‘লাশকাটা ঘর’ ও ‘অন্ধ তীরন্দাজ’খ্যাত কথাশিল্পী কায়েস আহমেদ জীবন সংগ্রামে পরাস্ত হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। একথা প্রমাণে অনেকেই বদ্ধপরিকর যে, তিনি জীবনসংগ্রাম থেকে পালিয়ে যাবার জন্যই এই পথ বেছে নিয়েছেন। চারটি প্রকাশিত গ্রন্থের ২৩টি গল্প পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার পর এটা প্রতীয়মান হয় যে, কায়েস আহমেদ সমকালীন জীবন বাস্তবতায় মধ্যবিত্ত মানসের যে রক্তক্ষরণ তার নৃশংসতার ছবি নির্মোহভাবে এঁকেছেন তাঁর লেখায়।
সমকালীন বাংলা গদ্যসাহিত্যে কায়েস আহমেদ সেলিব্রেটি লেখক ছিলেন না। প্রান্তিক মানুষদের বৈচিত্র্যহীন জীবনগাথা নিয়ে লিখে সেলিব্রেটি লেখক হওয়া যায় না। বিভাগোত্তর ষাটের দশকের বাঁক বদলে যাওয়া সাহিত্যের পাটাতনে কায়েস আহমেদ নতুন ভাবনা নিয়ে সক্রিয় ছিলেন নিজের সৃষ্টিশীলতায়
ষাট থেকে নব্বইয়ের দশকের আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক প্রেক্ষাপটের রক্তাক্ত ও টালমাটাল অবয়ব তাঁর লেখনীর পরতে পরতে দেখা যায়। তাঁর অংকিত চরিত্রসমূহ প্রতিনিয়ত জীবনসংগ্রামে জর্জরিত হয়ে এক দুঃসহ অবস্থার ভেতর নিজেদের অসহায়ত্বের কাছে সমর্পণ করে, করতে বাধ্য হয়। তাই কায়েস আহমদের আত্মহননকে পলায়ন হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। লুটেরা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নগ্ন ছোবলে বিক্ষত মধ্যবিত্ত সমাজের শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার অনিবার্য পরিণতি ছিলো এই আত্মহনন।
দুই.
একজন সচেতন লেখক সবসময় সমাজের একজন অগ্রসর চেতনার মানুষ। সাধারণ চিন্তার অধিকারী আমজনতা থেকে একজন লেখক চিন্তার দিক থেকে অনেক এগিয়ে থাকে। এজন্য লেখকের অন্তর্দৃষ্টি সমাজ ও মানবজীবনের পরতে পরতে ঘটে চলা ঘটনার গূঢ়ত্বকে গভীর অনুসন্ধিৎসা সহকারে পর্যবেক্ষণ, ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করে থাকে। তাই লেখকের দেখা ও উপলব্ধির সাথে গড়পড়তা ভাবনার মানুষদের ব্যাপক অমিল কিংবা দূরত্ব দেখা যায়। সবযুগে সব সমাজে চিন্তাশীল ব্যক্তিদের সাথে আটপৌরে জীবনের কাঙাল মানুষদের মনোজগতের ফারাক প্রকটভাবে দৃশ্যমান।
কায়েস আহমেদও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশান্তরিত জীবনে শেকড়ের দগদগে ঘা নিয়ে এক তিনি যাপন করেছেন এক উন্মূল জীবন যাতে সীমাহীন নিরাশা ছিলো রূঢ় বাস্তবতা। এই বাস্তবতা নিরন্তর রক্তক্ষরণ, অনিশ্চয়তা আর দুঃস্বপ্ন দিয়ে নকশিবোনা। মানুষের তৈরি শ্বাসরুদ্ধকর এক প্রতিকূল সমাজব্যবস্থায় স্বপ্নহীন মানুষদের তিলে তিলে হত্যা করে। কায়েস আহমেদের মতো লক্ষ লক্ষ ক্ষত-বিক্ষত মানুষ প্রতিনিয়ত সকল কোলাহল, সকল উচ্চকিত উচ্চারণের অন্তরালে নিভৃতে নীরবে হত্যা কিংবা আত্মহননের চোরাবালিতে হারিয়ে যাচ্ছে তার হিসাব কেউ রাখে না। কিন্তু জানাজানি হবার পর সকলে চমৎকার অপবাদের, দোষারোপের ঢালি সাজিয়ে বসে পড়ে। কায়েস আহমেদও তা থেকে মুক্তি পান নি।
দুই
আবুল বাশার ও ইভান বুনিনের মতো ভবিষ্যৎহীনতা মানুষকে কেমন বিহ্বলতার ভেতর দিয়ে সমাপ্তির দিকে টেনে নিয়ে যায় তা কায়েস আহমেদের অঙ্কিত চরিত্রসমূহেও জ্বলজ্বল করে। মানুষ নিজের তৈরি সামাজিক পদ্ধতির ভেতরে পড়ে হাঁসফাঁস করে, আকণ্ঠ নিমজ্জিত পঙ্কিলতা থেকে বাঁচার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে কিন্তু স্বনির্মিত খাঁচা তাকে মুক্তি দেয়া না বরং নিয়মে নাগপাশে বেঁধে পিষতে থাকে। অননোপ্যায় মানুষ নিজেকে নিজের অসহায়ত্বের কাছে সমর্পণ করে।
কায়েস আহমেদ জীবনের তাড়না থেকে লিখতেন, লিখতেন দৃশ্যমান বাস্তবতার তীব্র কষাঘাতে যা তিনি তাঁর ‘অন্ধ তীরন্দাজ’ বইয়ে ‘নচিকেতাগণ’-এ বলেছেন- “একটা ব্যাপার আমি নিশ্চিত, যতদিন বেঁচে থাকব লিখে যেতে হবে আমাকে, না লিখলে জীবনের এত যে চাপ, প্রতিমুহূর্তে এত লাঞ্ছনা, এত অপমান, ঘৃণা, হতাশা, ভালোবাসা, সাধ, স্বপ্ন এসব ধারণ করবো কীভাবে? কাজেই লিখতে হবে আমাকে”। (পৃঃ ১৯৭)।
জীবনের অন্তহীন লাঞ্ছনা, অপমান, ঘৃণা, হতাশা, ভালোবাসা, সাধ, স্বপ্ন ধারণ করার জন্যই লিখেছেন তিনি, লেখেন প্রত্যেক আত্মসচেতন ও সমাজদ্রষ্টা লেখক। একজন সংবেদনশীল লেখককে তার পারিপার্শ্বিক জীবন বাস্তবতা প্রচণ্ডভাবে আলোড়িত, আন্দোলিত, উদ্বেলিত করে। মানুষের হাহাকারগুলো, দীর্ঘশ্বাসের কণাসমূহ তার নিঃশ্বাসে, চেতনার কোষে কোষে, রক্তপ্রবাহে ছলকে ছলকে ওঠে। তাই কায়েস আহমেদের সৃষ্ট চরিত্রগুলো দ্রোহে জ্বলে ওঠে। শ্রেণি শোষণে, লুটেরাদের নির্লজ্জ লুণ্ঠনে, সমাজপতিদের ভণ্ডামিতে তারা ক্ষিপ্ত হয় কিন্তু সংঘবদ্ধ হয়ে শ্রেণিযুদ্ধে অবতীর্ণ হয় না, হতে পারে না। ক্ষোভে ক্ষবিক্ষত হয় কিন্তু প্রতিরোধে জ্বলে ওঠে না। পাতিবুর্জোয়ারা বুর্জোয়াদের অনুকম্পাকামী, পৃষ্ঠপোষকতাকামী, পদানত ও নতজানু। তারা হয় মধ্যস্বত্বভোগী নয়তো ছাপোষা কেরানী, হাতকচলানো শ্রমিক যে একদিন মিলমালিক হবার স্বপ্ন দেখে। অবিকশিত পুঁজিবাদ অবক্ষয়ের চাষাবাদ করে নিম্নমধ্যবিত্ত-মধ্যবিত্ত চিত্তে ও মননে। কায়েস আহমেদ তাদের চিত্রিত করেন ঋজু ভাষায় ও ভঙ্গিতে।
তিন
সমকালীন বাংলা গদ্যসাহিত্যে কায়েস আহমেদ সেলিব্রেটি লেখক ছিলেন না। প্রান্তিক মানুষদের বৈচিত্র্যহীন জীবনগাথা নিয়ে লিখে সেলিব্রেটি লেখক হওয়া যায় না। বিভাগোত্তর ষাটের দশকের বাঁক বদলে যাওয়া সাহিত্যের পাটাতনে কায়েস আহমেদ নতুন ভাবনা নিয়ে সক্রিয় ছিলেন নিজের সৃষ্টিশীলতায়। মাত্র ৭টি গল্প নিয়ে ১৯৭৮ সালে তার গল্পগ্রন্থ ‘অন্ধ তীরন্দাজ’ প্রকাশিত হয়- যাত্রা, বন্দী দুঃসময়, খঞ্জ রোদে শালিক ফড়িং, বিবমিষা, অন্ধ তীরন্দাজ, সম্পর্ক ও গন্তব্য।
উপরোক্ত সাতটি গল্পের ভেতর দিয়ে গড়ে উঠেছে কায়েস আহমেদের লেখক চরিত্র। জৌলুসপ্রখর জীবনধারার বিপরীতে গতানুগতিক মানুষদের জীবনের চালচিত্র উঠে এসেছে গল্পসমূহে। ‘যাত্রা’ গল্পটির নির্মাণে গন্তব্যচ্যুত জীবনের ঘেরাটোপে আটকে যাওয়া মানুষের অগস্ত্য যাত্রাটাই মুখ্য হয়ে ওঠে। বিপন্নতার বিস্তার ঘটে গল্পের পরতে পরতে।
…“অপরিচিত নির্বিকার লোকটিকে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি কোথায় যাবেন ভাই?’ অনুভব করে তার স্বর কাঁপা, শুকনো এবং এলোমেলো। লোকটি কোন উত্তর না দিয়ে আঙুল বাড়িয়ে সামনের কুয়াশায় ঢাকা অন্ধকার শূন্যতার প্রতি নির্দেশ করে। ফলে আরো বিপন্ন হব।… কিন্তু কোন উপায় নেই, কেননা তার শক্তি ক্রমশ: অবলুপ্ত হ’য়ে আসছে এবং ঝুলন্ত হাত দুটো লোকটার খসখসে শক্ত মুঠির ভেতর বন্দী। খাদের পানির গভীরতা বেশি নেই, কিন্তু তার বারবার মনে হ’তে থাকে লোকটা খুন করে এই খাদে।”
বিপন্নতার সংস্কৃতি সমাজের গভীরে এতো বেশি বিস্তৃত হয়েছে যে সমকাল সচেতন কায়েস আহমেদ নিপুণভাবে তা চিত্রিত করেছেন তাঁর ‘যাত্রা’ গল্পে এবং বলা যায় যে তাঁর তেইশটি গল্পের পটভূমি রচিত হয়েছে সমকালের মানুষ, সমাজ ও রাষ্ট্রের রক্তক্ষরণের তুলিতে। তাঁর প্রতিটি গল্পে বিপন্নতা এক অলঙ্ঘ্যনীয় সিগনেচার হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে।
‘বন্দী দুঃসময়’ গল্পে বাবুল চরিত্রের আটাশ বছরের নারী সংস্পর্শহীন যুবকের আত্মবিপন্নতা সুঁইয়ের খোঁচায় দগদগে হয়ে ওঠা ঘায়ের মতো ছড়িয়ে আছে পরতে পরতে। আটাশ বছরের বঞ্চিত জীবনের নিঃস্বতার রক্তক্ষরণে নির্জীব হয়ে পড়া দেহটি তার বিপন্ন বিলাপে মর্মরিত হয়। সে ঘুমঘোরে স্বপ্ন দেখে… টেবিলের ওপর পানির বৃত্তের ভেতর বন্দী পিঁপড়ে আঁকুপাকু করছে বেরুবার জন্যে, আর লম্বা একটা আঙুল বৃত্তটাকে ছোট করে আনছে, ক্রমেই ছোট করে আনছে।”
সময়ের কাছে, সিস্টেমের কাছে, বিধিবদ্ধতার কাছে কর্মজীবী, প্রান্ত্যজ, উন্মূল মানুষ বিপন্ন জীবনের নিগড়ে বন্দী হয়ে বাঁচে মাথাজলে নাক উঁচিয়ে, শ্বাসরুদ্ধ জীবন। প্রাত্যহিক জীবনের নানান টানাপোড়েন, অভাব আর ক্ষুধার কাছে পরাজিত মানুষ প্রতিনিয়ত তিলে তিলে নিজেকে নিঃশেষ করে চলেছে। তারপরও তারা ছুটছে বেঁচে থাকার অনিবার্য লড়াইয়ে। তবুও বিপন্নতা তাদের নিত্যসঙ্গী। ‘খঞ্জ রোদে শালিক ফড়িং’ গল্পে কায়েস মানুষের এই বিপন্নবোধকে জীবন্ত করে তুলেছেন নিপুণভাবে।
“খবর জানেন, লোকজন দুটো ভাতের আশায় রুগী হবার জন্যে হাসপাতালে ভিড় করছে।”
“হ্যাঁ, আজকের কাগজে আছে, মানুষ ঘাস সেদ্ধ খাচ্ছে। কী করে যে বাচঁবে মানুষ?”
“আর বাঁচা!”
বিপন্ন উপদ্রুত জনপদে মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে অপমৃত্যু যেন সকল যন্ত্রণা থেকে মুক্তির এক অনিচ্ছুক সমাধান হিসেবে বিবেচিত হয়। সার্বক্ষণিক মানসিক চাপ, ব্যর্থ লড়াই, অপমান ও বেঁচে থাকার অর্থহীনতা মানুষকে আত্মহননে প্ররোচিত করে।
‘খঞ্জ রোদে শালিক ফড়িং’গল্পের পরিণতি উপরোক্ত বক্তব্যকে সমর্থন করে। গল্পের শেষাংশে দেখা যাচ্ছে, ট্রেনে কাটা পড়ে একটা লোক মারা গেছে। আর লোকজন কৌতূহলী হয়ে ভিড় জমাচ্ছে। বর্ণনাটা এমন- “মাথাটার কিছু আর বলতে গেলে, হাত কয়েক দূরে টিনের কৌটোর মতো ভেঙে লুমড়ে একশা হয়ে লাইনের সঙ্গে মগজ সুদ্ধু চেপ্টে গেছে। সবচেয়ে আশ্চর্য হ’লো এই যে, মাথা এবং মুখ-মণ্ডলের এতোসব পরিবর্তন হয়ে গেলেও একটি চোখ অক্ষত হ’য়ে রেল লাইনের গায়ে থ্যাঁতলানো চামড়ার সঙ্গে ঝুলে রয়েছে। যেনো লোকগুলো কাণ্ড দেখছে অবাক হয়ে! সেদিকে চেয়ে ছোকরা মতো একজন জিজ্ঞেস করে-কাউকে উদ্দেশ্য ক’রে নয়, জনতার আদালতে অভিযোগ পেশ করার মতো ক’রে বলে, ‘কিন্তু লোকটার এভাবে মরার কারণ কী।”
“প্রশ্ন ক’রে সে আর সেই আশ্চর্য বিস্ফারিত চোখটির দিকে দ্বিতীয়বার তাকায় না। জনতার ভেতর থেকেই প্রৌঢ় একজন, কপাল ও মুখের বলিরেখায় কুঞ্চন তুলে উত্তর দেয়, ‘মানুষের মরার জন্য কি কারণের অভাব? বেঁচে যে আছি এইতো ঢের!”
চার
‘খঞ্জ রোদে শালিক ফড়িং’গল্পটি যেনো কায়েস আহমেদের জীবনাবসানের পূর্বপরিকল্পনার একটি সচেতন রূপকল্প। বাস্তবিকই কায়েস আহমেদ রেলে কাটা পড়ে তাঁর স্বপ্নবাজ জীবনের অবসান ঘটান (জুন ১৪, ১৯৯২)। আত্মীয় স্বজনহীন নিঃসঙ্গ জীবনের বিপন্নতা থেকে মুক্তি ঘটান।
কায়েস আহমেদ যখন আত্মহত্যা করেন তখন তার লেখক পরিচিতি গড়ে উঠেছে এবং কথাসাহিত্যিক হিসেবে একটা অবস্থান তৈরি হয়েছে। তাহলে কেন আত্মহননের পথ বেছে নিলেন?
লেখক-কবিদের আত্মহত্যা প্রবণতার উপর প্রচুর গবেষণা আছে যেখানে লেখকদের আত্মহত্যার মনস্তাত্ত্বিক বিষয়াদি অগ্রাধিকার পেয়েছে। ডাক্তার রাশমি পারমার তার প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধ, এক্সপ্লোরিং থটস এন্ড ফিলিংস ইনসাইড এ সুইসাইডাল মাইন্ড (সায়ক্রিয়াটিক টাইমস, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২১) এ উল্লেখ করেছেন যে,
“১৯৯০ সালের প্রবন্ধে সামাজিক মনোবিজ্ঞানী রয় বাউমিস্টার আত্মহত্যাকে ব্যাখ্যা করেছিলেন এমন এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে, যার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হলো “অসহনীয় আত্মসচেতনতা থেকে পলায়ন।” তাঁর মতে, যখন জীবনের বাস্তব ঘটনা ব্যক্তির প্রত্যাশার তুলনায় চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়, তখনই আত্মবিধ্বংসের যাত্রা শুরু হয়। ব্যর্থতার জন্য আত্মদোষ আরোপিত হয়, এবং তার সঙ্গে যুক্ত হয় গভীর যন্ত্রণাময় আত্মসচেতনতা ও একপ্রকার আত্মঘৃণা” (রয় বাউমিস্টার, সুইসাইড এজ এস্কেপ ফ্রম সেলফ, সাইকোলোজিক্যাল রিভিউ, ১৯৯০)।
“এই মানসিক অবস্থাই এক তীব্র নেতিবাচকতার জন্ম দেয়, যা এতটাই অপ্রতিরোধ্য যে মানুষ তা থেকে মুক্তি পেতে যেকোনো কিছু করতেও প্রস্তুত হয়। তখন সে প্রবেশ করে কগনিটিভ ডিকনস্ট্রাজশন বা জ্ঞানভিত্তিক অবক্ষয়ের স্তরে- যেখানে চিন্তন সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে কেবল খণ্ডিত বাস্তবতায়, যুক্তি হয়ে ওঠে কঠোর ও যান্ত্রিক, আর অর্থবোধের প্রতি জন্ম নেয় গভীর বিতৃষ্ণা। মানুষ তখন সচেতন আবেগ ও আত্মবোধকে একপাশে সরিয়ে রাখে, হয়ে ওঠে অযৌক্তিক ও অসংযমী। এই প্রক্রিয়ায় আত্মহত্যা তার কাছে আর কোনো চূড়ান্ত বিভীষিকা নয়, বরং স্বাভাবিক মুক্তির পথ- নিজেকে এবং নিজের অসহনীয় যন্ত্রণাকে অতিক্রম করার একমাত্র উপায়।”
কায়েস আহমেদ জীবনের অর্থহীনতায় ব্যথিত হয়ে এবং উন্মূল জীবনের যুদ্ধে হার মেনে নিজেকে থামিয়ে দিয়ে এটা প্রমাণ করেছেন যে, বিধিবদ্ধতার শেকলে বন্দী মানুষের বিকশিত হবার সকল পথ যখন অবরুদ্ধ তখন সকল নেতির বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রেরণার মৃত্যু ঘটে।
পাঁচ
কায়েস আহমেদের অকাল প্রস্থান খুবই বেদনাদায়ক। লড়াই সংগ্রাম ছিলো, ছিলো গভীর আত্মক্ষরণ, নিঃসংগতাও ছিলো কিন্তু পাশাপাশি তাঁর বাংলাসাহিত্যে আরো ব্যাপক অবদান রাখার সম্ভাবনাও ছিলো।
কায়েস আহমেদের গল্প সম্পর্কে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বলেন,
“প্রথম বইতে দেখি, গল্প বলার, জমিয়ে গল্প বলার একটি রীতি তিনি প্রায় রপ্ত করে ফেলেছেন। আভাস পাওয়া যায় এই রীতিটিই দাঁড়িয়ে যাবে একটি পরিণত ভঙ্গিতে, পাঠককে সেঁটে রাখার যাদু তিনি আয়ত্ব করে ফেলেছেন। … পরের বইতেই নিজের রীতিকে, কিংবা প্রায় রপ্ত রীতিকে অবলীলায় ঠেকে কায়েস পা বাড়িয়েছেন নতুন রাস্তার দিকে। তার এসব কাণ্ড কিন্তু আঙ্গিক নিয়ে পরীক্ষা করার জন্য নয়, মানুষের ভেতরটাকে খুঁড়ে দ্যাখার তাগিদেই একটির পর একটি রসায়ন, তার ক্লান্তিহীন পদসঞ্চার।”
গল্প বলা এবং আখ্যানের যাদুময় বিস্তারে পাঠককে নিমগ্নতার ভেতর দিয়ে চৈতন্যের দুয়ারে পৌঁছে দিতে সক্ষম ছিলেন কায়েস আহমেদ। সমাজ পাল্টানোর প্রচ্ছন্ন অভিলাষ তাঁর লেখায় ঝলসে উঠলেও শ্রেণি সংগ্রামের সংগঠিত কোনো লক্ষ্যাভিমুখ তাঁর লেখায় দেখা যায় না। শোষিতের জেগে ওঠার সম্ভাবনাকে সুস্পষ্ট করে তুলেছেন, সমাজের অসঙ্গতিকে নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছেন কিন্তু যূথবদ্ধ লড়াইয়ের কোনো দিকনির্দেশনা খুঁজে পাওয়া যায় না। এটা অবধারিত সত্য যে, লেখকের কাজ নয় শ্রেণি সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়া। বরং শিল্পসম্মতভাবে বিদ্যমান ব্যবস্থার অসংগতিসমূহকে নির্ণীত করাই লেখকের সামাজিক দায়শীলতার মধ্যে থাকে। একজন লেখক একটি সমাজ ও রাষ্ট্রের সমকালীন বাস্তবতার মধ্যে বসবাস করে তাই ঘটমান বর্তমান তার চিন্তায় ও কর্মে যৌক্তিক প্রভাব প্রতিফলিত হয়। কায়েস আহমেদের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। একটি বিপন্ন সময় বাস্তবতা তাঁর পুরো সৃষ্টিশীলতার মধ্যে জীবন্তভাবে বিরাজমান। সুতরাং কায়েস আহমেদ বাংলাসাহিত্যে বিপন্ন সময়ের রূপকার হিসেবে নিজের স্বীয় অবস্থানটি তৈরি করে গেছেন। পলায়নবাদী লেভেল দিয়ে নয় তার অংকিত বিপন্ন সময়ের মূল সুর ও এই সময়ের স্পন্দন অনুভবের মাধ্যমেই কায়েস আহমেদকে মূল্যায়ন করতে হবে।



