Thursday, March 5, 2026
হোমমতামতউপ-সম্পাদকীয়ভারতের লোকসভা ভোট : নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা

ভারতের লোকসভা ভোট : নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা

সম্পর্কিত সংবাদ

এই লেখা যখন প্রকাশিত হবে সম্ভবত ভারতের লোকসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ততদিনে ঘোষিত হয়ে যাবে। এক অদ্ভুত পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে ভারতের লোকসভা নির্বাচন (২০২৪) হতে চলেছে। এই নির্বাচনের সর্বভারতীয় প্রেক্ষিত আর পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষিত, এই দুয়ের মধ্যে কিছুটা হলেও মূলত ঐক্য যেমন আছে, আবার বিস্তর ফারাকও আছে।

পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে আসন্ন লোকসভা নির্বাচন ঘিরে সবথেকে বড় প্রশ্ন, তারা স্বাধীনভাবে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন কিনা। নিজেদের পছন্দের যে রাজনৈতিক দল, সেই দলের প্রার্থীকে বিনা বাধায় ভোট দিতে পারবেন কিনা। ভোট দিয়ে, ভোট কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে, পৈতৃক প্রাণটা নিয়ে তারা নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারবেন কিনাÑএই আশঙ্কাও তাদের একটা অংশের মধ্যে ইতোমধ্যেই আগের কয়েকটি নির্বাচনের প্রেক্ষিতে খুব বড় হয়ে দেখা দিতে শুরু করেছে।

পশ্চিমবঙ্গে ২০১১ সালের পরে যে সমস্ত ভোট হয়েছে, সেই ভোটে এখানকার নাগরিক সমাজ, নির্ভয়ে সার্বিকভাবে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছে, একথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা নরেন্দ্র মোদির অতি বড় মিত্র ও মন থেকে কখনো বলতে পারেন না। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের আওতায় যেসব ভোটগুলি হয়েছে, সেই সব ভোটের আগে কেন্দ্রীয় সরকার বা কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে বহু তর্জন গর্জন করলেও, শেষ পর্যন্ত পর্বতের মুসিক প্রসবই হয়েছে।

কেন্দ্রীয় বাহিনী পরিচালিত হয়েছে রাজ্য সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন পুলিশের দ্বারা। ফলে একেবারে খুঁঙর কলের মতো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুলিশ, কেন্দ্রীয় বাহিনীকে যতটুকুনি হাঁটবার, চলবার অধিকার দিয়েছে, তার বাইরে কেন্দ্রীয় বাহিনীর পক্ষে সম্ভবপর ছিল না, হাত পা ছড়িয়ে নিঃশ্বাস নেয়ারও। সেই কারণে কেন্দ্রীয় বাহিনী, লোকসভা বা বিধানসভার ভোটে যতই রোডমার্চ ইত্যাদি করুক না কেন, বুথের ভেতরে তাদের ঢুকবার অধিকার না থাকায়, বুথগুলো ছিল সম্পূর্ণভাবে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণাধীন।

তৃণমূল কংগ্রেস তাদের মতো করে ২০১১ সালের পরে প্রত্যেকটি লোকসভা বা বিধানসভার ভোটকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। ভোটকেন্দ্রে বিরোধী বামপন্থি নির্বাচনী এজেন্টকে বসতে দেয়া হয়নি। অথচ বিজেপির এজেন্ট বুথের ভেতরে স্বমহিমায় থেকেছে। ইভিএম মেশিনের সামনে ভোটারকে ভোট দিতে না দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের লোকেরা নিজেদের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে দিয়েছেনÑএমন দৃশ্য বৈদ্যুতিন গণমাধ্যমে গোটা বিশ্ববাসী বারবার দেখেছে। তবু সেই সব ভোটগুলো সম্পর্কে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন কোনরকম ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

তৃণমূল কংগ্রেস আর বিজেপির আভ্যন্তরীণ ভারসাম্যে ২০১১ সালের পরে কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতিতে, কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের দ্বারা পরিচালিত যে কটি লোকসভা, বিধানসভার ভোট হয়েছে, তাতে কেন্দ্র আর রাজ্যের শাসক দল পরস্পর পরস্পরের মধ্যে ভোট নিয়ে একটা পারস্পরিক বোঝাপঙার ভেতর দিয়ে নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছে। বলাবাহুল্য বামপন্থি কর্মী-সমর্থকÑএদের কাউকে ভোটকেন্দ্রে নির্বাচনে এজেন্ট হিসেবে বসতে পর্যন্ত দেয়া হয়নি। এমনকি ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা দখল করতে তৎকালীন সময় কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের সঙ্গে যে জোট মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় করেছিলেন, সেই কংগ্রেসকে পর্যন্ত ২০১১ এর পরবর্তী কোনো নির্বাচনে বুথের মধ্যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পোলিং এজেন্ট পর্যন্ত রাখতে দেয়া হয়নি।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন রাজ্য নির্বাচন কমিশনের অধীনে স্থানীয় সরকারের যে সমস্ত ভোট সাম্প্রতিক অতীতে পশ্চিমবঙ্গে হয়েছে, যেমন ; পৌরসভার ভোট, কর্পোরেশনের ভোট বা পঞ্চায়েতের ভোট সেইসব ভোটে ভোটগ্রহণের আগে বিরোধী প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেয়া থেকে শুরু করে, বিরোধী বামপন্থি দলের মহিলা প্রার্থীদের প্রকাশ্য রাস্তায় শাড়ি খুলে দেয়া, চুলের মুঠি ধরে মারধর করাসহ প্রায় সমস্ত ধরনের যৌন নির্যাতন, শারীরিক হেনস্তা, তৃণমূল কংগ্রেসের দামাল ছেলেরা করেছে। বৈদ্যুতিক গণমাধ্যম, সংবাদ মাধ্যমে বহু জায়গায় সেই সব প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

এইসব ঘটনাক্রম নিয়ে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার সংবাদ মাধ্যমে অনেকবার প্রতিবাদ করেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিতর্ক করেছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পশ্চিমবঙ্গে তার দলের রাজনৈতিক সভায় অনেক গরম গরম কথা বলেছেন। কিন্তু এ সম্পর্কে যে প্রশাসনিক ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোতে রাজ্য সরকারের ক্ষমতাকে খর্ব না করে কেন্দ্রীয় সরকার নিতে পারত, তা নেয়ার ক্ষেত্রে মোদি সরকার এক পা অগ্রসর হয়নি।

রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মোদি বা তার দলের শীর্ষ নেতৃত্ব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিয়ন্ত্রণাধীন সরকারের নির্যাতন সম্পর্কে অনেক বাজার গরমকরা কথা বললেও, যে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়ার অধিকার তাদের হাতে রয়েছে, সেই অধিকারের প্রয়োগের ক্ষেত্রে তারা কখনো কোনো রকম প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর রাজ্য সরকার নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন ব্যবস্থা কে প্রহসনে পরিণত করবার উদ্দেশ্যে, তৎকালীন নির্বাচন কমিশনার মীরা পা-ের সঙ্গে মমতা প্রশাসন এবং দল কি ধরনের ব্যবহার করেছে সে কথা পশ্চিমবঙ্গবাসী ভুলে যায়নি। নির্বাচনের পরিবর্তে মমতা কর্তৃক সিলেকশন, এই ব্যাপারটিতেই মমতার দল এবং প্রশাসন সবথেকে বেশি গুরুত্ব আরোপ করে। সেই কারণে মমতা ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে রাজ্য সরকার পরিচালিত যে কোনো নির্বাচন একটা ছেলেখেলায় পরিণত হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, আসন্ন লোকসভা নির্বাচনকে ঘিরে নির্বাচন কমিশন কে প্রভাবিত করবার নানা ধরনের পাঁয়তারা পশ্চিমবঙ্গের শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই কষা শুরু হয়ে গেছে। সাধারণ নাগরিক সমাজ, জাতীয় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ঘিরে একটা সংশয়ী মানসিকতার মধ্যে রয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে বামপন্থি দলগুলোর পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের যে ফুল বেঞ্চ ভোটের আগে সার্বিক পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে পশ্চিমবঙ্গ সফর করেছে, তাদের কাছে ভোটার তালিকা ঘিরে বিস্তৃত অভিযোগ জানিয়েছে। ভুয়া ভোটার, মৃত ভোটার ঘিরে নানা ধরনের অভিযোগ রাজনৈতিক দলগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জানিয়েছে। এমনকি বিজেপি দলের পক্ষ থেকেও লোক দেখানো অভিযোগ করা হয়েছে। তাদের লোক দেখানো অভিপ্রায়, এটা সবাই বুঝতে পারলেও, জল মেশানোর ব্যাপারটি প্রকাশ্যে নির্বাচন কমিশনের কাছে বিজেপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

কিন্তু নির্বাচন কমিশন কোন পর্যবেক্ষণের ভেতর দিয়ে নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকায় মৃত ভোটার নেইÑএই ধরনের প্রশংসাপত্র এক কথায়, কোনরকম তদন্ত ব্যতীত দিয়ে দিলেন, সেটা ঘিরে সাধারণ নাগরিক সমাজের মধ্যে একটা বড় রকমের প্রশ্ন দেখা দিতে শুরু করেছে। নাগরিক সমাজ, বিগত পঞ্চায়েত নির্বাচনে, রাজ্যের শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের যে অগণতান্ত্রিক, স্বেচ্ছাচারী মানসিকতার একের পর এক তথ্য প্রমাণ দিয়ে নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধি দলের কাছে অভিযোগ জানিয়েছে, সেইসব অভিযোগ সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধির দল আদৌ কোন নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করেছে এ কথা জোর দিয়ে বলতে পারা যায় না।

গণতন্ত্রের স্তম্ভ হলো বিরোধী দল। সরকার পক্ষ থেকে আইনসভাতে একটা সময় পর্যন্ত বিরোধী দলকে বিশেষ মর্যাদা দেয়া হতো। কেন্দ্রে বিজেপি বিভিন্ন সময়, বিভিন্নভাবে ক্ষমতাসীন থাকাকালীন আইনসভার বিরোধী দলের মর্যাদা ক্ষুণœ হয়েছে। কারণ, বিরোধী দলের, গণতন্ত্রে, সংসদীয় রাজনীতিতে যে গুরুত্ব, সেই গুরুত্বের কথা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির ধারক বাহকেরা স্বীকার করে না। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের পরিবর্তে, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের ভেতর দিয়ে যারা ভারতীয় সংবিধানের যে যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামো, সেই পরিকাঠামোকে হত্যা করতে চায়, তারা কখনোই আইনসভায় বিরোধী কণ্ঠস্বর ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হোক এটা চায় না।

সেই উদ্দেশ্যেই বিরোধী দলের কণ্ঠকে রুদ্ধ করতে ভোটার তালিকা থেকে শুরু করে ভোটে নিয়োজিত কেন্দ্রীয় বাহিনীকে রাজ্য পুলিশের আওতা মুক্ত করে ,স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়ার যে দাবি, সেটি কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের পর্যবেক্ষক দলের কাছে হাজির করা সত্ত্বেও, সেই দাবির প্রতি নিরপেক্ষ সহানুভূতি এবং সহমর্মিতা কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন দেখাতে পারেনি। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের দল, আসন্ন লোকসভা ভোটার আগে পশ্চিমবঙ্গ সফর করলেন। তারা কেন্দ্রীয় বাহিনীর অবস্থান, গতিবিধি ইত্যাদি সম্পর্কে রাজ্য পুলিশের অধীনতা ঘিরে যে মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তা থেকে এটাই বুঝতে পারা যায় যে, আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে, নাগরিকরা কোনরকম প্ররোচনা বা শাসকের ভয় দেখানো থেকে মুক্ত হয়ে, নিজেদের পছন্দের রাজনৈতিক দলের প্রার্থীকে বেছে নিন-এই গোটা প্রক্রিয়াতেই নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চের যথাযথ সম্মতি নেই।

সেই কারণেই তারা সমস্ত ধরনের যুক্তিপূর্ণ বিরোধী দলগুলোর যুক্তিপূর্ণ দাবির প্রতি বিন্দুমাত্র সহানুভূতি না দেখে নিরপেক্ষ অবস্থান না গ্রহণ করে রাজ্যের শাসকদলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করে আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে কেন্দ্রের ভেতরে শাসক আর রাজ্যের শাসকের ভেতরে যে অলিখিত বোঝাপড়া সেই বোঝাপড়াকেই শেষ পর্যন্ত সিলমোহর দিয়ে গেলেন।

[লেখক : ভারতীয় ইতিহাসবিদ ]

সম্প্রতি

আরও খবর