Friday, March 6, 2026
হোমমতামতউপ-সম্পাদকীয়মশা নির্মূলে কী করছে দুই সিটি করপোরেশন

মশা নির্মূলে কী করছে দুই সিটি করপোরেশন

সম্পর্কিত সংবাদ

মশার সঙ্গে যুদ্ধ করছে মানুষ। সিটি করপোরেশন বলতে গেলে কুম্ভকর্ণের ঘুমে আছে। তাই চারদিকে মশা। মশার জ¦ালায় অতিষ্ঠ মানুষ। কিছুতেই মশা থেকে মুক্তি পাচ্ছে না জনগণ। কী করছে রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। মশা নিধনে কার্যকর সমধান কখনোই হয় না। মশার দখলেই থাকে ঢাকা।

মশার জ¦ালায় শুধু রাজধানী ঢাকা নয় দেশবাসী অতিষ্ঠ। রাজধানী ঢাকায় গত বছরের এই সময়ের তুলনায় বর্তমানে মশার ঘনত্ব বেড়েছে চারগুণ। মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকরি পদক্ষেপ কম। চলতি অভিযানে মশা নিয়ন্ত্রণে নেয়া কঠিন কাজ। ধারণা করা হচ্ছে মশা না কমে যেভাবে বাড়ছে তাতে আগামী এপ্রিলে মশার ঘনত্ব বেড়ে চরমে পৌঁছাবে। যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে বলে কীট বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন। মশা নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ড. কবিরুল বাশার। তিনি সম্প্রতি বলেছেন, ‘মশার ঘনত্ব অন্য সময়ে যা থাকে তার চেয়ে চারগুণ বেশি বেড়েছে এখন। গত বছরের এপ্রিল থেকে শুরু করা হলে জানুয়ারিতে অন্যান্য মাসের তুলনায় চারগুণ মশার ঘনত্ব পেয়েছি, বিশেষ করে লার্ভার ডেনসিটি।’ তাতে বাড়তি মশা মানুষের মানুষের প্রাণহানি ঘটাচ্ছে জীবনযাত্রা ব্যহত করছে।

সত্যিই কি রাজধানীতে মশারা বশে আসছে না? শীত শেষে রাজধানী ঢাকায় দাবড়ে বেড়াচ্ছে মশারদল। মশককুল রাজধানীতে রামরাজত্ব কায়েম করেছে। এ মশা দুই সিটি করপোরেশনের সুনামে হুল ফুটাচ্ছে! ফুটাবেও। মশার এ যাতনা উভয় সিটি করপোরেশনের জন্য মোটেও সুখকর নয়। এ বছর রাজধানীতে অন্যান্য বছরের তুলনায় মশার উৎপাত একটু বেশিই। মশার দাপট নাকি সামনে আরও বাড়বে। এলাকার বাসিন্দারা এজন্য ঢাকার দুই সিটি করর্পোরেশনের (উত্তর, দক্ষিণ) অবহেলাকে দায়ী করেন। অবহেলা যে আছে সেটা নাগরিকরা ঠিকই বোঝে। মশা নিধনে বরাদ্ধের অর্থের সঠিক ব্যবহার হয় না। মশা নিধনে অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ নতুন কোন বিষয় নয়। মশাদের বশ করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে আন্তরিক হতে হবে। অনিয়মের জায়গাগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। তা কতটা সম্ভব তা নিয়েও প্রশ্ন আছে।

মেয়রদ্বয়ের প্রতি মিনতিÑ আপনারা মশা ঠেকান! এখানে ব্যর্থ হলে সময়মতো জনগণ তার জবাব দেবেই। বিগত ইতিহাস থেকে তাই শিখেছি আমরা। আজকাল মশা যেভাবে কামড়াচ্ছে তাতে করে নির্বাচনের সময় কামড়ের জ্বালা বোধ করি সিটি মেয়ররা টের পাবেন। মশা অতি ক্ষুদ্র এক কীট হলেও ক্ষমতার গদি নড়বড়ে করতে এর জুড়ি নেই। মশা নিধনে ব্যর্থ হয়ে অনেকে পড়েছেন বিপাকে। এর সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক থাকার কথা নয়। তারপরও ঢাকার রাজনীতিতে মশা বরাবরই একটি বড় ইস্যু।

প্রশ্ন হলো, মশা নির্মূলে কী করছে দুই সিটি করপোরেশন? ডিসিসি উত্তর ও দক্ষিণে মশা নিধনের জন্য এক হাজারের ওপর মশক শ্রমিক কর্মরত আছে। নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে ৫/৬ জন কর্মী আছে বলে পত্রিকায় জেনেছি। যাদের কাজ শুধু মশার ওষুধ ছিটানো। প্রতি বছর মশা নির্মূলে প্রায় ৫০ কোটি টাকা বছরে বরাদ্দ পায় দুই সিটি করপোরেশন। এত কিছুর পরও রাজধানীতে দিন দিন মশার প্রকোপ বাড়ছে কেন? এই বিপুল জনবল আর বিপুল পরিমাণ অর্থের সঠিক ব্যবহার হলে তো নগরিতে এভাবে মশা থাকার কথা না?

সমস্যা আছে অনেক। জেনেছি, লোকবল আছে ওষুধ আসে তবে সে ওষুধ ঠিকঠাক মতো ছিটায় কিনা তার মনিটরিং নেই। এত লোক সারা বছর কাজ করলে, এত অর্থ ব্যায় করলে তো নগরিতে মশা জন্মানোর কথা না। মূল কথা হলো যেখানে মশারা জন্ম নেয়, সেখানে ওষুধ পড়েই না। কর্মীরা নাকে তেল দিয়ে ঘুমালে মশা তো বাড়বেই। পত্রিকায় মশা বাড়ার খবর ছাপা হলে কিছুটা দৌড়ঝাঁপ দেখা যায়। এভাবে নগরির মশা নিধন হবে না। মশারা আয়েশেই হুল ফুটাবে সবার গায়ে। মশা নিধনের জন্য অর্থ জনবলের পাশাপাশি মনিটরিং দরকার। মশা নিধন করা না গেলে, এই মশার মাধ্যমে মারাত্মক রোগ ছড়ানোর ঝুঁঁকি রয়েছে। এডিস মশাসহ অন্যদের প্রজনন নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে তা ভয়াবহ যন্ত্রণার কারণ হবে বৈকি! সুতরাং মশা নিধনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ন্যূনতম গাফিলতি চলবে না। সিটি করপোরেশনদ্বয়ের পক্ষে এ কাজ করা খুব সহজসাধ্য হবে না যদি না নগরবাসীর কাছ থেকে যথাযথ সহায়তা আসে। নগরবাসীর উচিত নগর বসবাসযোগ্য, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত রাখার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রাখা। কর্তৃপক্ষীয় উদ্যোগ ও ব্যবস্থার পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধই পারে এই নগরকে মশামুক্ত রাখতে।

এ বছর রাজধানীতে অন্য বছরের তুলনায় মশার উৎপাত বেশিই মনে হচ্ছে। এলাকার বাসিন্দারা এজন্য ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) অবহেলাকে দায়ী করেন। তাদের মতে, বছরের নির্দিষ্ট সময় ডিসিসি মশার প্রজনন ক্ষেত্রগুলোতে ওষুধ ছিটানো হয়। এতে মশার বংশবৃদ্ধি কম হয়। কিন্তু এ বছর তা করা হয়নি। নাগরিকদের এ অভিযোগের সত্যতা মিলল নগর কর্তৃপক্ষের কথায়ও। তারা বলছে, ওষুধ সংকটের কারণে মশা নিধনে নিয়মিত কর্মসূচি এবার চালাতে পারেনি তারা। ঘরে-বাইরে সব জায়গায় মশার অত্যাচার। চায়ের দোকানে বসলেই মশা কামড়াতে শুরু করে। এলাকার নর্দমাগুলোতে আবর্জনা জমে থাকে। ডিসিসি আবর্জনা নিয়মিত পরিষ্কার করে না। এলাকাবাসীও নিজের বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার রাখে না। তাই, মশারা রাতেও কামড়ায়, দিনেও কামড়ায়। আগে দিনের বেলা এরা আন্ডারগ্রাউন্ডে অর্থাৎ ম্যানহোলে আত্মগোপন করে থাকত। রাতে বেরিয়ে আসত। এখন দিনরাত সবসময়ই এদের সমান আনাগোনা। রাতে বরং এদের আনাগোনা থেকে বাঁচার জন্য মশারির ভেতর আশ্রয় নেয়া যায় কিন্তু দিনের বেলায় মানুষের দিবানিদ্রার অরক্ষিত অবস্থার সুযোগ নিয়ে দিব্যি হুল ফুটিয়ে দেয় মশা। অবাধে চুষে নেয় তাজা রক্ত। এরা কানের কাছে ভোঁ-ভোঁ শব্দ করে মানুষের ঘুমের বারোটা বাজায়।

মশা ক্ষুদ্র কীট। কিন্তু তার বিধ্বংসী ক্ষমতা ক্ষুদ্র নয়। বলা হয়, রাজা নমরুদকে জব্দ করতে আল্লাহ পৃথিবীতে মশা পাঠিয়েছিলেন। মশার কামড়ে ধ্বংস হয়ে যায় নমরুদ বাহিনী। আত্মগর্বী রাজার জন্যও মৃত্যু ডেকে আনে এই ক্ষুদ্র কীট। বিপদ না চাইলে মেয়রসহ সিটি করপোরেশনের কর্তাব্যক্তিদের কুম্ভকর্ণের ঘুম থেকে জাগতে হবে। নিজেদের সুনামের স্বার্থেই মশা নামের ভয়ংকর শত্রুকে ঠেকাতে হবে। মশা মারা নিয়ে মশকরা অনেক হয়েছে। মানুষ এখন মশার কাছে জিম্মি। দোহাই মেয়র আপনাদের মশা ঠেকান! এ মশা আপনাদের সুনামেই হুল ফুটাবে।

[লেখক : কেবিনেট চেয়ারপার্সন (পরিবেশ), লায়ন্স ক্লাব ইন্টারন্যাশনাল]

সম্প্রতি

আরও খবর