টেকসই সিটি বিনির্মাণে নগরায়নের পাশাপাশি নগরের নর্দমা বা ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অতীব জরুরি বিষয়; কিন্তু আমাদের নগরগুলোর অপরিকল্পিত ও অপ্রতুল ড্রেন ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নগরবাসীর দুর্ভোগ বৃদ্ধি ছাড়া তেমন কিছু উন্নতি চোখে পড়েনা। আমাদের এখানে রাজনৈতিক বিবেচনায় নগরের আকার ও পরিধি বাড়ানো হয়। এমন অনেক পৌরসভা আছে যেগুলো দলিল দস্তাবেজে প্রথম শ্রেণীর পৌরসভা কিন্তু সেখানে ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা নেই, নেই খাবার পানি সরবরাহের ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ইত্যাদি। এসব সুযোগ-সুবিধা ব্যতিরেকে কিভাবে একটি পৌরসভা ১ম শ্রেণির পৌরসভার মর্যাদা পায় তাও বোধগম্য নয়।
দিন দিন পৌরসভার সংখ্যা বেড়েই চলছে কিন্তু সে অনুযায়ী নগরকে সাজানোর পরিকল্পনা নেই, সঠিক নেতৃত্ব নেই, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতা নেই, নেই উন্নয়ন প্রকল্প, পর্যাপ্ত সরকারি বরাদ্ধ নেই, অথচ পৌরসভার সংখ্যা বাড়ছে। এর কারণ কি শুধুই রাজনৈতিক?
ঢাকার পাশে ঢাকার চেয়েও বড় আয়তনের গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন। এই কর্পোরেশনের আয়তন ৪১৯ বর্গ কিমি; যা ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মোট আয়তনের চেয়েও বেশি। গাজীপুর সিটির অনেক জায়গা প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল, সেখানে পুরোদমে কৃষিকাজ হচ্ছে, নেই যোগাযোগের সঠিক ব্যবস্থা, নেই নগরায়নের সুবিধা, মানুষজন নগরের কোনো সুবিধাই পায় না। অথচ ঢাকার অত্যন্ত নিকটে এত বিশাল একটা সিটি কর্পোরেশন গড়ে উঠছে। উপরন্তু নগরের পানির উৎসসমূহের দূষণ ও নানাভাবে দখল দারিত্বের কারণে অনেক নদী খাল-বিল হারিয়ে যাচ্ছে। নগরের কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে স্যানিটারি বা পরিবেশ সম্মত উপায়ে বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার কোনো সুযোগ বা সুবিধা নেই।
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে সরকারি হিসেবে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের বসবাস। এ শহরে প্রতিদিন ২৫০০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার মধ্যে সিটি কর্পোরেশন ৬৮ শতাংশ বর্জ্য সংগ্রহ করতে পারে। এ বর্জ্য খোলা জায়গায় ডাম্পিং বা ডিসপোজাল করা হচ্ছে দুটি স্থানে, একটি হলো টঙ্গীর গাছা এলাকায় বর্জ্য পরিত্যাজন সাইট আর অন্যটি হলো কড্ডা পরিত্যাজন সাইট। এ দুটি জায়গায়ই রাস্তার পাশে এবং জনবহুল এলাকা। দুর্গন্ধ ও বর্জ্য থেকে নির্গত কালো পানি পুরো এলাকার পরিবেশকে মারাতœকভাবে দুষিত করে চলছে, সেই সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের উপর বিরুপ প্রভাব মানুষের জীবনের ওপর অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রায় ৩২ ভাগ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো সুযোগ নেই, এসব বর্জ্য রাস্তা, ড্রেন, খাল, বিল ও খোলা জায়গায় ফেলা হচ্ছে। যার ফলে গাজীপুরের ভূপরিস্থ পানির উৎসে ক্রমশই দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে।
কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং, এর অন্যতম কারণ হলো ল্যান্ডফিল বা ডাম্পিং সাইটগুলোর সংখ্যা ও আয়তন অপ্রতুল। পরিবেশসম্মত উপায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করার জন্য যে পরিমাণে জনবল ও দক্ষ প্রকৌশলী দরকার তা নগরগুলোতে নেই। শহরের যে পরিমাণে বর্জ্য হয় তার ৬০ শতাংশও ডাম্পিং সাইটে পরিবহন ও পরিত্যাজন সম্ভব হয় না। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, গাড়ি, জনবল ও আর্থিক সংস্থানের জোগান দেয়া সরকারের পক্ষে বেশ কঠিন। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে খুব ভালোমানের বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট বা সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে একক কোনো প্রকল্প এখন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। কিছু কাজ হয়েছে উন্নয়ন প্রকল্পের অংশ হিসেবে। উদাহরণস্বরূপ, মাতুয়াইল ল্যান্ড ফিল সাইট পরিবেশসম্মত উপায়ে উন্নীত করা হলেও পরবর্তীতে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও আর্থিক অসঙ্গতির কারণে স্যানিটারি স্ট্যাটাস ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে সেখানে অনেকটা ওপেন ডাম্পিং বা খোলা জায়গায় ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে। অন্যদিকে আমিনবাজারে পরিবেশসম্মত উপায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে চাইনিজ একটি কোম্পানি অনেক দিন ধরেই কাজ করছে কিন্তু এখনো তেমন দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
যদি কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের দিকে নজর দেই, দেখা যাবে এই নগরে প্রতিদিন প্রায় ২৫০টন বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে, এর মধ্যে মাত্র ৫৮ শতাংশ বর্জ্য একটি বর্জ্য সংরক্ষণ সাইটে খোলা অবস্থায় ফেলা হচ্ছে। অর্ধেকের মতো বর্জ্য রাখার ব্যবস্থা কুমিল্লার সিটির নেই। এখন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এই শহরের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে এবং দিন দিন বর্জ্য উৎপাদন বেড়েই চলছে।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে প্রতিদিন ৭৫০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়, এর মধ্যে ৫শ টনের মতো বর্জ্য সিটি কর্পোরেশন খোলা জায়গায় আলামিন নগর ও কদম রসূলে ব্যবস্থাপনা করতে পারে। এসব ল্যান্ডফিল সাইটে খোলা অবস্থায় বর্জ্য ফেলা হয় যার ফলে নগরের বায়ুদূষণ থেকে শুরু করে জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পরিলক্ষিত।
এসব ডাম্পিং সাইট বা ল্যান্ডফিল সাইটের আশপাশে যেসব পরিবার বসবাস করে, তারা যে সামাজিকভাবে কতটা নিগ্রহ তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। তাদের স্বাভাবিক জীবন ওষ্ঠাগত, তাদের সামাজিক মর্যাদা ভূলুন্ঠিত, অত্যন্ত বাজে ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করার কারণে তাদের ছেলে মেয়েদের বিয়েশাদি দিতে পারছে না, কেউ আত্মীয় করতে চায় না, আত্মীয়স্বজন আসতেও চায় না, আবার আসলেও বেশিক্ষণ থাকতে চায় না। এতসব সামাজিক সমস্যার মধ্যে দূষিত পরিবেশে বসবাসের কারণে তাদের ছেলেমেয়েদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে।
বর্জ্যরে ভাগাড় হতে নানান পোকামাকড় আশপাশের বাসাবাড়িতে গিয়ে তাদের খাবার পর্যন্ত নষ্ট করে ফেলছে। কাক ও চিল বর্জ্যরে ভাগাড় হতে নানান ধরনের বর্জ্য ঠোঁটে করে এনে এসব বাড়িঘরে ফেলে, এতে এসব এলাকার মানুষ অবর্ণনীয় দুঃখ দুর্দশায় পতিত হচ্ছে, এটা থেকে পরিত্রাণে যেন কোনো উপায় নেই। শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তার বলে ময়লার ভাগাড় থেকে দূরে সরে যেতে, অথচ ওরা ওদের ভিটে বাড়ি ছেড়ে যাবে কোথায়? আর এ সমস্যার জন্য তারা দায়ী নয়, সিটি কর্পোরেশনের দায় তাদের বহন করতে হচ্ছে।
সিটি কর্পোরেশনের ময়লা পরিবহনে যেসব গাড়ি নিয়োজিত তারা ট্রাকে অধিক পরিমাণে ময়লা পরিবহন করার কারণে আশপাশে রাস্তার উপর ময়লা পড়ে পুরো এলাকার পরিবেশ দূষিত করে তুলছে। এসব ড্রাইভাররা কারো কথা শুনে না, মানুষের সুবিধা-অসুবিধা বুঝতে চায় না, অথচ ময়লা পরিবহনের সময় ট্রাকের উপর ত্রিপাল বা কভার ব্যবহার করার কথা, কিন্তু করে না। ফলে ময়লা পরিবহনে নানান ধরনের অসঙ্গতি দৃশ্যমান।
সিটি কর্পোরেশনগুলো এসব বিষয়ে দৃষ্টি দিতে নারাজ। জনসাধারণের র্দুভোগ লাগবে কার্যকরী কোনো উদ্যোগ সিটি কর্পোরেশনের নেই, বা চোখে পড়ার মতো কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগও ওরা নেয়না। সিটি কর্পোরেশনে অভিযোগ দিয়ে লাভ হয় না, এসব ময়লার ব্যবসার সঙ্গে অনেক প্রভাবশালী মহল জড়িত থাকার কারণে এসব বিষয় অনেকটা অন্তরালেই রয়ে যায়। নানান সময়ে নানাভাবে সরকারি উদ্যোগের কথা শোনা যায়, বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নারয়ণগঞ্জ, গাজীপুর, কুমিল্লা ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন উদ্যোগ নিলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। সরকার বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনকে বেশ কয়েক বছর ধরেই গুরুত্ব দিয়ে আসছে, যদিও বাস্তবে এর কোনো অগ্রগতি নেই। আদৌও কি বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব? এ নিয়ে কতটা গবেষণা এ দেশে হয়েছে?
উৎসে বর্জ্য পৃথিকীকরণ করা না গেলে যেসব প্লাস্টিক বর্জ্য, অপচনশীল ও পচনশীল বর্জ্য রয়েছে তা কেন্দ্রে পৃথিকীকরণ সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। এতে উৎপাদিত বিদ্যুতের যে ইউনিট খরচ পড়বে তা কয়লা বা তেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ থেকেও বেশি হবে, যদি তাই হয় তাহলে এধরনের উদ্যোগ অর্থনৈতিকভাবে উপযোগী হবে না এবং এসব কেন্দ্র খুব বেশি দিন টিকে থাকবে না বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে হাসপাতালের বিপজ্জনক বর্জ্য মানব স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ও হুমকিস্বরূপ। এসব বর্জ্যও বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেমন ভূমিকা রাখে না। নগরের বর্জ্য সরবরাহের উৎস পৃথিকীকরণের কোনো ব্যবস্থা নেই। যদি বাসাবাড়ি থেকে এসব ময়লা আলাদা আলাদা পাত্রে সংগ্রহ করা যায় তাহলে তা পুনঃচক্রায়নের একটা বিশাল বাজার সৃষ্টি করবে এবং ডাম্পিং সাইটে বর্জ্যরে পরিমাণ দুই-তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনা সম্ভব। ফলে ডাম্পিং সাইটের আয়ুস্কাল হবে প্রায় ২০ বা ৩০ বছরের ব্যবহার উপযোগী।
পরিশেষে নগরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে সঠিক ও সময়োপযোগী উদ্যোগ নিতে হবে। পরিবেশসম্মত উপায়ে বৈজ্ঞানিকভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা না গেলে নগরগুলো বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠবে।
[লেখক : জ্বালানি ও পরিবেশ বিষয়ক লেখক]



