রবিবার, জানুয়ারি ১১, ২০২৬
হোমখবরঅর্থ-বাণিজ্যস্বল্পোন্নত দেশের খোলস থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান রেহমান সোবহানের

স্বল্পোন্নত দেশের খোলস থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান রেহমান সোবহানের

অর্থনৈতিক বার্তা পরিবেশক

সম্পর্কিত সংবাদ

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মর্যাদার সুরক্ষিত খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান। তিনি বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাকের বাজার ধরে রাখা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজার সুবিধা পেতে এলডিসি মর্যাদা আরও কিছুদিন ধরে রাখতে চাইছি। এটা পুরনো চিন্তা ভাবনা। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমাদের রপ্তানি হয় ৮ বিলিয়ন বা ৮০০ কোটি ডলারের মতো। কিন্তু সেই বাজার ক্রমেই রাজনৈতিক কারণে অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। এই অনিশ্চয়তা অর্থনৈতিক কারণে নয়।’

বাংলাদেশের নীতি প্রণেতাদের আরও গতিশীল হওয়ার আহ্বান

বিশ্বক্ষমতার ভরকেন্দ্র ক্রমেই পূর্ব দিকে যাচ্ছে, বাংলাদেশকে নতুন কৌশল

সাজাতে হবে

বাংলাদেশ রপ্তানিতে বৈচিত্র্য ও আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থায় সম্পৃক্ত হতে পারেনি

শনিবার,(২২ নভেম্বর ২০২৫) রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৫’ সম্মেলনের প্রথমদিন এসব কথা বলেন রেহমান সোবহান।

রেহমান সোবহান আরও বলেন, ‘বিশ্ব ব্যবস্থার ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে। এক সময় সারা বিশ্ব পশ্চিমের শাসনে থাকলেও ক্ষমতার ভরকেন্দ্র এখন ক্রমেই পূর্ব দিকে চলে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন করে সাজাতে হবে। যে বাজারে পুঁজি সবচেয়ে বেশি সহজলভ্য এবং যে বাজারে দীর্ঘস্থায়ী প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা আছে, বাংলাদেশের সেদিকেই যাওয়া উচিত।’

ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ পশ্চিমঘেঁষা বলে মন্তব্য করেন রেহমান সোবহান। তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর আমাদের জিডিপির ১০-১৫ শতাংশ আসতো পশ্চিমা সহায়তা থেকে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে। কিন্তু এখন সেই বাস্তবতা নেই। এখন বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা ২ শতাংশের মতো। এমনকি যে সহায়তা আমরা পাই, তার একটি অংশ অব্যবহৃত থেকে যায়। এখনও প্রায় ৫০ বিলিয়ন বা ৫ হাজার কোটি ডলারের মতো বিদেশি সহায়তার প্রতিশ্রুতি পাইপলাইনে পড়ে আছে। আমাদের পুঁজির প্রধান উৎস এখন এশীয় দেশগুলো। এই দেশগুলো বিশেষ করে জাপান ও চীন বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্পে ৪০ বিলিয়ন বা ৪ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে।’

রেহমান সোবহান আরও বলেন, ‘সামগ্রিক বিচারে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের শীর্ষ জিডিপি হলেও চীন অনেকটাই ওপরে উঠে এসেছে। ভারত দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে দক্ষিণের দেশগুলোর প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার হচ্ছে চীন। বৈশ্বিক পুঁজির বড় একটি অংশ সরবরাহ করছে চীন। অনেক দেশ চীনের বাজারে প্রবেশ করছে এবং চীনের পুঁজি ব্যবহার করে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ তার নিকটবর্তী দুটি বড় বাজার ঠিকঠাক ব্যবহার করতে পারেনি। সেই দুটি বাজার হচ্ছে ভারত ও চীন। ভারত সেই ২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশের অধিকাংশ পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়ে রেখেছে। চীনও কয়েক বছর আগে এই সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু আমরা রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে পারিনি। আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থায় সম্পৃক্ত হতে পারিনি।’

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের করণীয় সম্পর্কে আলোকপাত করেন রেহমান সোবহান। তিনি বলেন, ‘আমাদের নীতি প্রণেতাদের আরও গতিশীল হতে হবে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে আরও উদ্ভাবনী হতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাকের বাজার ধরে রাখা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজার সুবিধা পেতে এলডিসি মর্যাদা আরও কিছুদিন ধরে রাখতে চাইছি, তা পুরনো চিন্তা। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমাদের রপ্তানি হয় ৮ বিলিয়ন বা ৮০০ কোটি ডলারের মতো। কিন্তু সেই বাজার ক্রমেই রাজনৈতিক কারণে অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে, এই অনিশ্চয়তা অর্থনৈতিক কারণে নয়।’

পশ্চিমা দেশগুলোর সমালোচনা করে রহমান বলেন, ‘এই দেশগুলো শুল্কারোপ করে এবং প্রযুক্তি রপ্তানিতে সীমাবদ্ধতা আরোপ করে ক্ষয়িষ্ণু অর্থনৈতিক প্রাধান্য ধরে রাখার চেষ্টা করছে। এগুলোর সঙ্গে বাজার অর্থনীতির সম্পর্ক নেই। এই নীতির দীর্ঘস্থায়িত্ব নেই। ফলে পশ্চিমা দেশগুলো সুরক্ষাবাদী নীতির মাধ্যমে না পারবে তাদের শিল্পের ভিত্তি ফিরিয়ে আনতে, না পারবে উন্মুক্ত বাজার হিসেবে নির্ভরযোগ্যতা বজায় রাখতে। সে লক্ষ্যে রপ্তানি পণ্যের ঝুড়িতে যেমন বৈচিত্র্য আনতে হবে, তেমনি আঞ্চলিক বৃহৎ শক্তিগুলোর সরবরাহ ব্যবস্থা অঙ্গীভূত হতে হবে।’

রেহমান সোবহান বিশ্ব ব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘রোমান সাম্রাজ্যের পর এই প্রথম বৈশ্বিক সামরিক শক্তি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তির মধ্যে সুস্পষ্ট বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের প্রধান সামরিক শক্তি, কিন্তু প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি নয়। ২০৫০-এর দশকে উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর সম্মিলিত জিডিপি বর্তমান জি-৭ দেশগুলোর দ্বিগুণ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ পরিবর্তনের কারণ এশীয় অর্থনীতিগুলো প্রাকৃতিক সম্পদ নির্ভর নয় বরং তারা প্রতিযোগিতামূলকভাবে পণ্য ও সেবা উৎপাদনে সক্ষম। বর্তমানে চীন প্রায় ৭০টি দেশের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব মূলত পশ্চিম ইউরোপ এবং কিছু ছোট ক্যারিবীয় দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ।’

সম্প্রতি

আরও খবর