বুধবার সন্ধ্যায় পেশায় ড্রাইভার সজল কাজের জন্য ছিলেন বাইরে। তার স্ত্রী সুমাইয়া ব্যস্ত ছিলেন ঘরে কাজে। এমন সময় বিকট শব্দে ঘটে ওই বিস্ফোরণ। বাইরে কীসের শব্দ শুনতে দৌড় দেয় তাদের সাত বছরের ছেলে তাওহীদ ও পাঁচ বছরের মেয়ে তৈয়বা। এখন তারা আহত আরো ৩২ জনের সঙ্গে অগ্নিদগ্ধ হওয়ার যন্ত্রণা নিয়ে কাতরাচ্ছে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের বিছানায়।
একই ঘটনায় আহত আরেকজন লাদেনের বাবা আব্দুর রহিম এই প্রতিবেদককে জানান, গ্যাস সিলিন্ডারের রেগুলেটর লাগাচ্ছিলেন টিনশেড ঘরের মালিক শফি। ঠিকমতো লাগাতে না পারায় গ্যাস বের হচ্ছিল। আর গ্যাস কিভাবে বের হয় সেটি দেখতে ভিড় করেছিলেন আশপাশের লোকজন। পাশেই লাকড়ির চুলায় রান্না করছিলেন এক নারী। এদিকে আগুন লাগার ভয়ে সিলিন্ডার ঘরের বাইরে ফেলে দেন শফি। আর তখনই সিলিন্ডারটির বিস্ফোরণ হয়। লাদেনের শরীরের ৮৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বেলা ১১ দিকে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, আহতদের স্বজনরা ওয়ার্ড ও আইসিইউয়ের (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) বাইরে অপেক্ষা করছেন।
ওই সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ভাই-বোনসহ দগ্ধ হয়েছেন ময়ুরী বেগম। তার কাছ থেকে জানা যায়, ‘বাড়ির মালিক সিলিন্ডারের রেগুলেটর ঠিক করার সময় গ্যাস বের হতে দেখে সিলিন্ডারটি বাইরে ফেলে দেওয়ার পর যে মহিলা পাশে বসে রান্না করছিলেন, তাকে চুলা বন্ধ করার অনুরোধ করা হয়। কিন্তু তিনি তা শোনেনি।’এছাড়া ইফতারের আগ মুহূর্তে হওয়ায় অনেকে ওই গলি দিয়ে যাতায়াত করছিলেন।
চিকিৎসাধীন ১১ বছরের নাঈমের মা খুশি বেগম বলেন, ‘ঘটনার সময় আমি অফিসে ছিলাম। সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কথা শুনে চলে আসি। আমার ছেলের হাত, পাসহ শরীরের অধিকাংশ জায়গা ঝলসে গেছে।’
গাজীপুরের কালিয়াকৈরের এই ঘটনায় দগ্ধদের অনেকেরই অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সামন্ত লাল সেন। রোগীদের বাঁচাতে জোর প্রচেষ্টা চালানোর তাগিদ দিয়ে তিনি বলেছেন, “দগ্ধ রোগীদের শারীরিক কষ্ট অনেক। প্রতিটি রোগীকে নিজের পরিবারের সদস্যদের মত করে দেখতে হবে।
“অনেকেরই অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। আমরা কিছু রোগীকে হয়ত বাঁচাতে পারব না, কিন্তু কোনো রোগীর প্রতি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমাদের চেষ্টার যেন কোনোরকম অবহেলা না থাকে, এটি আমাদেরকে নিশ্চিত করতে হবে।”
গতকাল বৃহস্পতিবার ইনস্টিটিউটে এ ঘটনায় দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসায় গঠিত বোর্ডের চিকিৎসকদের সঙ্গে সভায় রোগীদের শারীরিক অবস্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসার সার্বিক বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আহতদের চিকিৎসার যাবতীয় ব্যয় বহনের কথাও জানিয়েছেন সরকারপ্রধান।
প্রত্যক্ষর্দশী ও ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে জানা যায়, যে বাসায় ঘটনাটি ঘটেছে, সেখানে গ্যাস বের হতে থাকা গরম সিলিন্ডার ভেজা চট দিয়ে মুড়িয়ে বাইরে রেখে যান পরিবারের কেউ একজন। স্থানীয়দের অনেকে কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে এসেছিলেন কী হচ্ছে সেটা দেখতে।
ইফতারের সময় ঘনিয়ে আসছিল। পোশাক কারখানা থেকে বাসায় ফিরছিলেন অনেক পোশাক কর্মী। তাদের পাশাপাশি ঘটনা দেখতে ভিড় জমিয়েছিল আশপাশের শিশুরাও। সিলিন্ডার থেকে গ্যাস বেরিয়ে যে পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে, তা বুঝতে পারেনি কেউ। সে সময় পাশের আরেকটি চুলা থেকে পুরো রাস্তায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে। তাতেই দগ্ধ হয় সবাই।
দগ্ধ ৩২ জনের মধ্যে পাঁচজন রোগী আইসিইউতে ও দুজন এইচডিইউতে ভর্তি রয়েছেন। শতভাগ দগ্ধ রোগী আছেন একজন, ৯৫ শতাংশ দগ্ধ আছেন তিনজন এবং ৫০-১০০ শতাংশ পুড়েছে এমন রোগী আছে ১৬ জন।
পোড়ার মাত্রা ২০ শতাংশ থেকে ৪৯ শতাংশ হলে সেই রোগীদের ‘রেড’, ৫ থেকে ১৯ শতাংশ পুড়লে ‘ইয়েলো’ এবং ৫ শতাংশের কম হলে ‘গ্রিন’ ক্যাটাগরি রেখে সে অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সভায় বার্ন ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক মুহাম্মদ নওয়াজেস খান, অধ্যাপক খলিলুর রহমান, অধ্যাপক আতিকুল ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক হাসিব রহমান ও হোসাইন ইমাম উপস্থিত ছিলেন।



