প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতে প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র (এফডব্লিউসি) থাকার কথা থাকলেও পটুয়াখালী জেলায় ৭৭ টি ইউনিয়নের মধ্যে মাত্র ৫৪ টিতে এই সেবামুলক প্রতিষ্ঠানটি রয়েছে। আবার এসব এফডবিলউসিতে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে গত ১৪ মাস ধরে ওষুধ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে জনবল সংকটও। এতে করে বিপাকে পড়ছেন সেবা নিতে আসা প্রান্তিক মানুষ।
স্থানীয়রা জানান, প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে প্রতিষ্ঠা করা হয় ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এখানে জ্বর, সর্দি, কাশি, চর্মরোগসহ মা ও শিশুস্বাস্থ্য সেবার ২৬ ধরনের ওষুধ দেওয়ার কথা। কিন্তু গত ১৪ মাস ধরে এসব কেন্দ্রে বন্ধ রয়েছে ওষুধ সরবরাহ। ফলে সেবা নিতে আসা রোগীদের যেতে হচ্ছে শহরের সরকারি ও বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিকব ও হাসপাতালে। এতে ভোগান্তির পাশাপাশি বাড়ছে ব্যয়।
গত বৃহস্পতিবার সকালে পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার বকুলবাড়িয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, কেন্দ্রটিতে সেবা নিতে আসা রোগীরা ওষুধ না পেয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরছেন। সরকারি এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রে সঠিক সেবা না পাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন এলাকাবাসী। জেলার অন্য ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রেগুলোতেও একই চিত্র।
২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে সেবা নিতে আসা বকুল বাড়িয়া গ্রামের লামিয়া বেগম বলেন, ‘আমার দেড় বছরের শিশু সামিয়াকে নিয়ে এখানে এসেছি। ছেলেটির কয়েকদিন ধরে জ্বর-সর্দি-কাঁশিতে ভুগছে। এখানকার ডাক্তার ঔষধ লিখে দিছে, তবে কোনো ওষধ দেয় নাই। বলেছে এখানে কোনো ওষধ নেই। মাস দুয়েক আগেও একবার আসছিলাম। তখনও ওষধ পাই নাই। তিনি আরও বলেন, আমরা গরিব মানুষ। টাকা-পয়সা খরচ ছাড়া ডাক্তার দেখানোসহ বিনামূল্যে ওষুধ পাওয়া যায় বলেই এখানে আসি। এখন এখানে ঔষধ না পাওয়ায় বাইরে থেকে কিনতে হয়। একই গ্রামের গৃহবধূ সুমী আক্তার (২১) ঠান্ডা জ¦রে আক্রান্ত তার দুবছরের ছেলে মিরাজকে নিয়ে এসেছেন। তিনি জানান, তিনমাস আগেও এবকার এসেছিলাম অঅমার জ¦র নিয়ে তখনও ওষুধ পাইনি। এবার অঅমার ছেলে অসুস্থ শুধুমাত্র ওষধ লিখে দিয়েছে। কোনো ওষুধ দেয়নি। বলেছে কোননো ওষুধ নেই। আমার বাড়ি থেকে গলাচিপা উপজেলা শহরে ১৫ কিলোমটিা আর পটুয়াখালী জেলা শহর প্রায় ২৫ কিলোমিটার। ওইসব শহরে গিয়ে ক্লিনিক বা হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়া খুবই ভোগান্তির এবং ব্যয়বহুল। আমার স্বামী একজন দিনমজুর। তাই টাকার অভাবে এখন আমরা চিকিৎসাসেবা ঠিকভাবে পাচ্ছি না।
এই এডব্লিউসিতে রয়েছে জনবল সংকটও। এখানে ৬ টি পদে কর্মরত আছেন মাত্র দুজন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা (এফডব্লিউভি) ও একজন এমএলএসএস। উপ-সহকারি মেডিকেল কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার বা স্যাকমো পদে প্রতিষ্ঠালগ্নে একজনকে নিয়োগ দেয়া হলেও ২ বছর সেবা দিয়ে তিনি অন্যত্র বদলী হন। তারপর থেকে ওই পদে আর কেউ আসেননি। এখন পরিবার কল্যাণ সহকারি রনজিতা একাই সামলান চিকিৎসা সেবা। তিনি আবার পাশর্^বর্তী খারিজ্জমা ইউনিয়নেরও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি বলেন, আমাকেই সব সামলাতে হয়। ওষুধ সরবরাহ ১৪ মাস ধরে বন্ধ। তা এখন রোগীদের চাপ কম। তবে গত একমাসে ৩০ টি স্বাভাবিক প্রসব করানো হয়েছে। পটুয়াখালী সদর উপজেলার আউলিয়াপুর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রেও ওষুধ সংকটের পাশাপাশি রয়েছে জনবল সংকট। এখানেও উপসহকারি মেডিকেল অফিসারের পদটি দীর্ঘদিন খালি। ৭ টি পদে কর্মরত আছে ৫ জন। এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে আসা নাছিমা বেগম জানান, কয়েকদনি ধরে আমার জ¦র আর চুলকানি। ডাক্তার দেখাতে আসছি। কিছু ওষুধ লিখে দিয়েছে। কোনো ওষুধ দেয় নাই বলেছে সরবরাহ নেই।
এখানকার পরিবার কল্যাণ সহকারি নাসিমা বেগম বলেন, ‘আমরা আগে প্রায় ২৩ রকমের ওষুধ পেতাম। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ঔষধের সাপ্লাই না থাকায় এখন আর রোগীদের দিতে পারছি না। তাই রোগী তেমন একটা আসে না। আগে প্রতিদিন প্রায় অর্ধশত রোগী এলেও বর্তমানে আসে আট থেকে ১০ জন রোগী। ওষুধ না থাকায় রোগীদের শুধু পরামর্শ দিয়ে বিদায় করতে হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু ওষুধ সংকট নয়, জনবল সংকটেও ভুগছে স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো। জেলার ৫৪ টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে সমান সংখ্যক স্যাকমো পদে কর্মরত আছেন মাত্র ৩৩ জন। ২১ টি ফার্মাসিস্ট পদে ১১ টি পদ খালি। পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকের ৭৮ পদের মধ্যে ২৪ টি পদ খালি, পরিবার কল্যাণ সহকারির ৩১৭ পদে ৮৮ টি পদ র্দীঘদিন খালি।
এ ব্যাপারে পটুয়াখালী পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরের সহকারি পরিচালক ডা. মো. সামসুজ্জামান বলেন, জনবল ও ওষুধ সংকটে সেবা কিছুটা ব্যাহত হলেও অচিরেই তা কেটে যাবে। আশা করছি আগামি সপ্তাহে সব ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে ওষুধ সরবরাহ করতে পারবো।



