রাজধানির বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির পর বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় সরকারি সংস্থাগুলোর চালানো অভিযানকে ‘ব্যর্থতা ঢাকার অভিযান’ বলে মনে করছেন রেস্তারাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান।
গতকাল রাজধানী পুরানা পল্টনে আল-রাজী কমপ্লেক্সে সমিতির প্রধান কার্যালয়ে সংবাদকে এ কথা বলেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘অভিযান পরিচালনা করে যেভাবে প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হচ্ছে, ম্যানেজার কর্মচারীদের অ্যারেস্ট করা হচ্ছে, এটা কোনভাবেই কাম্য নয়।”
তিনি প্রশ্ন তোলেন, সিলিন্ডার কি নিষিদ্ধ? সিলিন্ডার কি বোম?
তিনি আরো বলেন, যেভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, সিলিন্ডার বোম। তাহলে কেন বাজারে আসছে? কেন বাসাবাড়িতে সিলিন্ডার ব্যবহারিত হচ্ছে? রেস্টুরেন্টে আমরা কি দিয়ে রান্না করবো? হাওয়া দিয়ে?
রেস্তারাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব বলেন, ‘তিতাস গ্যাস কে তো বন্ধ করে রাখা হয়েছে। সিলিন্ডারের দশহাজার কোটি টাকার মার্কেট আছে। শুনছি আগামী ৫ বছরের মধ্যে ৪০ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকার মার্কেট হবে। তিতাস গ্যাসকে কারা পঙ্গু করে দিয়েছে ? কারা সৃষ্টি করেছে.. লাল ফিতায় তো বন্ধি। বাপেক্্রকে শক্তিশালী করেছেন?’
তিনি বলেন, “কিছুদিন আগে গ্যাস স্বল্পতায় সারাদেশ অচল হয়ে গেল। এলএমজি ইমপোর্ট করে আমাদের ফরেন রিজাভ খালি হয়ে গেল। প্লানিং কারা করেছে ?
“আমরা তো ছোট ব্যবসায়ী, হাতির খবর জানিনা, জানি শুধু সরকার বাজারে তিতাস গ্যাস দিচ্ছে না, দিচ্ছে সিলিন্ডার।
“বাংলাদেশে পর্যাপ্ত ইলেকট্রিসিটি আছে যে, সেটা দিয়ে রান্না করবো? আর আমাদের ফুড কি ইলেকট্রিসিটি দিয়ে রান্না হয়?।
“পৃথিবীর সমস্থ দেশে সিলিন্ডার ব্যবহার হয়। কোথায় হয় না? হয় সিলিন্ডার হবে, না হয় ইলেকট্রিসিটি হবে না হয় সাপ্লাই গ্যাস হবে।”
তিনি যোগ করেন, ‘আমরা বহুদেশ দেখেছি। এখানে তো মগের মুল্লুক। একটা ব্যবসা করার জন্য ১৫ টা লাইসেন্স নিতে হয়। লাইসেন্স নেয়ার জন্য সারাদিন দৌড়াবেন আর শুধু আমাদের পকেট কাটবে। যে যার মতো আমাদের আটকায়া টাকা নেবে। যে যার মতো আমাদের হ্যস্ত ন্যস্ত করবে, যা মন চায়। সারাদিন ১২-১৩ টা মোবাইল টিম চলবে। শুধু আমরাই বলির পাঠা।’
‘যাদের ব্যার্থতা, তাদের ব্যর্থতা ঢাকার জন্যই এই অভিযান,’ বলেন ইমরান।
‘এই যে রেস্তরা দিনের পর দিন কিভাবে গড়ে উঠেছে। মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, মানুষের রুটি রুজির ব্যবস্থা হয়েছে। আমরা তো সরকারকে টে দিয়েছি, ভ্যাট দিয়েছি।’
‘এই অভিযান কোন ভাবেই আমাদেরকে হেয় না কওে, জোর দেন ইমরান হাসান।
তিনি মনে করেন, বহুজাতিক কোম্পানির যে ব্যবসা তুলে দেয়ার জস্য ‘এই অশান্তিটা হচ্ছে। কথায় আছেনা ,কাবো ঘর পোড়ে কেউ আলু পোড়া দিয়ে খায়। আমাদের ঘর পুরছে আর আলু পোড়া দিয়ে খাবার জস্য একটি গোষ্ঠি ব্যস্ত। অলিতে গলিতে কোটি পতিরা তাদের ব্যবসা নিয়ে গেছে। তারা ২০-২৫ দিনের বাসি রেস্তরার প্রডাক্টগুলি ফ্রেজেন ফুড বলে বিক্রি করছে।তারা তাদের সাম্রজ্য বাড়াচ্ছে।’
তাই, “বড় বড় সব কোম্পানি তাদের ব্যবসা নিয়ে যাওয়ার জন্য ষড়যন্ত্র করছে।
“এবং তাদের পেইড এজেন্ট আছে এই সরকারের আমলাতন্ত্রের ভিতরে। এই আমলারা কিন্তু রিটায়ার্ড করে ঐ কোম্পানিতে জয়েন্ট করে। তাই সুবিধা অনুযায়ী প্লান করে তারা তাদেরকে আগাইয়া দেয়। ঐ বহুজাতিক কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় না।
তিনি আরো বলেন, কাল তো এসআলম গ্রুপে আগুন লাগলো। স্টেটমেন্ট দেখি নাই। আমরা তো মনে করি, রোজার আগে কালকে ১ লাখ টন চিনিতে আগুন লাগছে- হয় ষড়যন্ত্র মালিক নিজে করেছে, নয় অন্য কেউ করেছে।’
এই পরিপ্রেক্ষিতে কী চাইছেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাত চাই। এই দেশটা আমাদের সবার। কেউ আমাদের দেশকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলুক আমরা তা চাইনা। এই সেক্টরে ৩০ লাখ শ্রমিক কাজ করে উনি যদি চায় আমরা ব্যবসা বন্ধ করে দিব।’
বর্তমান অভিযান ফলপ্রসু হবে বলে মনে করেন কী? জবাবে তিনি বলেন,‘অবশ্যই হবে। মাথা ব্যাথা হলে কি মাথা কেটে ফেলে দিতে হবে। আমলাতন্ত্রের লাল ফিতায় আমরা বন্দি। সমস্যা আছে বলতে চাই। সমাধান করতে চাই। কোন কথা নাই বার্তা নাই রেস্তরা বন্ধ করে দিলেন।’
এর আগে সমিতির প্রধান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, ‘এই মুহূর্তে অভিযানের নামে সারা ঢাকা শহরে একটি তাণ্ডব চলছে। আজকে সকালে নবাবী ভোজ নামের একটি রেস্তোরাঁ বন্ধ করেছে। অথচ এই রেস্তোরাঁয় সরকারের প্রয়োজনীয় ১২টি সংস্থার লাইসেন্স রয়েছে। এখন রাজধানীর সকল রেস্তোরাঁয় সিটি করপোরেশন, রাজউক বা সরকারের আরো অনেক সংস্থা হয়রানি করছে। এখন যে পরিমাণ হয়রানি আমাদের করা হচ্ছে, এটা আসলে কোনো সভ্য দেশে হতে পারে না। আমি বলি হায়েনার মত ঝাঁপিয়ে পড়েছে।’
এ পর্যন্ত রাজধানীতে অভিযানে ৪২টি রেস্তোরাঁ বন্ধ হওয়ার তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন বলছে, গ্যাস সিলিন্ডারেরও লাইসেন্স লাগবে। সিলিন্ডার কি আমরা বানিয়েছি? সিলিন্ডার তো বাজার থেকে নিয়েছি। তাহলে যারা সিলিন্ডার বিক্রি করছেন, তারা কি লাইসেন্স ছাড়া বিক্রি করছেন? আমরা আর কত লাইসেন্স দেখাব।’
তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযানে ‘ঢালাওভাবে’ সিলগালা না করে সুষ্ঠুভাবে রেস্তোরাঁ ব্যবসা পরিচালনায় টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব করেছে মালিক সমিতি।
সমিতির নেতা ইমরান সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সমস্যা সমাধানে একটি কার্যকর টাস্কফোর্স গঠন করে আগামী তিন থেকে ছয় মাসের সমস্ত রেস্তোরাঁকে কমপ্লায়েন্সের (সুনির্দিষ্ট নির্দেশাবলী) আওতায় নিয়ে আসার জন্য কাজ করতে হবে। এই টাস্কফোর্সে সরকারের সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে লোক থাকতে হবে। টাস্কফোর্সে রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির লোক থাকবে, প্রয়োজনে এফবিসিসিআই এবং বুয়েটের বিশেষজ্ঞ থাকবে।”
গঠিত টাস্কেফোর্স তিন থেকে ছয় মাস ধরে একটি কমপ্লায়েন্স তৈরি করবে- এমন প্রস্তাব রেখে তিনি বলেন, “সেই কমপ্লায়েন্স পূরণ করতে পারলে রেস্তারাঁ মালিক ব্যবসা করবে। নির্দিষ্ট একটা সময় দেবে, এর মধ্যে কমপ্লায়েন্স পূরণ করতে না পরলে আমরা ব্যবসা বন্ধ করে দেব। তবে যাদের যেভাবে সময় প্রয়োজন, কারো এক মাস, কারো তিন মাস সময় দিতে হবে।
“দেশের রেস্তোরাঁ ব্যবসাকে সরকারের সকল প্রতিষ্ঠান ও রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি মিলে একটি নিরাপদ খাতে উন্নীত করতে হবে।”
রেস্তোরাঁ ব্যবসায় সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নিতে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ প্রকাশ করে ইমরান বলেন, “গতকালকে (সোমবার) প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি পাঠিয়েছি এবং রিসিভ করিয়েছি। আমরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে পুরো বিষয়টি বুঝিয়ে বলতে চাই।”



