মঙ্গলবার, জানুয়ারি ১৩, ২০২৬
হোমখবরসারাদেশবন্যার ভয় নয়, উন্নয়নের স্বপ্নেগড়া উজালডাঙা ক্লাস্টার ভিলেজ

বন্যার ভয় নয়, উন্নয়নের স্বপ্নেগড়া উজালডাঙা ক্লাস্টার ভিলেজ

আফতাব হোসেন, গাইবান্ধা

সম্পর্কিত সংবাদ

উত্তরের জেলা গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার উজালডাঙা চর। একসময় এই চরের নাম উচ্চারণ মানেই ছিল ভয়াবহ বন্যা, নদী ভাঙন আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। প্রতি বছর ঘরবাড়ি হারিয়ে অন্যের জমিতে আশ্রয় নেওয়া, জীবন-জীবিকার লড়াই চালানো ছিল এখানকার মানুষের নিয়তি। কিন্তু এখন দৃশ্যপট বদলে গেছে। নদীর মাঝে গড়ে উঠেছে এক অনন্য কমিউনিটি উজালডাঙা ক্লাস্টার ভিলেজ, যেখানে ৪০টি পরিবার শুধু টিকে নেই, বরং উন্নয়ন, ঐক্য ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের নতুন দৃষ্টান্ত গড়ে তুলেছে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গণউন্নয়ন কেন্দ্র (জিইউকে)-এর বাস্তবায়নে এবং এডব্লিউও-এর সহযোগিতায় গড়ে ওঠা এই ক্লাস্টার গ্রাম এখন উত্তরাঞ্চলের চরবাসীর কাছে আশার প্রতীক।

উজালডাঙা ক্লাস্টার গ্রামটি নির্মিত হয়েছে এমন জায়গায়, যেখানে স্বাভাবিক বন্যার পানিও পৌঁছায় না। উঁচু জমিতে সারিবদ্ধভাবে নির্মিত টিনশেড ঘরগুলো এখন নিরাপদ আশ্রয়স্থল। প্রতিটি পরিবার পেয়েছে নিজস্ব পাকা ল্যাট্রিন, সোলার বিদ্যুৎ লাইন, এবং পাঁচ পরিবার মিলে একটি নলকূপ। নারীদের জন্য রয়েছে আলাদা গোসলখানানা তাদের স্বাস্থ্য ও মর্যাদা দুটোই রক্ষা করছে।

গ্রামের বাসিন্দা আজিজুল হক বললেন, আগে নদীর পানি উঠলেই চিন্তা হতো ঘর থাকতে পারবো না তো? এখন আমরা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারি।

সোলার বিদ্যুতের কারণে গ্রামটি এখন রাতেও আলোকিত। শিশুরা পড়াশোনা করছে, নারীরা হাতে কাজ করছেন, আর পুরুষরা কৃষিকাজের পরিকল্পনা করেন সন্ধ্যার পরও। এ যেন এক নতুন প্রাণশক্তিতে ভরপুর গ্রাম।

সব ঘরেই রয়েছে স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা বেড়েছে কয়েকগুণ। আগে যে চরে অন্ধকার ও অনিশ্চয়তা ছিল, এখন সেখানে ছড়িয়ে পড়েছে আলোর নিশ্চয়তা।

এই ক্লাস্টার গ্রামের প্রতিটি উঠান এখন সবুজে ভরা। বাড়ি বাড়ি আছে সবজি বাগান, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল। ফসল ফলিয়ে নিজেদের খাবার তো মেটানোর চেষ্টাও করছে।

বন্যা বা খরার সময়ের কথা ভেবে তারা গড়ে তুলেছেন ‘সিড ব্যাংক’ যেখানে নানা ধরনের সবজির বীজ সংরক্ষিত থাকে। বিপর্যয়ের পর কৃষিকাজ শুরু করার জন্য এটি বড় সহায়ক।

এছাড়াও রয়েছে ‘ফুড ব্যাংক’ প্রতিটি পরিবার নিয়মিত মুষ্টির চাল জমা রাখে। বিপদে পড়লে এই চালই হয় তাদের খাদ্য নিরাপত্তার ভরসা। নারী উদ্যোক্তা রুবিনা বেগম বলেন, আমরা একসাথে চাল জমাই, একসাথে ভাগ করে নিয়ে খাই-এই ঐক্যই আমাদের শক্তি।

চরের মানুষদের অনেকেই আগে মৌসুমি কাজের খোঁজে ঢাকা, গাজীপুর বা বগুড়ায় পাড়ি দিতেন, যাদের বলা হয় মাইগ্র্যান্ট লেবার। অনেক সময় দালালের প্রতারণায় পড়ে বিপদেও পড়েছেন কেউ কেউ। এখন এই ক্লাস্টার গ্রামে তাদের জন্য চালু হয়েছে ‘সেফ মাইগ্রেশন’ সচেতনতা কার্যক্রম।

এখানে গ্রামীণ সভায় সবাইকে নিরাপদ অভিবাসনের নিয়ম শেখানো হয়-পাসপোর্ট, ভিসা, কর্মচুক্তি যাচাই, সরকারি অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির তথ্য এসব নানা বিষয়ে সচেতন করা হয়।

একই সঙ্গে অনেক তরুণ-তরুণী স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন সেলাই, হস্তশিল্প, পশুপালন ও সবজি চাষে—যাতে তারা ঘরে বসেই আয়ের পথ তৈরি করতে পারেন। এই উদ্যোগে বিদেশে ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন অনেকটাই কমেছে।

নিকটবর্তী কোনো সরকারি স্কুল না থাকায় গ্রামের মানুষ নিজেরাই উদ্যোগ নেন নিয়ে গড়ে তোলেন ‘শিখন কেন্দ্র’। এখানে ক্লাস্টারের শিশুরা প্রতিদিন পড়াশোনা করে। গ্রামেরই এক নারী রোজিনা আক্তার বিনা পারিশ্রমিকে নিয়মিত পাঠদান করেন।

রোজিনা বলেন, আমাদের শিশুরা আগে স্কুলে যেতে পারত না। এখন আমি নিজেই তাদের শিক্ষক। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ।

শুধু শিক্ষা নয়, নারীর ক্ষমতায়নের দিক থেকেও এই গ্রাম অনন্য। নারীরা এখন ফুড ব্যাংক পরিচালনা করেন, বীজ সংরক্ষণ করেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেন। তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণে গ্রামটি এখন আত্মনির্ভতার পথে অগ্রসর।

আগে চরবাসীদের জন্য সরকারি সেবা-স্বাস্থ্য, কৃষি বা সমাজকল্যাণ অফিস ছিল অনেক দূরের ব্যাপার। অনেকের জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা কার্ডও ছিল না। কিন্তু ক্লাস্টার গ্রাম প্রতিষ্ঠার পর প্রশাসনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক দৃঢ় হয়েছে।

এখন গ্রামের প্রায় সব পরিবারই জন্মনিবন্ধন, ভোটার আইডি, কৃষি কার্ড পাচ্ছেন। উপজেলা কৃষি অফিস ও ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেওয়া হয়।

এই ক্লাস্টার গ্রামের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো ঐক্য। বিয়েশাদি, ধর্মীয় উৎসব, সামাজিক অনুষ্ঠান-সব আয়োজনই হয় সম্মিলিতভাবে। তরুণরা নিজেরাই রাস্তা সংস্কার করে, নারীরা মিলেমিশে সেলাই ও খাদ্যসংরক্ষণের কাজ করেন। গ্রামবাসীর মুখে একটাই কথা-“আমরা এখন এক পরিবার।

গণ উন্নয়ন কেন্দ্র এর নির্বাহী প্রধান এম.আবদুস্ সালাম জানান, উজালডাঙা ক্লাস্টার ভিলেজ এর ৪০টি পরিবারের জন্য স্থায়ী ও নিরাপদ বাসস্থান গড়ে উঠেছে। এখানের মানুষজন তাদের জীবনজীবিকার উন্নয়নে পরিকল্পনা করছে এবং অবশ্যই তাদের জীবনমান উন্নয়ন হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

যে চর একসময় ছিল বন্যা ও দারিদ্র্যের প্রতীক, আজ তা হয়ে উঠেছে আশার প্রতীক। ঐক্য, পরিশ্রম ও সচেতনতার মাধ্যমে উজালডাঙা ক্লাস্টার ভিলেজ প্রমাণ করেছে-উন্নয়ন মানে শুধু রাস্তা বা ঘর নয়, উন্নয়ন মানে নিজের ভাগ্য নিজের হাতে গড়ে তোলা।

চরের এই ছোট্ট গ্রামটি আজ বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়নের এক অনন্য উদাহরণ-যখানে জলবায়ুর ঝুঁকি জয় করে মানুষ লিখছে টেকসই ভবিষ্যতের নতুন গল্প।

সম্প্রতি

আরও খবর