নরসিংদী থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু খেজুরের রস।কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে খেজুর রসের মতো আরো অনেক কিছু।শীতের সকালে মিষ্টি রোদে বসে সুস্বাদু খেজুর রসের পিঠা-পায়েস খাওয়ার মজাই আলাদা । কিন্তু সেই গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু খেজুর রস এখন আর তেমন দেখা যায় না।খেজুর গাছিদের ও এখন আর নেই আগের মতো কোনও ব্যস্ততা।নেই কোন তাড়া আগের মতো দেখা যায় না কার আগে কে খেজুরের রস সংগ্রহ করতে পারে এমন কোনও প্রতিযোগিতা। এভাবেই দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী জনপ্রিয় খেজুরের রস।গ্রামগঞ্জে আগের মতো খেজুরের গাছও দেখা যায় না। ৯০দশকের শেষের দিকেও শীত মৌসুমের শুরুতেই গ্রামগঞ্জের মানুষ খেজুর গাছ কাটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। কে কার আগে খেজুর গাছ কেটে প্রকৃতির সেরা উপহার সমূহের মধ্যে অন্যতম খেজুর রস সংগ্রহ করতে পারে এই প্রতিযোগিতায় নেমে পড়তেন। এরপর সেই রস দিয়ে অল্প সময়ে তৈরি করা হতো পাটালি গুড়,পিঠাসহ নানা রকমের মজার মজার খাবার। তবে সময়ের বিবর্তনে আজ হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী খেজুর রস।আধুনিক নগরায়ন ও অবাধে বৃক্ষ নিধনের ফলে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ জনপদের খেজুর গাছ এবং রস। এতে করে কমেছে গাছির সংখ্যাও। আগে হেমন্তের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে গাছ কাটার প্রাথমিক কাজগুলো করার হিড়িক পড়ত। গ্রামের পথে-ঘাটে, নদী বা পুকুরপাড়ে, বড় রাস্তার দু’পাশে বা ক্ষেতের সীমানা ঘেঁষে শত শত গাছের মাথার নরমাংশ বিশেষভাবে কাটতেন গাছিরা। ১৫-১৬টি পাতা রেখে গাছের উপরিভাগের বাকলসহ অপ্রয়োজনীয় অংশ পরিষ্কার করা হয়। আড়াআড়িভাবে বাঁধা বাঁশের খণ্ডে দাঁড়িয়ে কোমরে ও গাছে রশি বেঁধে ধারালো দা দিয়ে গাছিদের গাছ কাটার দৃশ্য ছিল দেখার মতো। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই দৃশ্য এখন তেমন চোখে পড়ে না।
বৃহস্পতিবার সকালে ইটাখোলা মোড়ে খেজুরে রস বিক্রি করতেছিলেন তাজু মিয়া তিনি জানান, সেই ছোটবেলা থেকেই তার বাবাকে রস সংগ্রহ করতে দেখেছেন। তখন প্রচুর রস আসত বাড়িতে। খেজুরের গুড়ের মৌ মৌ গন্ধে মাতোয়ারা হতো পুরো বাড়ি। কিন্তু বর্তমানে গাছের সংখ্যা একেবারেই কমে গেছে। একসময় তারা কয়েকশ খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করতেন। কিন্তু চলতি বছর মাত্র ১০টি গাছ থেকে রস সংগ্রহ করছেন। প্রতিটি গাছ থেকে দৈনিক এক হাড়ি (চার-পাঁচ কেজি) রস হয়, যা ৮০-১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন।
স্থানীয়রা জানান, আগে শীত এলে সহজেই মিলতো খেজুরের রস। কিন্তু এখন কোথাও খেজুরের গাছ বা গাছির তেমন সন্ধান পাওয়া যায় না। খুঁজতে খুঁজতে তিন/চার গ্রাম ছাড়িয়ে হয়তো একজন গাছির সন্ধান পাওয়া যায়। তবে খেজুর রসের চাহিদা প্রচুর। প্রতি হাড়ি (চার/পাঁচ কেজি) বিক্রি হয় তিনশত টাকায়।
শিবপুর উপজেলার খড়িয়া গ্রামের শামীম ভূইয়া সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, শীত মৌসুমের শুরুতেই আমি রংপুর থেকে অনেক অনুরোধ করে গাছি এনেছি। আমার পুকুর পাড়ে ২৯টি খেজুর গাছ আছে। কয়েক বছর ধরে খোজি আমাদের এলাকাতে কোন গাছি পাই নাই তাই এ বসর অকে খোজার পর রংপুরে গাছির খোজ পাই তাদের কে অনুরোধ করে নিয়ে এসেছি। তারা আমাকে প্রতিদিন যা রস হয় তার তিন ভাগের এক ভাগ দেয়। প্রতিদিন তারা গড়ে ১৪-১৬টি গাছে হাড়ি বাধে। আজ একটিতে ত আগামীকাল আরেক টিতে। প্রতিদিনই দূর দূরান্ত থেকে সকালে লোকজন আসে কেউ এখানেই খায় আবার কেউ নিয়ে যায়।
শিবপুর উপজেলার খড়িয়া গ্রামে খেজুর গাছে উঠে ডাংগি লাগিয়ে কোমড়ে দড়ি বেধেঁ গাছের এক পাশের ছাল ছাড়িয়ে গাছ প্রস্তুত করছিলেন গাছি জহির। প্রতিবছর শীতের শুরুতেই খেজুর গাছ কেটে রস নামাতে ব্যস্ত হয়ে পরেন তিনি। কার্তিক অগ্রহায়ণ মাসে খেজুর গাছের কান্ডভাগে বিশেষ পদ্ধতিতে কাঁটাসহ ডাল কেটে কিছু অংশের ছাল ছাড়িয়ে নেয়া হয়। ছাল কাটা অংশ কয়েকদিন রেখে দিলে তাতে রস আসতে শুরু করে। গাছের ছাল ছাড়ানো কাটা অংশ প্রতিদিন ধারালো দা দিয়ে সামান্য চেঁছে বাঁশের চুঙ্গি বসিয়ে নীচে মাটির হাঁড়ি পাতা হয় যেখানে টপ টপ করে সারা রাত ফোটা ফোটা রস জমে হাঁড়ি ভরে যায়।
প্রবীন সাংবাদিক নিবারন রায় বলেন, অঞ্চলের শীতের দিনে খেজুরের রস দিয়ে বিভিন্ন রকম পিঠা তৈরি হতো।
কিন্তু এখন কালের বিবর্তনে খেজুর গাছ না থাকায় রস পাওয়া যায় না। বর্তমানে খেজুরের রস পাওয়াটা দুর্লভ হয়ে উঠছে।
ফলে এই অঞ্চলে খেজুর রস ও গুড় দুষ্পাপ্য হয়ে পড়েছে। আজ থেকে ২০-৩০ বছর পূর্বেও বিভিন্ন এলাকায় থেকে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করত গাছিরা। সেই রস বিক্রি করে তাদের সংসার চালাত।বর্তমানে খেজুর গাছের সংকট দেখা দেওয়ায় রস পাওয়া যাচ্ছে না বললেই চলে। ফলে দিনে দিনে খেজুর রস থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শহর ও গ্রামগঞ্জের মানুষ।
নরসিংদী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আজিজল হক বলেন, জেলায় বর্তমানে যে খেজুর গাছ আছে, যা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। তিনি জানান, খেজুর গাছের সংখ্যা বাড়াতে সবাইকে বেশি করে গাছ লাগাতে হবে। পাশাপাশি যেসব গাছ রয়েছে, সেগুলো নির্বিচারে না কেটে সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে সংরক্ষণ করতে হবে।



