার্মান প্রবাসী রকি জ্যাকসন বলেন, বিদেশের অনেক জায়গা ঘুরেছি। কিন্তু পদ্মা পাড়ের সৌন্দর্য সত্যিই মুগ্ধ করেছে। ইলিশের স্বাদ আর সেতু দেখার অভিজ্ঞতা দারুণ ছিল। তবে কিছু অব্যবস্থাপনা আমাদের হতাশ করেছে।
সদ্য বিবাহিত দম্পতি রহিমা আফরোজ ও প্রান্ত শেখ বলেন, সূর্যাস্তের সময় পদ্মা পাড়ে দারুণ কিছু মুহূর্ত কাটিয়েছি। তবে যাত্রী ছাউনি ও পরিচ্ছন্ন টয়লেট না থাকায় ভোগান্তি হয়েছে।
বিআইডব্লিউটিসি ও বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়, গত বছরের ২২ জুন পদ্মা পাড়ে পর্যটন হাব ও আন্তর্জাতিক কনটেইনার পোর্ট নির্মাণের লক্ষ্যে মুন্সীগঞ্জে একটি যৌথ সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ৭৫৬ কোটি ৭১ লাখ টাকা ব্যয়ে ২৯ দশমিক ১৩ একর জমিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি দেশি ও বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের যুক্ত করার কথাও জানানো হয়। নৌপরিবহন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন সে সময় শিমুলিয়া ঘাটে জেটি স্থাপন, সার্বক্ষণিক ফেরি চলাচল, পর্যটন হাব ও ইকো পোর্ট গড়ে তোলাসহ ১০টি প্রকল্পের মাস্টারপ্ল্যান উপস্থাপন করেন। তবে বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক সৈয়দা নুরমহল আশরাফী বলেন, পদ্মা পাড়ের পর্যটন সম্ভাবনা ধরে রাখতে দ্রুত সময়োপযোগী উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে তাগিদ দেওয়া হবে। পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, নদীকেন্দ্রিক পর্যটন পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা না করলে শুধু পর্যটন সম্ভাবনাই নয়, হুমকিতে পড়বে নদীর জীববৈচিত্র্য ও এই নদীঘেঁষা মানুষের জীবন-জীবিকাও।

সম্প্রতি

আরও খবর