টাঙ্গাইলের মধুপুরে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও শ্রেনী কক্ষ সজ্জিত প্রাথমিকের জন্য পৃথক শিক্ষক নিয়োগ থাকা সত্ত্বেও আনুপাতিক হারে বাড়ছে না শিক্ষার গুণগত মান। আশানূরূপ বাড়ছে না শিক্ষার্থী। শিক্ষকদের নানামুখী প্রশিক্ষণ কোর্স করিয়েও শুধুমাত্র আন্তরিক পাঠদানের কারণে কাঙ্খিত হারে বাড়ছে না কোমলমতি শিক্ষার্থীর সংখ্যা। অনুন্নত অবকাঠামো ভাঙা চূড়া টিনের ঝাপের বেড়া দিয়ে গড়া বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন ও নূরানী মাদ্রাসাগুলোতে হুহু করে বাড়ছে ছাত্র-ছাত্রী। অথচ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি প্রাথমিকের চেয়ে অপেক্ষাকৃত দক্ষ-প্রশিক্ষণহীণ শিক্ষকরা মেধা নয় শ্রম দিয়ে এগিয়ে নিচ্ছে, অভিভাবকদের আকৃষ্ট করছে শিখণ লিখনে। যে কারণে অনুপাতিক শিক্ষার্থী পাচ্ছে তারা। অপরদিকে, আধুনিক অবকাঠামো শিক্ষা উপকরণ সরকারি সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত চাকরি ভাবাপন্নতা বেতন প্রাপ্তি বিভাগীয় প্রশিক্ষণ থাকা সত্ত্বেও দায়বদ্ধতা, জবাবদিহিতার অভাব, পাঠদানে কিছু কিছু শিক্ষকের অবহেলা, আন্তরকতার অভাব, অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগের দীর্ঘ সূত্রতা, নূরানী মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠার সরকারি নীতিমালার অভাব, শিক্ষার্থী ভর্তির টার্গেট না থাকা, অনেকগুলো প্রধান শিক্ষকের পদ খালী, অনেক গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকা, রেকর্ডকৃত জমি না পাওয়া, ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি অভিভাবকদের দুর্বলতা, ইসলামি শিক্ষার প্রতি আগ্রহ, নূরানী শিক্ষকদের পড়ানো ধরণ অভিভাবকদের পছন্দ, মাদ্রাসাগুলো অধিক সময় যতœসহকারে পাঠদানসহ নানা কারণে আশানুরূপ বাড়ছে না সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়োর শিক্ষার্থী। এসব তথ্য স্থানীয় অভিভাবক শিক্ষক ম্যানেজিং কমিটিসহ সংশ্লিষ্টদের কথা বলে জানা গেছে। তবে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বলছে, সব স্কুলই এক রকম নয় তবে কিছু শিক্ষক অলস টাইপের থাকতে পারে। তারমতে, ১১০ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬৬ টির প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। ভারপ্রাপ্ত ও চলতি দায়িত্ব দিয়ে চালাতে গিয়ে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তিনি বলেন, অন্যান্য চাকরিজীবনের স্কেলের সাথে পার্থক্য থাকায় শিক্ষকদের বিকল্প কর্মের চিন্তা করতে গিয়ে তারা হতাশায় ভোগে। করোনা কালিন সময়ে স্কুল বন্ধ থাকায় মাদ্রাসাগুলোতে ছাত্র চলে যাওয়ায় প্রভাব পড়ার কথা জানান তিনি । অপর দিকে, জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রান্তিক পর্যায়ে আগামী প্রজন্মকে একটি আনন্দময় শৈশব উপহার দিতে প্রাথমিক স্তরে মধুপুরে ১৫ টি বিদ্যালয়ে মিনি পার্ক করার পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে পরিধি আরো বাড়বে বলে জানিয়েছে উপজেলা নির্বাহী অফিসার। সরজমিনে পাহাড়িয়া এলাকার আমলিতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় পঞ্চম শ্রেনীতে ১০ জন উপস্থিত। চতুর্থতে ১৪, দ্বিতীয় ও তৃতীয়তে ১২, প্রথমে ২১ ও প্রাক প্রাথমিকে ১৩ জন শিক্ষার্থীর উপস্থিতি। এ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক খায়রুল জানালেন, ১০৮ জন শিক্ষার্থী তাদের। উপস্থিতি হার ৮০% এর মতো। স্থানীয় মানুষের সচেতন না থাকায় ধর্মীয় মাদ্রাসার প্রতি অভিভাবকদের আগ্রহ ঝুঁক বেশি।
পিরোজপুর গ্রামের সেলিম উদ্দিন (২৫) জানিয়েছে, তার বাড়ির পাশে সরকারি প্রাইমারী স্কুল থাকতেও তার ছেলেকে নূরানী মাদ্রাসায় পড়তে দিয়েছে। তারমতে, ছোট বাচ্চা সে এক বছরেই অনেক কিছু শিখতে পেরেছে প্রাইমারী স্কুলে পড়াশোনার মান তার কাছে পছন্দসই নয় বলেই ছেলেকে মাদ্রাসায় দিয়েছে বলে জানালেন।
মহিষমারা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও দেশসেরা পুরস্কার প্রাপ্ত কৃষক ছানোয়ার হোসেন বলেন, দায়বদ্ধতা না থাকার কারণে এমনটি হচ্ছে। তারমতে, সরকারি স্কুলের কিছু কিছু শিক্ষকদের সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনে অবহেলা।
টিআইবির সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)’র মধুপুরের সভাপতি বজলুর রশিদ খান চুনু বলেন, শিক্ষকদের আন্তরিকতার অভাবে সরকারি ভাবে অনেক প্রশিক্ষণ দিয়েও এগোচ্ছে না, গুণগত পরির্বতন হচ্ছে না। হোম ভিজিট সঠিক ভাবে না করায় প্রাথমিক শিক্ষায় ব্যবস্থার চিত্র কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁচ্ছে না ।
নূরে মদিনা নূরানী মাদ্রাসা কুঠালপাড়ার মোহতামীম নূরুল আমিন বলেন, তাদেরকে পড়াশোনা দেখিয়ে অভিভাবকদের কাছ থেকে বেতন নিতে হয় তাদের । ফাঁকি দেওয়ার কোন সুযোগ নেই। তাদের পড়াশোনার মান অভিভাবকদের পছন্দসই যে কারণে শিক্ষার্থী বাড়ছে।
প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি পিরোজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু ছাইদ বলেন, শিক্ষকরাই হলো প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নের চাবি কাঠি। তারা আন্তরিক হলে, চেষ্টা করলে মান উন্নয়ন কোন ব্যাপার না।
মধুপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শফিকুল ইসলাম খান বলেন, করোনা কালিন সময় থেকে বিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থী কমছে। সে ধকল কাটিয়ে উঠতে সময় লাগতেছে। অভিভাবকদের মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষার দুর্বলতা, বেহেস্ত পাবার চেতনার কারণে তাদের শিশুদের মাদ্রাসামুখী করাচ্ছে। তবে কিছু কিছু শিক্ষকের আন্তরিকতারও অভাব রয়েছে তবে সীম্বদ্ধতাও রয়েছে। তাদের বেতন স্কেল গ্রেড প্রধান শিক্ষককের পদ শূন্য শিক্ষকদের প্রমোশন না থাকাসহ বিভিন্ন বিষয়ের কারণে এমনটি হতে পারে।
মধুপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার জুবায়ের হোসেন বলেন, প্রাথমিক শিক্ষায় জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে শিশু শিক্ষা বান্ধব পরিবেশ গড়ার জন্য মিনি পার্ক করা হচ্ছে। এতে শিশুরা বিনোদন পাবে পাঠে মনোযোগ বাড়বে।



