ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুভূত সাম্প্রতিক কম্পন নতুন করে আতঙ্ক বাড়িয়েছে বিশেষজ্ঞদের চোখে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চল ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এদিকে দেশের উত্তরাঞ্চলের বরেন্দ্র ভুমিতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামায় বরেন্দ্র ভূমিতে তৈরি হচ্ছে শূন্য স্তর।
গবেষণা বলছে, সেচের জন্য অতিরিক্ত পানি উত্তোলন এবং বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থার অভাবে রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের বহু এলাকা এখন অতি উচ্চ পানি-সংকট ও ভূমিধসের ঝুঁকিতে।
ভূগর্ভে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় বরেন্দ্র অঞ্চল দেবে যেতে পারে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেলে মাটির নিচের বালি ও পাথর ফাঁকা হয়ে পড়ে, যার ফলে সামান্য ভূমিকম্পেও ভূমিধস বা দেবে যাওয়ার ঝুঁকিতৈরি হয়। গবেষকরা এর কারণ হিসেবে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে পুকুর-খাঁড়ির অভাবকে চিহ্নিত করেছেন।
কয়েক মাস আগে ফায়ার সার্ভিসের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছে। রিখটার স্কেলে ভূমিকম্প দুটির মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৭ দশমিক ৭ ও ৬ দশমিক ৪। এতে দেশ দুটি বেশ ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বাংলাদেশেও একই ধরনের বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ অঞ্চল উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। এ সর্তকবার্তার কয়েক মাসের মধ্যেই শনিবার দেশে ভূমিকম্প অনুভূত হয়।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির মাত্রা ৫ দশমিক ৭ বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ আবহওয়া অধিদপ্তর। গত শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিট ২৬ সেকেন্ড থেকে কম্পন শুরু হয়। আগামীতে এর চেয়ে বড় ভূমিকম্প হতে পারে দেশে। এতে বরেন্দ্র অঞ্চলের ক্ষতি হতে পারে ব্যাপকভাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার, কৃষিক্ষেত্রে সেচের জন্য অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেলে মাটির নিচের বালি ও পাথর ফাঁকা হয়ে পড়ে, যার ফলে সামান্য ভূমিকম্পেও ভূমিধস বা দেবে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
চলতি বছর ২৫ আগস্ট পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংস্থার (ওয়ারপো) সম্মেলন কক্ষে জাতীয় পানি সম্পদ পরিষদের নির্বাহী কমিটির ১৮তম সভায় রাজশাহী অঞ্চলের তিন জেলার ২৫টি উপজেলা এলাকাকে অতি উচ্চ পানি সংকট এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। রাজশাহী অঞ্চলের পানি সংকটাপন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর ভূগর্ভস্থ পানিস্তর ও পানির প্রাপ্যতা নিয়ে করা গবেষণার প্রতিবেদনের আলোকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। শুস্ক মৌসুমে রাজশাহীর তানোর, গোদাগাড়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল গোমস্তাপুর ও সদর উপজেলা ছাড়াও নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর, পোরশা ও সাপাহার উপজেলার অধিকাংশ গ্রামেই তীব্র পানি সংকট বিরাজ করে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের ২২টি গ্রামেও পানির তীব্র সংকটে মানুষ সারা বছরই দিন কাটায়। তপ্ত উত্তপ্ত বরেন্দ্রভূমিভুক্ত এসব এলাকার মানুষ পানির অভাবে গবাদিপশু পালন করতে পারে না। বরেন্দ্র কর্তৃপক্ষের স্থাপিত গভীর নলকূপ থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয় নারীদের। সভায় অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন তিন জেলা হলো- রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ।
সম্প্রতি রাজশাহীতে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি ও প্রভাব নিয়ে কমিউনিটি পর্যায়ে ‘কপ-৩০-এ স্থানীয় প্রত্যাশা ও মতামত প্রতিফলন’ বিষয়ক এক ডায়ালগে অংশ নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক উপ-উপাচার্য চৌধুরী সরওয়ার জাহান জানান, বরেন্দ্র অঞ্চলে পানিসংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। এই অবস্থায় জনসচেতনতার বিকল্প নেই বলেও মত দেন তিনি।
ভূগর্ভের পানির এমন সংকট থাকলে ভূমিকম্পে নিচের মাটি দেবে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে মাটি দেবে যাওয়ার কারণগুলো হচ্ছে, অ্যাকুফারের ওপর চাপ। যখন ভূগর্ভস্থ পানি (যা অ্যাকুফার বা জলাধারে জমা থাকে) অতিরিক্ত পরিমাণে উত্তোলন করা হয়, তখন অ্যাকুফারগুলোর ওপর চাপ কমে যায়। অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে অ্যাকুফারে থাকা পানি কমে যায় এবং সেখানে শূন্যস্থান তৈরি হয়। তখন ভূমিকম্পের মতো ঘটনাগুলো ঘটলে শূন্যস্থানগুলোতে উপরের মাটি এবং বালি ভর করে, যা মাটির স্থিতিশীলতা নষ্ট করে এবং মাটি দেবে যায়।



