বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সিলেট বিভাগচা, পাহাড়, হাওর ও প্রবাসী অধ্যুষিত এই অঞ্চল দেশের অর্থনীতি, পর্যটন ও প্রবাসী যোগাযোগের এক উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। তবু দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও বিমান চলাচলের সংকট সিলেটের এই সম্ভাবনাকে বারবার পিছিয়ে দিচ্ছে।
সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের নাজুক অবস্থা, ট্রেনের আসন স্বল্পতা ও বিমানের টিকিটের উচ্চমূল্যের কারণে দীর্ঘদিন ধরে সিলেটবাসী মারাত্মক দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। বারবার আবেদন-নিবেদন করার পরও সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের কাজে গতি আসেনি। মাত্র পাঁচ ঘণ্টার গন্তব্যে পৌঁছাতে এখন সময় লাগে ১৬ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত। একইভাবে ট্রেনের টিকিট প্রায় সোনার হরিণ, আর সিলেট-ঢাকা বিমান ভাড়ার জন্য যাত্রীদের পরিশোধ করতে হচ্ছে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত।
এই পরিস্থিতিতে আকাশপথের ওপর নির্ভরতা যেমন বাড়ছে, তেমনি বিমান চলাচলের অপ্রতুলতা ও অবকাঠামোগত জটিলতায় তা আরও সংকট তৈরি করছে। ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর: সময় বাড়ে, ব্যয় বাড়ে শেষ হয় না কাজ ১৯৪৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ও ২০০২ সালে আন্তর্জাতিক মর্যাদা পাওয়া সিলেট এম এ জি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর শুধু সিলেট নয়, প্রবাসী অধ্যুষিত সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আবেগ ও গৌরবের প্রতীক। বর্তমানে এখান থেকে যুক্তরাজ্যের লন্ডন, ম্যানচেস্টার ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি রুটে সরাসরি ফ্লাইট চলাচল করছে।
তবে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট সংখ্যা সীমিত, টিকিট সংকট প্রকট, আর অতিরিক্ত ভাড়ায় যাত্রীরা পড়ছেন চরম ভোগান্তিতে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের যানজট ও ট্রেনের বিলম্বের কারণে অনেক যাত্রী বাধ্য হয়ে বিমানে যেতে চান, কিন্তু টিকিট না পাওয়ায় হতাশ হয়ে ফিরতে হয়।
২০১৮ সালের নভেম্বরে বিমানবন্দরটির সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ২,৩০৯ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প অনুমোদন হয়। তবে নকশাগত ত্রুটি, প্রশাসনিক জটিলতা ও ধীরগতির কারণে পাঁচ বছরে অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২২ শতাংশ। প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২,৭৮০ কোটি টাকা, আর মেয়াদ তৃতীয় দফায় বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ২০ লাখ যাত্রী এই বিমানবন্দর ব্যবহার করতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো কাজ শেষ হলে সিলেট কেবল প্রবাসী যোগাযোগের কেন্দ্রই নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ রিজিওনাল এয়ার হাব হয়ে উঠবে। শমশেরনগর বিমানবন্দর: ইতিহাসের গৌরব, বর্তমানের নিস্তব্ধতা
অন্যদিকে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার চা-বাগানঘেরা শমশেরনগরে অবস্থিত বিমানবন্দরটি একসময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বিমানবন্দর হিসেবে পরিচিত ছিল।
১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকার সামরিক ব্যবহারের জন্য ৬২২ একর জমিতে বিমানবন্দরটি নির্মাণ করে। ৬,০০০ ফুট দীর্ঘ ও ৭৫ ফুট প্রশস্ত রানওয়েতে একসময় প্রশিক্ষণ ও যাত্রীবাহী বিমান চলাচল করত। কিন্তু ১৯৬৮ সালের একটি দুর্ঘটনার পর থেকে বিমান ওঠানামা বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে এটি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। রানওয়ে ও সীমান্ত প্রাচীর সংস্কার করা হলেও বড় অংশ পতিত পড়ে আছে; স্থানীয়রা ইজারা নিয়ে সেখানে কৃষিকাজ করছেন।
১৯৯৫ সালে সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের প্রচেষ্টায় বেসরকারি এয়ারলাইনসের একটি স্বল্পমেয়াদি ফ্লাইট চালু হয়, কিন্তু অবকাঠামো ও যাত্রীসুবিধার অভাবে তা টেকেনি।
২০১৬ সালে তৎকালীন বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন ঘোষণা দিয়েছিলেন, এক বছরের মধ্যে শমশেরনগরে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চালু হবে—কিন্তু তা আজও বাস্তবায়িত হয়নি। বিগত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর অন্তবর্তীকালীন সরকার অভ্যন্তরীণ পর্যটন খাতের বিকাশ ও যাত্রী পরিবহণ বাড়াতে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) দেশের বিভিন্ন জেলায় পরিত্যক্ত, অব্যবহৃত ও দখলে থাকা ৭টি বিমানবন্দর—ঈশ্বরদী, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, বগুড়া, শমশেরনগর, কুমিল্লা ও তেজগাঁও—নতুন করে চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। প্রবাসী অধ্যুষিত মৌলভীবাজার জেলার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোক ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত রয়েছেন। যাত্রীসেবার পাশাপাশি ভৌগোলিক কারণে এই বিমানবন্দরের সামরিক গুরুত্বও রয়েছে।
বিমানবন্দরটি চালুর লক্ষ্যে ঢাকা থেকে বিমানবাহিনীর একটি প্রতিনিধি দল সরেজমিনে পরিদর্শন করে গেছেন। তবে দুঃখজনকভাবে, এখনো এর চালুর বিষয়ে কোনো কার্যকর সরকারি উদ্যোগ বা সিদ্ধান্ত দেখা যায়নি।



