সুকুমার বড়ুয়ার ছড়া
এমন যদি হতো
এমন যদি হতো
ইচ্ছে হলে আমি হতাম
প্রজাপতির মতো।
নানান রঙের ফুলের ’পরে
বসে যেতাম চুপটি করে
খেয়াল মতো নানান ফুলের
সুবাস নিতাম কতো।
এমন হতো যদি
পাখি হয়ে পেরিয়ে যেতাম
কত পাহাড় নদী।
দেশ বিদেশের অবাক ছবি
এক পলকের দেখে সবই
সাতটি সাগর পাড়ি দিতাম
উড়ে নিরবধি।
এমন যদি হয়
আমায় দেখে এই পৃথিবীর
সবাই পেত ভয়।
মন্দটাকে ধ্বংস করে
ভালোয় দিতাম জগৎ ভরে
খুশির জোয়ার বইয়ে দিতাম
এই দুনিয়াময়।
এমন হবে কি?
একটি লাফে হঠাৎ আমি
চাঁদে পৌঁছেছি!
গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে
দেখেশুনে ভালো করে
লক্ষ যুগের অন্ত আদি
জানতে ছুটেছি।
মুক্তিসেনা
ধন্য সবাই ধন্য
অস্ত্র ধরে যুদ্ধ করে
মাতৃভূমির জন্য।
ধরল যারা জীবনবাজি
হলেন যারা শহীদ গাজি
লোভের টানে হয়নি যারা
ভিনদেশিদের পণ্য।
দেশের তরে ঝাঁপিয়ে পড়ে
শক্ত হাতে ঘায়েল করে
সব হানাদার সৈন্য
ধন্য ওরাই ধন্য।
এক হয়ে সব শ্রমিক কিষাণ
ওড়ায় যাদের বিজয় নিশান
ইতিহাসের সোনার পাতায়
ওরাই আগে গণ্য।
দূষণের আধিপত্য
গোলাম কিবরিয়া পিনু
বায়ু দূষণের এলাকা ছেড়ে এলাম
কী-এক যন্ত্রণায়!
ওখানে নিঃশ^াস নেওয়া যাচ্ছিল না আর!
বারবার ধেয়ে আসছিল‘
দূষণের আধিভৌতিক আধিপত্য!
অধিকাল ধরে কালজ্ঞ প্রতাপে
ফুসফুসওয়ালা লোকেরা বাঁচতে পারে না,
আমিও দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিলাম!
ও পরিবেশে শুধু আত্ম-অবমান!
অরবিন্দ ফুটতে পারছিল না
কোনো সরোবরে,
আঁকুবাঁকু নিয়ে নিমগাছেও
নিমফুল ফুটতে পারছে না,
সকল গাছই উচ্ছিন্ন প্রায়!
ও পরিবেশকে আত্মীয় ভেবে‘
আর আত্তীকরণ করতে পারিনি!
আমি তো ওখানে অংশীজন হতে পারিনি,
এমন কি আশ্রিতজনও না!
প্রিয় চিঠিগুলি
সোহরাব পাশা
প্রিয় চিঠির প্যাকেট নিয়ে হঠাৎ উধাও হলো
পোস্টাপিস
স্বপ্নছেঁড়া স্মৃতির ভিতর মুগ্ধ রূপক প্রতীকে
নিভৃত পঙক্তিমালা, গূঢ় বৃত্তান্ত, আর্তনাদ
শোনে না কেউ
নিঃস্ব ঝিমোয় হাটুরে সন্ধ্যা
পৃথিবীর ওই পথেই রাত্রিরা ফেলে রুগ্ণ ছায়া,
দূরে অবিশ্বাসের তিমিরে উড়ছে তোমার শরীরের ঘ্রাণ
অন্ধ কুয়াশার নিচে খুব ক্লান্ত বিষণœ পৃথিবী
মানুষ ভুলে গেছে শীত ও বসন্তের জ্যামিতি,
সব বাড়ির দরোজা ঘুমিয়ে পড়েছে অবেলায়
তোমাকে ডেকেছে বিনিদ্ররাত্রির ভোরের পাখিরা
ফিরে গেছে কোলাহল, ঘুম ভাঙেনি তোমার:
দুপুরের রোদে ঘুরে ক্লান্ত পিয়ন চিঠি ফেলে গেছে
তোমার নিশ্চুপ দরোজায়,
সবাই কী ভুলে গেছে প্রিয় গল্পের দিন
কবরে, শ্মশানে,শিশিরে, ধুলোয় ঘাসে নুয়ে পড়া
গোধূলির শেষ রোদ ফিরে যাচ্ছে ফের দূর অন্ধকার দিগন্তে‘
ছোট ছোট নিঃশ্বাসের গাঢ় শব্দে, তোমার বুকেরগন্ধে
ভেজা চিঠির সব অক্ষর। দরোজাটা খোলো,
বাইরে এখনো স্নিগ্ধ নরম রোদ্দুর‘!
সমুদ্রসংসার
আসিফ নূর
ফুটফুটে পূর্ণিমা আর ঘুটঘুটে অমাবস্যার ভরাকটালে
ফুলেদুলে ওঠা সামুদ্রিক জোয়ারের উত্তুঙ্গ উচ্ছ্বাসলগ্নে
পোয়াতি মেয়েমাছেরা মোহনায় খুঁজে নিয়ে নিরাপদ ঠাঁই,
অসহ্য গর্ভজ¦ালায় ডিমটুকু ছেড়ে দিয়ে নিজেকে বাঁচায়।
ঢেউদের নাগরদোলায় অবিরাম ভাসা-ডোবায় ডিম ভেঙে
সীমাছাড়া জলরাজ্যে ছিটকে পড়ে অগণিত রেণুমাছ‘
নুনফেনায় সাঁতরিয়ে বড় হয় ওরা, যদিওবা কোনোদিন
জননীর সাথে ঘটে না মিলন; বাঁচে পিতৃপরিচয়হীন।
এবং ভেতর কে
মুজতবা আহমেদ মুরশেদ
কবিতার গায়ে লেখা জনমত জরিপের
একটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ব্যতিরেকেই
তোমার কাছে যাবো।
কেননা, অজ্ঞাতনামার ভেতর কীভাবে একটি ঠিকানা বেড়ে উঠলো,
তাই নিয়ে তল্লাটময় উৎকণ্ঠা এখন।
মুচমুচে ঝুড়ি বেচা লোকটি পায়ে ব্যথা সামলে বলেছিলো,
এক উড়–ক্কু জীবনে উদ্দেশ্যহীন যাত্রার সংকেত শুভও হতে পারে।
এতো বিস্ময় ছিলো সে কথার হৃৎপি-ে, বুঝতেই চকিতে মনে পড়লো
ওর চোখ এবং অধরের বাম কোণে অতি অপ্রাসঙ্গিক এক চিলতে হাসি
একদিন ইঙ্গিতে কী যেনো ইতিহাসের পাতা দেখিয়েছিলো।
তাই যদি হয় সত্যের রূঢ়তা, তাহলে
তোমরা যূথবদ্ধতায় এমন কী এক ইতিহাসের চিহ্ন এনে দিতে পারো
যেখানে সাপের পায়ের ছাপ পষ্ট নয়?
একটি ছায়াঘন মুখ
অনিকেত সুর
প্রগতি পৃথ্বীর পথে ফেলে গেছি, অবহেলায়
যতদূর এসেছি ততো তীব্র তার টান তবু
সর্ষে-শিরিষ ঘ্রাণে স্নায়ুর ভেতর
বেড়ে ওঠে কাম
জলকোমলের দেহে জ্বরতপ্ত-হাত‘
ফেরে এক ধেয়ানী বালক
ডাকাতিয়া পথ বেয়ে খাল
শাপলার বিল ছেড়ে পাটগ্রাম
ঘন বাঁশঝাড় ফেলে যেতে যেতে
ক্রৌঞ্চ স্বরাজ‘ মতিয়ার দিঘি
ধানের চারার পাশে নত কোমল মুখখানি কার
ভাঁজ খুলে পড়ে প্রিয়তম চিঠি
ঢেঁকিছাঁটা চাল তার হাতের আঙুল।
নদীপথ, শাপলার বিল, বাঁশঝাড়
ধান্যচারার পাশে স্থির সেই ছায়াঘন মুখ
আজও আছে,
বিমূর্ত ছবির ন্যায়, শুধু
উৎস থেকে চারিদিকে
তার ঘনায়িত প্রেতিনী আঁধার…
জলবায়ু বদলের ঢঙে
পাল্টে যাবার এই গল্পে বেবুশ্যের বিক্ষত
যোনির ভেতর ঢুকে গেছে মাঙ্গলিক গ্রাম
ধবধবে শাদা ভাতের অন্ধ থালায় পথহীন
আমাদের আর ফিরবার তাড়া নেই
আড়াল পটের ’পরে ভাসমান
শুধু এক বিমূর্ত মুখরেখা।
কোনদিন দেখা হলে
উম্মে মুসলিমা
হাজার বছর নয়, বছর চারেক আগে তাকে
সিংহল সমুদ্র দেখার কথা বলেছিলাম। একসাথে।
আল্পস পর্বতে উঠতে গিয়ে তার নাকি
কোমর থেকে হাঁটু অবদি প্রায় অচল।
বয়সী মানব, শ্রেয়সী মানবীরা পথ হাঁটে
একা একা একসাথে। তারা কেউ ক্রাচে হাঁটে
কেউ স্কন্ধ বাড়িয়ে দেয় একটুকু ছোঁয়ার আশায়
তারা ডেড ভ্যালি থেকে শফেদ নুন এনে
অ্যাভোকাডো ভর্তা করে গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে
আদিবাসী লোকটার বাসি ব্রেডে মাখিয়ে দেয়।
লোকটার চোয়াল থেকে বলিরেখা সরে যায়।
ক্রাচ ফেলে ক্যানিয়নের সুউচ্চ ছাদে বসে সে পা ঝুলায়
তার ভঙ্গুর কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলি
‘আমাদের সিংহল সমুদ্রে যাবার কথা ছিল না?
অথচ তোমার সাথে কোনদিন আমার দেখাই হলো না’।



