হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার মাসুদ রানার বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অনিয়ম, দুর্নীতি ও অসদাচরণের অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শৃঙ্খলাভঙ্গ ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অলিখিত নির্দেশের কথা বলে তিনি স্থানীয় নিশান এনজিওর একাধিক সম্পত্তির দলিল সম্পাদন বন্ধ রাখেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত বহু গ্রাহক তাদের ন্যায্য দলিল সম্পাদনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এক্ষেত্রে তিনি আইন মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কর্মকর্তাদের রেফারেন্স ব্যবহারও করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের নকলনবিশ জান্নাত আরা যৌন হয়রানির অভিযোগ দায়ের করলেও তিনি তা তদন্তে গাফিলতি করছেন এবং অভিযোগ গ্রহণ করেননি। অফিসের একাধিক কর্মচারী জানান, তিনি অনেক নকলনবিশদের পেশাগত কাজ না করিয়ে তার ব্যক্তিগত কাজে নিয়োজিত রাখেন।এ নিয়ে কেউ প্রতিবাদ করলে তাদেরকে নানা চাপের মধ্যে রাখেন।
আরও অভিযোগ আছে— এজলাসে না বসে অফিসের ভেতরের কামরায় বসে প্রায় সময়ই দলিল সম্পাদন করেন মাসুদ রানা, যা সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত। এছাড়া স্থানীয় একটি মসজিদে অনুদান দেওয়ার কথা বলে প্রতিটি দলিলের বিপরীতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। যদিও এটি একটি মহৎ উদ্যোগ হিসেবে দেখানো হয়, অভিযোগ উঠেছে আদায়কৃত টাকার পুরোটা মসজিদ কমিটিতে না গিয়ে সাব-রেজিস্ট্রার ও তার সহযোগীদের পকেটে চলে যায়।
এ নিয়ে বিশিষ্টজনদের দাবি, মসজিদের নিমিত্তে সাব রেজিস্টার অফিস থেকে অনুদান উত্তোলন করলেও তা যেন পুরোপুরি মসজিদের তহবিলে জমা হয়।
অভিযোগকারী নকলনবিশ জান্নাত আরা বলেন, যৌন হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়ে আমি সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে অভিযোগ করেছিলাম। কিন্তু তিনি অভিযোগ গ্রহণ করেননি। পরে আমি জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিই এবং পরবর্তীতে আদালতের দ্বারস্থ হই।
অন্যদিকে নিশান এনজিওর ভুক্তভোগী নয়ন মিয়া বলেন, আমরা লাখ লাখ টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। সাব-রেজিস্ট্রার মাসুদ রানার সিন্ডিকেট টাকার বিনিময়ে আমাদের দলিল বন্ধ রেখেছে। আমরা হাইকোর্টে রিট করার প্রস্তুতি নিচ্ছি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছু অফিসের কতিপয় কর্মচারীরা জানিয়েছেন, ওই দপ্তরে নারী কর্মীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নেই এবং অভ্যন্তরীণ অনিয়ম নিয়ে কেউ মুখ খুললে প্রশাসনিক হয়রানির শিকার হতে হয়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সাব-রেজিস্ট্রার মাসুদ রানা নিজ অফিসে বসেই দলিল সম্পাদন করছেন। অফিসে কর্মরত অনেক নকলনবিশকে তার ব্যক্তিগত কাজে নিয়োজিত থাকতে দেখা যায়। দলিল সম্পাদনের সময় অফিসের কর্মচারীরা অহরহ টাকা-পয়সা নিচ্ছেন, এমন দৃশ্যও চোখে পড়ে। অফিসে কর্মরত নারী কর্মচারীরা সবসময় ভীতি আতঙ্কের মধ্যে থাকেন। অভিযোগকারী জান্নাত আরার অভিযোগ গ্রহণ না করার বিষয়েও অফিসের কয়েকজন কর্মচারীর মুখে অভিযোগের সত্যতার ইঙ্গিত মেলে।
এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে যোগাযোগ করা হলে সাব-রেজিস্ট্রার মাসুদ রানা বলেন, প্রতি দলিলে কিছু টাকা নেওয়া হয়, তবে তা সম্পূর্ণ মসজিদে দান করা হয়। নারী কর্মচারীর অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে। অফিসে বসে দলিল সম্পাদন প্রয়োজনে করতে হয়। অন্যান্য সব অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।
নিবন্ধন অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগের পরিদর্শক মীর মাহবুব মেহেদী জানান, তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে। নারী কর্মচারীদের অভিযোগসহ অন্যান্য অনিয়মের বিষয়গুলো আমরা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।
এ বিষয়ে হবিগঞ্জ জেলার রেজিস্ট্রার কে. এম. রফিকুল কাদির বলেন, এসব গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করা হবে। প্রমাণ মিললে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিছু বিষয়ে সাব-রেজিস্ট্রার নিজেও আমাকে অবগত করেছেন।



