Friday, March 6, 2026
হোমখবরঅর্থ-বাণিজ্যপদ্মা ব্যাংক এখন থেকে চলবে এক্সিম নামে

পদ্মা ব্যাংক এখন থেকে চলবে এক্সিম নামে

সম্পর্কিত সংবাদ

একীভূত হওয়ার লক্ষ্যে এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেছে বেসরকারি খাতের পদ্মা ব্যাংক। একীভূত হওয়ার পর এটি এক্সিম ব্যাংক নামেই কার্যক্রম পরিচালনা করবে। পদ্মা ব্যাংকের পরিচালকরা কেউ একীভূত ব্যাংকের পরিচালক পদে থাকতে পারবেন না। তবে শেয়ারহোল্ডারদের অংশীদারিত্ব থাকবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, অডিট ফার্ম নিয়োগ করে পদ্মা ব্যাংকে পরিচালকদের দায়-দেনা নির্ধারণ করা হবে। আর কোনো খেলাপিকে ছাড় দেয়া হবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

সোমবার (১৮ মার্চ) সমঝোতা স্মারকে সই করেন এক্সিম ব্যাংকের এমডি ফিরোজ হোসেন ও পদ্মা ব্যাংকের এমডি তারেক রিয়াজ খান। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার, ‘এক্সিম ব্যাংক ও বিএবি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার, পদ্মা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও সোনালী ব্যাংকের এমডি আফজাল করিমসহ তিন প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।’

সমঝোতা স্মারক শেষে এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, ‘পদ্মা ব্যাংকে একীভূত করার ক্ষেত্রে সরকারের কোন চাপ ছিল না, তবে সরকারের পক্ষ থেকে পরামর্শ ছিল। আমরা এটা করেছি দেশের স্বার্থে, দেশের অর্থনীতির স্বার্থে। পদ্মাকে একীভূত করা হলেও আমানতকারীদের কোন সমস্যা হবে না, সবাই নিরাপদে থাকবেন। পদ্মা ব্যাংকের আমানতকারীরা এক্সিম ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে পারবে।’

নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, ‘আগামীকাল (১৯ মার্চ মঙ্গবার) থেকে আর পদ্মা ব্যাংক থাকছে না। ব্যাংকটিকে একীভূত করার কারনে নতুন কার্যক্রম চলবে এক্সিম ব্যাংকের নামে। একীভূত করা হলেও কোনো এমপ্লয়ি চাকরি হারাবেন না। তবে পদ্মা ব্যাংকের পরিচালকরা এক্সিম ব্যাংকের পরিচলানা পর্ষদে থাকতে পারবেন না।’

তিনি বলেন, ‘বিশ্বে দুই পদ্ধতিতে একীভূত করা হয়। আমরা একুইজিশন করি নাই, মার্জ করেছি। একটা সবল ব্যাংক এবং তুলনামূলক একটু দুর্বল ব্যাংকের মধ্যে মার্জ হয়েছে। পদ্মা ব্যাংকের মানবসম্পদ যেটা রয়েছে প্রায় ১২০০ কর্মী তাদের কারো চাকরি যাবে না। সবাই কর্মরত থাকবেন এক্সিম ব্যাংকের হয়ে। আমাদের আমানতকারী ও শেয়ারহোল্ডারদের কোনো ক্ষতি হবে না। আগের মতোই চলবে।’

পরিচালকদের বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘যেহেতু এক্সিম পদ্মাকে মার্জ করেছে। এটা কাল (মঙ্গলবার) থেকে পদ্মা ব্যাংক পুরোটা এক্সিম ব্যাংক হয়ে গেলো। তবে এমডি বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। তারা দুজনই ডায়নামিক আমরা চেষ্টা করবো একটা ভালো সম্মাননীয় অবস্থানে তাদের রাখতে।’

দেশে ২০১৩ সালে নতুন যে ৯টি ব্যাংক অনুমোদন পায়, তার একটি হলো পদ্মা ব্যাংক (সাবেক ফারমার্স)। শুরু থেকেই এটির কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ। যেমন অনুমোদন পাওয়ার আগেই ব্যাংকটি অফিস খুলে লোকবল নিয়োগ দিতে শুরু করেছিল। আবার সম্পর্কের ভিত্তিতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত জমা নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি শুরু করেন এর উদ্যোক্তারা। ফলে চার বছর না পেরোতেই সংকটে পড়ে ব্যাংকটি।

পরিস্থিতির চরম অবনতি হওয়ায় ২০১৭ সালে পদ ছাড়তে বাধ্য হন এই ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর। ব্যাংকটির এমডি এ কে এম শামীমকেও অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন এই ব্যাংককে বাঁচাতে মূলধনসহায়তা দেয় সরকারি চার ব্যাংক ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)। সেই সুবাদে ব্যাংকটির পরিচালনায় যুক্ত হন ওই চার ব্যাংক ও আইসিবির প্রতিনিধিরা। পদ্মা ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন চৌধুরী নাফিজ সরাফাত।

সাবেক ফারমার্স ব্যাংকে অনিয়মের পর দেশছাড়া হন মহীউদ্দীন খান আলমগীর। আর জেলে আছেন নির্বাহী কমিটির তৎকালীন চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতি ওরফে বাবুল চিশতি এবং তার ছেলে রাশেদুল হক চিশতি। গত বছরের অক্টোবরে ১৬০ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় তাদের ১২ বছরের সশ্রম কারাদ- হয়েছে।

এছাড়া সমস্যা প্রকট হয়ে ওঠায় পদ্মা ব্যাংক শেষ পর্যন্ত বড় আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে না পেরে তাদের শেয়ার দেয়ার পরিকল্পনা করে। এই ব্যাংকের আমানতকারীদের মধ্যে সবই সরকারি ব্যাংক, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সরকারি খাতের ট্রাস্ট তহবিল। তারা পদ্মা ব্যাংকের শেয়ার নেওয়ার ব্যাপারে সাড়া দেয়নি। ফলে ব্যাংকটির সামনে একীভূত হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ থাকেনি।

গত ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের শেষে পদ্মা ব্যাংকে আমানতের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানত ২ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রমালিকানাধীন সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী ব্যাংক ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) ১ হাজার কোটি টাকা এবং জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড ও জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ৭৬০ কোটি টাকা। এছাড়া বাকি এক হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি আমানত হচ্ছে জীবন বীমা করপোরেশন, সাধারণ বীমা করপোরেশন, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, তিতাস গ্যাস, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ অবকাঠামো ফিন্যান্স ফান্ড লিমিটেড (বিআইএফএফএল), ইসলামিক ফাউন্ডেশন, নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের। গত কয়েক বছরে ব্যাংকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ৮৭৪ কোটি টাকা ফেরত দিয়েছে। এখন এসব প্রতিষ্ঠান জমা টাকা ফেরত পাচ্ছে না, কেউ কেউ সুদও পাচ্ছে না।

ব্যাংকটির দেয়া ঋণের পরিমাণ ৫ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে ৩ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা। ফলে ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৬২ শতাংশ। ফলে ঋণ থেকে যে আয় হচ্ছে, তা দিয়ে আমানতের সুদ পরিশোধ করা যাচ্ছে না। ব্যাংকটি এখন বড় লোকসানে চলছে। এমন পরিস্থিতিতে গত মাসের শুরুতে ব্যাংকের চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফাত পদত্যাগ করেন। এর পর থেকে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফজাল করিম পদ্মা ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি সোনালী ব্যাংকের প্রতিনিধি হিসেবে ব্যাংকটির পরিচালক। গত বৃহস্পতিবার পদ্মা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

পদ্মা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ পৌনে চার হাজার কোটি টাকা ও সরকারি ব্যাংকের দায় প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা রয়েছে পদ্মার কাছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখন যেহেতু পদ্মাকে মার্জার করা হলো এর ফলে পদ্মা ব্যাংকের সকল দায়-দেনা এখন এক্সিম ব্যাংক নিয়ে নিয়েছে। তাছাড়া দুই ব্যাংকের এসেটও আছে।’

শরিয়াভিত্তিক ব্যাংক নিয়ে তিনি বলেন, ‘এক্সিম ব্যাংক শরিয়াভিত্তিক। পদ্মা ব্যাংক সাধারণ হলেও আমরা (এক্সিম) যেহেতু তাদেরকে মার্জ করেছি তাই তারাও শরিয়াভিত্তিক হবে। এক্সিম ব্যাংকের প্রতিটি সূচক ভালো অবস্থানে আছে। আশা করবো পদ্মাও খুব শীঘ্রই ভালো হবে।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক জানান, ‘ডিফল্টারদের পার পাওয়ার কোন সুযোগ নেই। দুটি অডিট ফর্ম নিয়োগ করা হবে। অডিটর মাধ্যমে পরিচালকদের দায় দেনাও উঠে আসবে। আইনি প্রক্রিয়া ফলো করে আমরা সামনের দিকে আগাবো। যত দ্রুত সম্ভব দুটি ব্যাংকে মার্জ করে ঘোষণা দেওয়ার পর পদ্মা ব্যাংক এক্সিম ব্যাংক এ পরিণত হবে। তখন চাইলে এই ব্যাংকের গ্রাহক এক্সিম ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে পারবে।’

সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মুখপাত্র বলেন, ‘কোনো ব্যাংক এখনও দেউলিয়া হয়নি। ব্যাংকের পর্যায়ে কাজ শেষ হলে আদালত এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কিছু কাজ আছে। এসব প্রক্রিয়া শেষ হলে যত দ্রুত সম্ভব কাজ শেষ করে জানানো হবে।’

সম্প্রতি

আরও খবর