যৌন নিপীড়ন, প্রশাসনিক-একাডেমিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে ‘লাল কার্ড’ দেখিয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীরা। সব ধরনের নিপীড়নের দ্রুত তদন্ত ও বিচার দাবি করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির সব সদস্যের পদত্যাগ দাবি করেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা কাকে ‘লাল কার্ড’ দেখাল, কেন দেখালো। নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে, একশ্রেণীর শিক্ষকদের বিরুদ্ধে তাদের এত ক্ষোভের কারণ কী?
জবির আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ফাইরুজ সাদাফ অবন্তিকার আত্মহত্যার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়নের আরও ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে। এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছে একজন শিক্ষার্থী। হয়রানির ঘটনার বিচার চেয়েও প্রতিকার মেলেনি বরং তাকে পরীক্ষায় ফেল করিয়েছেন দুই শিক্ষক; দিয়েছেন বহিষ্কারের হুমকিÑ উক্ত শিক্ষার্থী করেছে এই অভিযোগ। এসবের প্রতিকার চেয়ে রাষ্ট্রপতি ও আচার্য বরাবর আবেদন করেছে সেই শিক্ষার্থী।
অবন্তিকার অভিযোগ ছিল তার এক সহপাঠীর বিরুদ্ধে। এর প্রতিকারের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলামের কাছে আইন বিভাগের চেয়ারম্যানের মাধ্যমে অবন্তিকা আবেদন করে। কিন্তু সহকারী প্রক্টর তাকে ধারবাহিকভাবে মানসিক নিপীড়ন করে গেছেন। অনেকে মনে করছেন, সেই শিক্ষার্থী ভিকটিম ব্লেমিংয়ের শিকার হয়েছে।
শিক্ষার্থী নিপীড়নের ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে যেÑ কী বিশ্ববিদ্যালয় আমরা তৈরি করেছি যেখানে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী কোনো ন্যায় বিচার পায় না। নিপীড়নের শিকার নারী শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়ানোর পরিবর্তে নিপীড়ককে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া হয়। কখনোবা কোনো কোনো শিক্ষকই নিপীড়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের, তাদের দায়িত্বহীনতার কারণে একজন শিক্ষার্থীকে প্রাণ দিতে হয়।
শুধু এই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, অতীতে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষার্থীদের নানাবিধ সমস্যা সমাধানে কোনো কোনো প্রক্টর অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা অক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন। অভিযোগ আছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক অযোগ্য-অক্ষমদের হাতে দায়িত্ব দেয়া হয়। এই শ্রেণীর ব্যক্তি যে কোনো ঘটনায় শিক্ষার্থীর স্বার্থ না দেখে গোষ্ঠী বা ব্যক্তিস্বার্থ দেখে। কেউ অপরাধ করলে তার অপরাধ আড়াল করার অপচেষ্টা করে। ভুক্তভোগীকেই নানাভাবে হয়রানি করা হয়। এটা কী ধরনের প্রশাসন যারা অপরাধীকে প্রশ্রয় দেয়, নিজেরাই অপরাধ করে! বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হতাশজনক ভূমিকার কারণেই অবন্তিকাদের ন্যায়বিচারের আশা ছেড়ে দিতে হয়। কাউকেবা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দ্বারস্থ হতে হয়।
আমরা বলতে চাই, কোনো শিক্ষার্থীর যে কোনো সমস্যা-সংকটকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। বিশেষকরে যখন একজন শিক্ষার্থী তার শিক্ষক বা সহপাঠীর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলে সেটাকে অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া উচিত এবং এর দ্রুত প্রতিকার করা উচিত। অবন্তিকা প্রতিকার পেলে তাকে হয়তো আত্মহত্যা করতে হতো না।
জবির ভিসি বলেছেন, অবন্তিকার অভিযোগ নিয়ে প্রক্টর অফিসের ‘অবহেলার’ তদন্ত হবে। আমরা আশা করব, তদন্ত সুষ্ঠু হবে এবং তার ভিত্তিতে দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।
আর কোনো অবন্তিকাকে যেন ‘টেকনিক্যাল মার্ডারের’ শিকার হতে না হয় সেটাই আমাদের চাওয়া। মৃত্যুর আগে অবন্তিকা লিখে গেছে, ‘এটা সুইসাইড না, এটা মার্ডার। টেকনিক্যালি মার্ডার।’



