মূল শহর থেকেই পাকা সড়ক। অজপাড়াগাঁ পেড়িয়ে সোজা গারো বাজার। যাওয়ার পথে বিল সবুজ ধান ক্ষেতের অবারিত দিগন্ত। যেন চোখ জুড়ানো। গারো বাজারের পাশের বৃহত্তর গ্রামটির নাম মহিষমারা। গ্রাম একটি কৃষি এলাকা। পাশে দিয়ে বড় আকারের চৌরা বাইদ বয়ে গেছে। বাইদটি নানা কারণে নাম করা। দ’ুপাশেই টিলার মতো সিনা টানা করে দাঁড়িয়ে আছে লাল মাটির উর্বর মৃত্তিকা। কোথাও লাল, কোথাও পলি ধূসর। তবে পুরো বৃহত্তর গ্রামটি উর্বরতায় ভরা। যে কারণে নানা ফল ফসলে শোভাসিত। ফসলের সৌর্হাদ্য সৌন্দর্যে অপার বৈচিত্র্য সম্ভাবনাময় অঞ্চল। আনারস কলা হলুদ পেঁপে আদা হলুদের বাণিজ্যিক চাষাবাদের জন্য বিখ্যাত। গ্রামটির নামকরণ নিয়ে রয়েছে নানা মানুষের নানা কৌতুহলী জনশ্রুতি। স্থানীয়মতে, এক সময় পানীয় জলে সুব্যবস্থা না থাকায় উঁচু জমিতে আউশ ধানের চাষ করা হতো। ধানের নাড়া ছিল প্রচুর পরিমানে, যে কারণে ইউনিয়নের নাম করা হয়ে ছিল আউশনারা। আর ঐ সময়ে আউশ ধানের নাড়া খেতে গরু মহিষের পাল। এ গ্রামে নাড়া খেতে মহিষমারা মারা যাওয়ার কারণে স্থানীয়রা গ্রামটির নাম রাখেন মহিষমারা। এ গ্রামটি কৃষি রাজ্য হিসেবে দেশের সবাই চিনে জানে। এটি টাঙ্গাইলের মধুপুর লাল মাটির একটি বিখ্যাত গ্রামের নাম। মহিষমারা বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ হয়েছে। এ গ্রামের একজন আলোড়িত কৃষক ছানোয়ার হোসেন। তিনি কৃষি ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের কারণে অর্জন করেছে দেশের কৃষি ক্ষেত্রে এওয়ার্ড ও পদক। খেতাব পেয়েছে সিআইপির মতো মর্যাদা। শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে তার পৈতৃক জমিতে তিলে তিলে গড়ে তোলেন তার একখন্ড কৃষি রাজ্য। কফি, কাজু বাদাম,পেয়ারা আনারস,কলাসহ নানা ফল ফসলের বৈচিত্র্যের নিরাপদ ভান্ডার। নিরাপদ চাষাবাদে কুড়িয়েছে সুনাম আর খ্যাতি। কৃষির মানুষ হিসেবে তাকে প্রায় সবাই চিনে জানে। এ কৃষির মানুষটির জন্ম এ গ্রামেই। ছানোয়ার হোসেন তার বাবা ও তার নিজস্ব জমিতেই গড়ে তোলেন পিছিয়ে পড়া এলাকায় একটি কলেজ। কলেজটির নাম দিয়েছে মহিষমারা কলেজ। ২০১৩ সালে ১৩৫ শতাংশ জমির উপর প্রতিষ্ঠা করে কলেজটি। ১৮ জন শিক্ষক কর্মচারীর এ কলেজে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা প্রায় আড়াইশোর মতো। ইন্টারমিডিয়েট কলেজটি একদম নিভৃত পাড়া গাঁয়ে করা। ইতিমধ্যে এমপিও ভুক্তি প্রাপ্তির এ কলেজটি পাশের হারে জেলার মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে। বরাবরই কলেজটি তাদের সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে।
কলেজের প্রতিষ্ঠাতা কৃষক ছানোয়ার হোসেন বলেন, কলেজটি তার বাবার ৯৫ শতাংশ জমি আর তার ৪০ শতাংশ মিলে ১৩৫ শতাংশের উপর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। গ্রামে কলেজ করার বিষয়ে তিনি বলেন, এ এলাকায় কলেজ পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান না থাকায় গ্রামের পিছিয়ে পড়া ছেলে মেয়েরা যাতে পড়াশোনা করতে সে মানসেই করা। এ কলেজের শিক্ষকরা অনেক পরিশ্রমী। হোম ভিজিট নিয়মিত। পাঠদানে আন্তরিক। সকলের সহযোগিতা আন্তরিকতায় ফলাফল শুরু থেকেই আশানুরূপ। এ কলেজ পাশ করা ছাত্র ছাত্রীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। ঢাকসুর নির্বাচনেও এ বছর এ কলেজ থেকে বের হওয়া একজন নির্বাচিত হয়েছে।
পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে কৃষিতে তরা উৎপাদনমুখী শিক্ষা গ্রহন করে থাকে। নিরাপদ চাষাবাদে তাদেরকে হাতে কলমে কৃষির জ্ঞান অর্জনের জন্য মাঠে শেখানো হয়। উদ্যোক্তা তৈরির মন মানসিকতা গঠনে পড়াশোনা করানো হয়। পাশ করে চাকরির পিছনে যাতে ঘুরতে না হয়।
কলেজ মাঠের পাশেই কৃষির রাজ্য। প্রতি মাসেই তাদের তিনদিন কৃষিতে উৎপাদন মুখী শিক্ষা দেয়া হয়। একদিন তাদেরকে নিজেদের রান্না করা খাবার পরিবেশন করা হয়। নিজেরাই উৎপাদন করে, নিজেরাই রান্না করে খায়। শিক্ষকরা দুপুরের খাবার খায় তাদের উৎপাদিত নিরাপদ শাক সবজিতেই। ফলমূলও নিরাপদ। ছাত্রদের মধ্যে কেউ রান্না করে কেউ সবজি তোলে কেউবা আবার পরিবেশন করে থাকে। তাদের আনন্দে পাঠ গ্রহনের পাশাপাশি উৎপাদনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা গ্রহনে তারা আগ্রহী হয়ে উঠছে।
এ বিষয়ে মহিষমারা কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক জানান, কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ফলাফল ভালো। শতকরা ৯৫ ভাগের উপরে। তবে পড়াশোনা পাশাপাশি সুস্থ সুন্দর নাগরিক ও উৎপাদনশীতা চেতনা শেখানো হয়। গ্রুপ ভিত্তিক তাদেরকে কৃষি কাজে শিক্ষকদের তত্ত¦াবধানে হাতে কলমে উদ্যোগী মানসিকতার তৈরির জন্য প্রস্তুক করা হয়। পড়াশোনা করে যেন চাকরির পিছনে দৌড়াতে না হয়। তাদের হাতে উৎপাদিত শাক সবজি দিয়ে মাসে একদিন খাওয়ানো, শিক্ষকদের দুপুরের আহারের ব্যবস্থাও হয়ে থাকে। তিনি জানালেন, এ কাজটি করার ফলে তারা মোবাইল ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর দিক থেকে রেহাই পাবে, বাড়িতেও বাবা মাকে কৃষি কাজে সহযোগিতা করার মনোভাব সৃষ্টি হবে।
কলেজের সভাপতি মধুপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার জুবায়ের হোসেন বলেন, প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষকদের আন্তরিকতার ফলেই প্রান্তিক পর্যায়ের একটি কলেজ এত অল্প সময়ে এতদূর এগিয়ে যাচ্ছে। কলেজটি অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে।



