ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে দুর্বৃত্তরা রেললাইন তুলে ফেলে দিলে ঢাকাগামী অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস ট্রেনের ইঞ্জিনসহ দুটি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। তবে এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। দুর্ঘটনার পর ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
সোমবার,(২৯ ডিসেম্বর ২০২৫) ভোররাত ৫টা ১০ মিনিটে গফরগাঁও রেলওয়ে স্টেশনের আউটার সিগন্যালের পূর্বে জন্মেজয় ঈদগাহ মাঠ এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
জানা গেছে, দুর্বৃত্তরা প্রায় ২০ ফুট রেললাইন সরিয়ে ফেললে তারাকান্দি থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়।
গফরগাঁও রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার হানিফ বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ঘটনাস্থলে উদ্ধারকারী ট্রেন এসে ক্ষতিগ্রস্ত ট্রেনের অন্য বগিগুলো ময়মনসিংহ জংশনে নিয়ে যায়। রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) জানান, রেললাইন অপসারণের কারণেই ইঞ্জিনসহ দুটি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। দুর্ঘটনায় কোনো যাত্রী হতাহত হননি।
রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) ময়মনসিংহ অঞ্চলের পরিদর্শক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ২০ ফুট রেললাইন সরিয়ে ফেলায় অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়েছে। ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছি। দ্রুত রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
উল্লেখ্য গত শনিবার ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও) আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পান আক্তারুজ্জামান বাচ্চু। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর মনোনয়নবঞ্চিত নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয় এবং এর জেরে গফরগাঁওয়ে রেললাইন অবরোধসহ ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়।
গত শনিবার বিকেল থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনে রেললাইনসহ উপজেলা ও পৌর শহরের অন্তত ৩০টি স্থানে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এতে গফরগাঁও পৌর এলাকাসহ সর্বত্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তাহীনতায় ব্যবসায়ীরা পৌর শহর ও আশপাশের এলাকায় দোকানপাট বন্ধ করে দেন।
আন্দোলনের সময় স্টেশনের কম্পিউটার সিস্টেম, সিগন্যাল লাইট এবং সংযোগ লাইনে আগুন দেয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। রেললাইনের স্লিপার তুলে নেয়ায় লাইন সরে যায়, যার ফলে গত শনিবার বিকেল ৩টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত এবং গতকাল রোববার বেলা ১১টা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল।
একই দিনে গফরগাঁও-ভালুকা সড়ক, গফরগাঁও-কিশোরগঞ্জ সড়ক, নান্দাইল ও ত্রিশালমুখী সড়কে যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সড়ক যোগাযোগও বন্ধ হয়ে যায়।
দ্বিতীয় দিনের আন্দোলনে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। সকাল থেকে চার দফা গফরগাঁওয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ রেল যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়। এতে অন্তত ১০টি ট্রেন বিভিন্ন স্টেশনে আটকা পড়ে। খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে।
পাশাপাশি গতকাল রোববার বিকেল ৪টার দিকে গফরগাঁওয়ে পুলিশের জলকামান মোতায়েন করা হয়।
দুর্ঘটনা ও সহিংসতার আতঙ্কে গফরগাঁও পৌর শহরসহ আশপাশের এলাকায় টানা তৃতীয় দিনের মতো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে।
এদিকে রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত রেললাইন দ্রুত মেরামতের কাজ শুরু হবে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ট্রেন চলাচল পুনরায় চালু করা হবে।
গফরগাঁও পিডব্লিউডি (রেলপথ) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত ট্রেন উদ্ধারে দুটি রিলিফ ট্রেন কাজ করছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
নিজস্ব বার্তা পরিবেশক জানান, সহজেই দাবি আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে আন্দোলনকারীরা বারবার রেলপথকে টার্গেট করে অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও রেললাইন উপড়ে ফেলার মতো নাশকতামূলক কর্মকা- চালাচ্ছে। এতে সারাদেশে রেলযাত্রীরা চরম দুর্ভোগের মুখে পড়ছেন এবং দেশের অন্যতম নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে।
অভিযোগ রয়েছে, পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাবে বিভিন্ন স্থানে রেললাইন উপড়ে ফেলা হচ্ছে এবং চলন্ত ট্রেনে আগুন দেয়ার ঘটনাও ঘটছে। এসব ঘটনায় একের পর এক মামলা হলেও ঘটনার পর তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সর্বশেষ ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে রেলপথ উপড়ে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। সোমবার ভোরে দুর্বৃত্তরা এই নাশকতা চালায়। এ ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর আগেও দেশের বিভিন্ন স্থানে রেলপথে আগুন লাগিয়ে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
রেলপুলিশের একজন সাবেক অভিজ্ঞ কর্মকর্তা বলেন, রেলপথে দিন ও রাতে নিরাপত্তা তুলনামূলকভাবে কম থাকে। রেলওয়ে পুলিশ ও রেলওয়ের নিজস্ব নিরাপত্তাবাহিনী যে নিরাপত্তা দিচ্ছে তা পর্যাপ্ত নয়। রেলপথ অনেকাংশে ফাঁকা থাকায় দুর্বৃত্তরা সহজেই সুযোগ পেয়ে যায়। এ সুযোগে তারা রেললাইন উপড়ে ফেলে, হামলা চালায় কিংবা অগ্নিসংযোগ করে।
তিনি আরও জানান, ময়মনসিংহ ও জামালপুর অঞ্চলে রেলপথ ব্যবহারকারী মানুষের সংখ্যা বেশি। গফরগাঁওসহ এসব অঞ্চলে আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে রেলপথকে বেছে নিয়ে তা-ব চালানো হয়, যা এবারও ঘটেছে।
এর আগেও বিভিন্ন সময় রাতের অন্ধকারে রেলপথ ও চলন্ত ট্রেনে নাশকতা ও সন্ত্রাসী কর্মকা- চালানো হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি কতদিন চলবে তা নিয়ে রেলকর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
রেলভবনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, রেলপথে নাশকতা, অবরোধ, রেললাইন উপড়ে ফেলা ও আগুন দিয়ে মিছিল করলে আন্দোলনের খবর দ্রুত সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এ লক্ষ্য নিয়েই বারবার রেলপথকে টার্গেট করে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপসহ বিভিন্ন নাশকতা চালানো হচ্ছে।
হামলার সময় অনেক সাধারণ মানুষ মনে করেন, হয়তো রেলওয়ের শ্রমিকরা রেলপথে কাজ করছেন। এই বিভ্রান্তির সুযোগে দুর্বৃত্তরা সহজেই তা-ব চালায়। ফলে রেলপথে চলাচলকারী লাখলাখ যাত্রী চরম ভোগান্তি ও আতঙ্কে পড়েন। এতে দেশের সবচেয়ে নিরাপদ ভ্রমণ ব্যবস্থাকে দুর্বৃত্তরা ক্রমেই অনিরাপদ করে তুলছে।
রেলওয়ের নিরাপত্তা ফোর্সেও পাশাপাশি রেলপুলিশ এসব ঘটনায় সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
এ বিষয়ে রেলপুলিশের প্রধান (চিফ) অতিরিক্ত আইজিপি ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান মুঠো ফোনে বলেন, গফরগাঁওয়ের ঘটনার পর রেলপুলিশ সদর দপ্তর ও উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় হার্ডলাইনে অবস্থান নেয়া হয়েছে। অপরাধীদেও আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে এবং ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সেজন্য সবধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, রাজনৈতিক সংগঠনের এক নেতার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ কওে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। প্রতিপক্ষ নিজেদের দাবি আদায়ে রেলপথকে ব্যবহার করছে। এ কারণে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে মাঠপর্যায় পর্যন্ত রেলপুলিশ যোগাযোগ রাখছে, যাতে যাত্রীদের দুর্ভোগ ও রাষ্ট্রের ক্ষতি না হয়। রেলপুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
রেলপুলিশের আরেক কর্মকর্তা জানান, কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে সারাদেশে ৩ হাজার ১০০ কিলোমিটারের বেশি রেলপথ রয়েছে। এই বিশাল রেলপথের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র আড়াই হাজার রেলপুলিশ, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। সেই অনুপাতে যানবাহনের সংখ্যাও অপর্যাপ্ত।
সারাদেশে বর্তমানে ২৪টি রেলওয়ে থানা ও ৩২টি ফাঁড়ি রয়েছে। প্রতিটি জিআরপি থানায় ২০-৩০ জন ফোর্স দিয়ে থানার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। রেলপথের নিরাপত্তা জোরদার করতে অন্তত আরও ৫ হাজার পুলিশ বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। পুলিশ সংখ্যা বাড়লে নিরাপত্তাও বাড়বে বলে তিনি জানান।
এদিকে সোমবার রাতে ময়মনসিংহ জিআরপি থানার ওসি আখতার হোসেন জানান, গফরগাঁওয়ে রেললাইন উপড়ে ফেলার ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ২০-২৫ জনকে অভিযুক্ত কওে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে এবং আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
তিনি আরও বলেন, এর আগে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জেলাপুলিশ পৃথক একটি মামলা করেছে। সেখানে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ কাজ করছে।



