Thursday, March 5, 2026
হোমমতামতউপ-সম্পাদকীয়রম্যগদ্য : ‘কর নয় সর...’

রম্যগদ্য : ‘কর নয় সর…’

সম্পর্কিত সংবাদ

‘দারুণ কথা বলছো তো, কর নয় সর।

এবার আমরা বিশ্বের উন্নত দেশের কাতারে কাতার মানে আবার, আরব, আমিরাতের কাতার বুইঝো না, এই কাতার মানে সারিতে, অর্থাৎ বিশ্বের উন্নত দেশের সারিতে আমরা পৌঁঁছে যাব। দারুণ বলেছো কর নয় সর!’

‘উন্নত দেশের কাতারে মানে সারিতে আমরা পৌঁছে যাবো এ কথা আমি আবার

কখন বললাম?’

‘এই যে বললা, কর নয় সর।’

‘হ্যাঁ, বলেছি, কর নয় সর, তো এতে তুই বিশ্বের উন্নত দেশের কি পেলি?’

‘কেন! এতো যে কোনো বলদও বুঝবে যে, কর নয় সর, মানে হচ্ছে, ‘কর’ মানে ট্যাক্স দাও, আর ট্যাক্স না দিলে ‘সর’ মানে দুধের সর খাও। অর্থাৎ কর ফাঁকি দিয়ে দুধের সর খেওনা ঠিকমতো ট্যাক্স দাও তাহলে দেশের উন্নতি সাঁই সাঁই করে এগিয়ে যাবে। হে হে হে।’

‘আরে বলদ, আমি এখানে ট্যাক্স বা দুধের সরের কথা বলিনি, আমি বলেছি, ‘কর’ অর্থাৎ ঠিকমতো কাজ কর না হলে, ‘সর’ মানে সরে দাঁড়াও, তুমি কাজও পারবা না আবার যে কাজ জানে তাকে কাজও করতে দিবা না তা চলবে না।’

‘হে হে হে, কর নয় সর, এ কথা বললে তো আপনি নিজেই ধরা খায়া যাবেন!’

‘আমি ধরা খাবো ক্যেনো?’

‘খুবই সহজ, আপনের দুলাভাই ডাক্তার; উনি চর্মরোগীর চিকিৎসা করতে যেয়ে রোগী মেরে ফেললেন!

এ ঘটনায় আপনিও দায়ী থাকবেন, কারণ এই আপনার বোন জামাইয়ের মেডিকেলে পড়ার খরচের পুরো টাকা আপনার বাপে জোগাইছে।’

‘ঠিক আছে মানলাম, মেডিকেলে পড়ার পুরো খরচ আমরা জুগিয়েছি, কিন্তু

মেডিকেলের পুরো লেখাপড়া তো আর আমরা করাইনি!’

‘তা বললে তো হবেনা ভাই, আপনে বলদের মতো মগজ ওয়ালা একটা পোলারে টাকার জোরে মেডিকেলে ভর্তি করলেন, তো ওই বলদ কি করে পুরো অ্যানাটমি মনে রাখবে। তাছাড়া ওর মেডিকেলের ভর্তির পদ্ধতিটাও তো আপনার জানা আছ?’

‘পদ্ধতি জানা আছে মানে? ভর্তি পরীক্ষা দিছে, ওয়েটিংয়ে ছিলো তারাপর সিট

খালি পাইছে ভর্তি হইছে! এর মইধ্যে দোষের কি দেখলি?’

‘দোষ দেখিনাই ভর্তির সিসটেমটা দেখছি।’

‘ভর্তির আবার সিসটেম কি, সিট খালি ট্যাকাদাও ভর্তি হও ব্যাস।’

‘শোনেন ব্যাপারটা অতো সোজা না। সিট খালি ট্যাকা দিলাম ভর্তি হইলাম।’

‘তাহলে ব্যাপারটা কী?’

‘দেখেন সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি ফি ধরেন পাঁচ লাখ টাকা, বেসরকারি মেডিকেল কলেজে বাইশ থেকে পঁচিশ লাখ টাকা।’

‘বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ভর্তি ফি তো বেশি হবেই। যেমন দেখিস না সরকারি জমির প্লট আর বেসরকারি জমির প্লটের দাম আকাশ পাতাল তফাৎ।’

‘ঠিক আছে, ঠিক আছে, সরকারি সাকির্ট হাউসে ডবল বেড উইথ্ এসি ১৩০ (একশত তিরিশ) টাকা, তেমনি প্রাইভেট হোটেলে ডবল বেড উইথ এসি

১৩,০০০ (তেরো হাজার টাকা) পার নাইট। এই তফাৎ মাইন্না নিলাম, কিন্তু আপনের দুলাভায়ের ভর্তির ব্যাপারটা একটু আলাদা।’

‘আলাদা মানে? তুই কি বলতে চাও!’

‘দেখেন মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার জন্য হাজার হাজার ছেলে মেয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেয়। সরকারি মেডিকেলে চান্স পায় মোটে পাঁচশ জন ছাত্রছাত্রী। বাকিরা থাকে

ওয়েটিং লিস্টে।’

‘খুবই স্বভাবিক, ওয়েটিং লিস্টের ছেলে-মেয়েরা বিভিন্ন প্রাইভেট মেডিকেলে কলেজে ভর্তি হবে, সহজ-সরল জলবত তরলং। এর মধ্যে তো কোনো শুভঙ্করের ফাঁকি দেখি না!’

‘আপনি শুভঙ্করের ফাঁকি না দেখলেও আপনের শ্বশুর আব্বা ফাঁকটা দেইক্কা অথরিটিরে এক্সট্রা ক্যাশদিয়া ম্যানেজ করছে।’

‘মানে একটু খুইল্লা ক?’

‘ব্যাপারটা খুবই সিম্পেল। এর মাঝে কোনো জটিলতা নাই। এবার বাস্তব ব্যাপারটা শোনেন। ওই যে সরকারি কোটায় পাঁচশত ছাত্র মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষায় টিকছিল।’

‘জ্বি হ্যাঁ, পাঁচশত ছাত্রছাত্রী তাদের মেধার জোরে টিকেছে।’

‘এতে কোনো সন্দেহ নাই এসব ছাত্রছাত্রী তারা তাদের মেধার জোরে টিকেছে।’

‘তাহলে আমার শ্বশুর আব্বার শুভঙ্করের ফাঁকিটা কী?’

‘শোনেন শোনেন, ধৈর্য হারায়েন না। ওই যে, পাঁচশত ছাত্রছাত্রী রিটেন ও ভাইভা পরীক্ষায় টিকলো তারপর ওয়েটিং লিস্টে কারা থকলো। বাকি ছাত্রছাত্রীরা। পাঁচশ’র পরে পাঁচশ এক, তারপর পাঁচশ দুই…’

‘পাঁচশ তিন, চার-পাঁচ এইতো।’

‘আপনি বিষয়টা ঠিকই ধরেছেন। পাঁচশ’র পর সিরিয়ালি সব নাম্বার, ৫০১, ৫০২, ৫০৩, ৫০৪ এসব।’

‘জ্বি, ৫০১, দুই, তিন-চার এসব।’

‘এবার শোনেন শুভঙ্করের মূল কাহিনী, যেটার রহস্য শার্লক হোমসও সলভ করতে পারবে না।’

‘শার্লক হোমস মানে?’

‘ওই যে পাঁচশ ছাত্রছাত্রী ভর্তি পরীক্ষায় টিকলো তাদের মাঝে অনেকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে চান্স পেয়ে ইঞ্জিনিয়ার হইতে গেছে, কেউ বিদেশি ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেয়ে বিদেশে গেছে, কেউ মোটরসাইকেল অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে। কেউ রক্ত দেখার ভয়ে বা নানা কারণে অনেক ছাত্রছাত্রী মেডিকেলে ভর্তি হয় নাই।’

‘হতেই পারে বিভিন্ন কারণে মেডিকেলে ভর্তি হয় নাই। তো!’

‘বুঝলেন শুভঙ্করের ফাঁকি ওখানেই। শোনেন যে ছাত্রছাত্রী মেডিকেলে ভর্তি হয় নাই তাদের খালি সিটে ভর্তি হবে, সিরিয়ালি ৫০১, ৫০২ তাইতো?’

‘হ্যাঁ সিরিয়ালি ভর্তি হবে ৫০১, ৫০২, ৫০৩ এভাবে।’

‘আপনের দুলাভাইয়ের ওয়েটিং লিস্টে সিরিয়াল ছিলো ৮০৭, আপনের শ্বশুর

অথরিটিরে ম্যানেজ কইরা বারো লক্ষ ট্যাকা ক্যাশ দিয়া মেডিকেলে ভর্তি করাইছে। বুঝলেন।’

‘কিছু টাকা স্পিডমানি লেগেছিলো আমি শুনেছি; কিন্তু তাই বলে বারো লক্ষ! বাবারে!’

‘এখন আপনের দুলাভাইয়ের মতো প্রচুর বলদ শ্বশুরের ট্যাকায় ডাক্তার হইছে, আর চর্ম রোগীর চিকিৎসা করাইতে যায়া যমদূতের এজেন্টের কাম করতাছে।’

‘তুই খালি আমার দুলাভাইয়ের দোষ দেখছিস, খতনা করাতে গিয়ে বাচ্চাটাকে খুন করলো এইটা দেখবি না! টিউমার মনে করে কিডনি কেটে ফেলে এটা তোর চোখে পড়ে না!’

‘সবই তো চোখে পড়ে। তাই তো আমরা চেয়ারম্যান স্যারের মতো নতুন সেøাগান চালু করেছি যে, যারা যেই কাজে যোগ্য সে সেই কাজ করো, আর যোগ্য নাহলে সরে পড়। নিজে কাজটা পারবো না, আবার কাউকে করতেও দিবো না তা চলবে না।’

‘ঠিক ঠিক, এখন স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে হলে যোগ্য লোক দরকার। অযোগ্য আত্মীয়স্বজন, ঘুষ খেয়ে বলদ ছাত্রগুলোরে মেডিকেলে ভর্তি করলে চিকিৎসা ব্যবস্থার এই হবে। দেশের বারোটা বাজবে। তুই ঠিকই বলেছিসÑ চেয়ারম্যান স্যারের কথামতো এখন বাংলাদেশের সেøাগান হওয়া উচিত ‘করো নয় সরো।’

[লেখক : চলচ্চিত্রকার]

সম্প্রতি

আরও খবর