সন্ধ্যার পর নেমে এসেছে নরম চাঁদের আলো। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার পূর্ণিমাগাতী ইউনিয়নের ধানক্ষেতে তখন কৃষকদের ব্যস্ততা। কেউ হাতে লণ্ঠন, কেউ বা ব্যাটারিচালিত বাতি নিয়ে ঘুরছেন মাঠে মাঠে। ধানগাছের ফাঁকে জ্বলজ্বল করছে আলোর ছোট ছোট বিন্দু দেখে মনে হয় যেন মাঠ জুড়ে জোনাকির উৎসব। কিন্ত এই আলোর বিন্দুগুলো কোনো সৌন্দর্য নয়, বরং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় কৃষির এক পরিবেশবান্ধব অভিযান আলোক ফাঁদ। এই ‘আলোক ফাঁদথ বা Light Trap হলো এমন এক যান্ত্রিক পদ্ধতি, যার মাধ্যমে কৃষকেরা ফসলের ক্ষতিকর পোকা-মাকড় শনাক্ত করতে পারেন। এটি এক উদ্ভাবনী উদ্যোগ, যা রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব চাষাবাদের পথ দেখাচ্ছে। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উল্লাপাড়ার ৪৩টি কৃষি ব্লকের মাঠে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে একযোগে আলোক ফাঁদ স্থাপন করা হচ্ছে। প্রতিটি ফাঁদে একটি বৈদ্যুতিক বা ব্যাটারি চালিত বাতির নিচে রাখা হয় পানিভর্তি পাত্র। রাতে আলোয় আকৃষ্ট হয়ে পোকা-মাকড় এসে পানিতে পড়ে যায়। পরদিন সকালে কৃষি কর্মকর্তারা শনাক্ত করেন কোন ধরনের পোকা মাঠে বেশি স্টেম বোরার, লিফ রোলার, না কি ব্রাউন প্ল্যান্ট হপার। এই তথ্যের ভিত্তিতেই কৃষকদের জানানো হয়, কখন এবং কীভাবে বালাইনাশক প্রয়োগ করতে হবে। ফলে আন্দাজে ওষুধ ব্যবহার না করে এখন নির্ভুল সিদ্ধান্তে মাঠ ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হচ্ছে। পূর্ণিমাগাতী ইউনিয়নের এক ধানক্ষেতে দেখা যায়, কৃষক মো. মনসুর আলী হাতে আলোক ফাঁদ বসাচ্ছেন। তিনি জানান, আগে আন্দাজে ওষুধ দিতাম কখনও বেশি, কখনও কম। এখন ফাঁদে দেখে বুঝে নিতে পারি কোন পোকা বেশি। এতে খরচও কমে, ফসলের ক্ষতিও কম হয়। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সূবর্ণা ইয়াসমিন সুমী বলেন,
আলোক ফাঁদ কৃষকদের সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করছে। এতে যেমন ফসল বাঁচছে, তেমনি পরিবেশও রক্ষা পাচ্ছে। বাংলাদেশের কৃষি আজ এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে মাটি, পানি ও জীববৈচিত্র্য হারা”েছ তার প্রাকৃতিক ভারসাম্য। এমন সময়ে উল্লাপাড়ার ‘আলোক ফাঁদথ উদ্যোগ হয়ে উঠেছে এক অনন্য উদাহরণ টেকসই কৃষির পথে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আলোক ফাঁদ শুধু ক্ষতিকর পোকা শনাক্তেই নয়, কৃষকের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতেও কার্যকর ভূমিকা রাখছে। অনেক এলাকায় দেখা গেছে, এই পদ্ধতি ব্যবহারে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। কৃষি অফিসের এক উপসহকারী কর্মকর্তা জানান, আগে কৃষকরা পোকা দেখলেই ওষুধ দিতেন। এখন তাঁরা জানেন, সব পোকাই ক্ষতিকর নয় কিছু পোকা প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আলোক ফাঁদ এই জ্ঞান কৃষকের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
উল্লাপাড়ার মাঠে এখন এই আলোক ফাঁদের আলো যেন নতুন আশার প্রতীক। রাতের আকাশে তারার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে এই ক্ষুদ্র বাতিগুলো। কৃষকদের মুখে হাসি আমরা নিজের ফসল নিজেরাই রক্ষা করতে পারি।
এ যেন প্রকৃতি, বিজ্ঞান ও মানুষের এক অনন্য সংযোগ যেখানে কৃষক, কৃষি কর্মকর্তা ও পরিবেশ এক সুতোয় বাঁধা। সেই বন্ধনের আলোয় আলোকিত হচ্ছে উল্লাপাড়ার ধানের মাঠ, জেগে উঠছে বাংলাদেশের কৃষির টেকসই ভবিষ্যৎ।



