সংবাদ সংগ্রহে গিয়ে আদালত পাড়ায় জামায়াতপন্থি কয়েকজন আইনজীবীর হাতে তিন সাংবাদিক ‘হেনস্তার শিকার’ হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পরবর্তীতে ওই তিন সাংবাদিককে কাঠগড়ায় ডেকে নিয়ে কারাগারে পাঠানোর কথা বলে সতর্ক করেছেন ঢাকার মহানগর হাকিম হাসিব উল্লাহ পিয়াস। পরে ক্ষমা চাওয়ার শর্তে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। মঙ্গলবার,(২৮ অক্টোবর ২০২৫) ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত প্রাঙ্গণে আসামির ভিডিও করতে গেলে এ ঘটনা ঘটে।
তিন সাংবাদিক হলেন- দৈনিক কালের কণ্ঠের নিজস্ব প্রতিবেদক মাসুদ রানা, একুশে টেলিভিশনের প্রতিবেদক আরিফুল ইসলাম এবং দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকার প্রতিবেদক আরিফুল ইসলাম। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েটের ছাত্র ফারদিন নূর পরশ হত্যা মামলায় ঢাকা মহানগর হাকিম জামসেদ আলমের আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। এদিন ফারদিনের বন্ধু আমাতুল্লাহ বুশরা এবং ফারদিনের বাবা নুর উদ্দিন রানাও আদালতে হাজির হন।
তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির এএসপি মশিউর রহমান প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেননি। এজন্য আদালত আগামী ৩০ নভেম্বর প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করে। পরে বুশরা যখন আদালত থেকে বের হন, তখন তা ভিডিও করতে যান কালের কণ্ঠের নিজস্ব প্রতিবেদক মাসুদ রানা, একুশে টেলিভিশনের প্রতিবেদক আরিফুল ইসলাম এবং দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকার প্রতিবেদক আরিফুল ইসলাম।
তবে জামায়াতপন্থি আইনজীবী রেজাউল হক রিয়াজ, হাতিরঝিল থানার জামায়াতের রোকন ও আইনজীবী আক্তারুজ্জামান ডালিমসহ কয়েকজন তাদের ভিডিও করতে বাধা দেন। সাংবাদিকরা পেশাগত কারণে ভিডিও করার কথা জানালে ওই আইনজীবীরা আরও চড়াও হন। এ সময় তারা তিন সাংবাদিককে বিচারকের কাছে ধরে নিয়ে যেতে উদ্যত হন।
তখন সাংবাদিকরা জানান, তারা আদালতে বাইরে আসামির ছবি তুলছেন। আসামির ছবি বা ভিডিও নিতে আদালতের অনুমতির প্রয়োজন নেই। এই কথায় উপস্থিত আইনজীবীরা ঢাকার মহানগর হাকিম হাসিব উল্লাহ পিয়াসের আদালতের সামনে তাদের চারদিক থেকে ঘিরে ধরেন। একপর্যায়ে আইনজীবী আক্তারুজ্জামান ডালিম এক সাংবাদিকের মোবাইল ফোন ‘কেড়ে নেন’। এ সময় এই মামলার বাদী নুর উদ্দিন রানাকে দেখে হুমকি দিতে থাকেন তিনি।
বাদীকে উদ্দেশ্য করে আইনজীবী আক্তারুজ্জামান ডালিম বলেন, ‘আপনি সাংবাদিকদের ডেকে এনেছেন।’ এরপর মহানগর হাকিম হাসিব উল্লাহ পিয়াস তার আদালতে এই তিন সাংবাদিককে এজলাসে ডেকে নেন। এ সময় আইনজীবী রেজাউল হক রিয়াজ ‘কৌশলে পালিয়ে যান’। তখন বিচারক তিন সাংবাদিককে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করান।
বিচারক সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনাদের পরিচয় দেন’। সাংবাদিকদের পরিচয় জানার পর বিচারক বলেন, ‘আপনারা কোর্টের সামনে হাঙ্গামা করেছেন। এখন ১১টা ৩৮ বাজে, আপনাদের কারাগারে পাঠানো হবে। আর কোনো কথা হবে না। আপনাদের সবার মোবাইল নিয়ে নেয়া হোক।’ মিনিট দুয়েক পর বিচারক বলেন, ‘আপনারা নিঃশর্ত ক্ষমা চাইলে ছেড়ে দিবো। নাহলে কারাগারে যেতে হবে। কোনো ছাড় নেই।’ নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার পরে এই তিন সাংবাদিককে ছেড়ে দেয়ার অনুমতি দেয় আদালত।
এ বিষয়ে সাংবাদিক মাসুদ রানা বলেন, ‘সংবাদ সংগ্রহে গেছিলাম। কিন্তু কয়েকজন আইনজীবী ভিডিও তুলতে বাধা দিয়ে মব সৃষ্টি করে। পরে বিচারক অতি উৎসাহী হয়ে আমাদের তিনজনকে কাঠগড়ায় ডাকেন। আমাদের পরিচয় জেনে বিচারক বলেন, আপনারা বসেন। সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হবে।’
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকার রিপোর্টার আরিফুল ইসলাম জানান, ‘আমরা আসামির ভিডিও ধারণ করতে গেলে তাদের আইনজীবীরা চড়াও হন। আমাদের একজনের মোবাইল কেড়ে নেন। ভিডিও ধারণ করায় বিচারকের কাছে জোর করে তারা আমাদের নিতে চেয়েছে। আমরা যেতে না চাওয়ায় তারা খুব খারাপ আচরণ করতে থাকেন। এ সময় আরেক আদালতের বিচারক আমাদের এজলাসে ডাকেন। এরপর কাঠগড়ায় যেতে বলেন। বিচারক কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কারাগারে পাঠানোর হুমকি দেন। কোন অপরাধ না করেই নিঃশর্তে ক্ষমা চাওয়া লেগেছে। বিষয়টি খুব দুঃখজনক।’
অভিযোগের বিষয়ে আইনজীবী আক্তারুজ্জামান ডালিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন, ‘একটা ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে। পরে বিচারক ডেকে সমাধান করে দিয়েছেন।’ আইনজীবী রেজাউল হক রিয়াজ বলেন, ‘অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে আমার কিছু বলার নেই।’ এ ঘটনায় আদালত পাড়ায় কর্মরত সাংবাদিকদের সংগঠন কোর্ট রিপোর্টার্স ইউনিটি (সিআরইউ) প্রতিবাদ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
সংগঠনের সভাপতি লিটন মাহমুদ বলেন, ‘সাংবাদিকদের ওপর হামলার চেষ্টা অত্যন্ত নিন্দনীয়। এদিন ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াসের আদালতের বাইরে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে কোর্টে ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয় অথবা ব্যাঘাত সৃষ্টি করে এমন কে নো অপেশাদার আচরণ করেননি। সাংবাদিকর শুধুমাত্র তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছেন।
‘সেখানে জামায়াতের আইনজীবীদের দ্বারা হেনস্তার স্বীকার হন সাংবাদিকরা। এ সময় ওই সব আইনজীবীদের হট্টগোলে আদালতে পরিবেশ নষ্ট হয়। যার ভিডিও ফুটেজ রয়েছে। এসব বিবেচনায় না নিয়ে সংশ্লিষ্ট কোর্টের বিচারক অতিউৎসাহী হয়ে উল্টো তিন সাংবাদিককে ডেকে নিয়ে জেলে পাঠানোর হুমকি দেন।’ তিনি বলেন, ‘একজন বিচারকের কাছে এমন আচরণ কাম্য নয়। যা অত্যন্ত নিন্দনীয়। আমি ওই বিচারকের অপসারণসহ বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাই। এ বিষয়ে আমরা প্রধান বিচারপতির কাছে লিখিত অভিযোগ জানাবো।’



