গত রবিবার সকালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত ইজরায়েলি দূতাবাসের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন ২৫ বছর বয়সী বিমান বাহিনীর সদস্য অ্যারন বুশনেল। এসময় তার পরনে ছিল বিমানবাহিনীর পোশাক।
তিনি বলেন, আর ‘গণহত্যার অংশ হয়ে থাকতে চান না’ তিনি। দগ্ধ হওয়ার সময় তিনি ‘ফিলিস্তিন স্বাধীন কর’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন ও কিছুক্ষণ পর মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। কয়েক ঘন্টা পর হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
নিজের এই কাজটিকে তিনি ‘তীব্রতম প্রতিবাদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং ওয়াশিংটনের বাইরেও সারা বিশ্বের কাছে তার এই বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য তার আত্মহনের পুরো ঘটনাটিকে লাইভ স্ট্রিম করেন।
অরজিনাল ভিডিওটিকে ইন্টারনেট থেকে সরিয়ে দেওয়া সত্বেও তার এই আত্মহননের ফুটেজ সোশ্যাল মিডিয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তার স্মরণে গাজায় ইসরাইলি হামলার প্রতিবাদী মতাদর্শীরা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে শোক সভা আয়োজন করেন।
হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মোতাবেক সেখানে মৃতের সংখ্যা এই সপ্তাহে ৩০ হাজার ছাড়িয়েছে।
বুশনেলের এই কর্মকাণ্ডে অনেকে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করেছেন এবং আশঙ্কা করছেন যে তার এই কাজে উৎসাহিত হয়ে আরো অনেকেই এমন মারাত্মক পন্থা অবলম্বন করতে পারেন।
তবে তার আপনজনদের কাছে বিষয়টি বেশ স্পর্শকাতর ও বিস্ময়কর। তার এই কর্মকাণ্ডে তার সব থেকে কাছের মানুষরাও যার পর নাই অবাক হয়েছেন। তারা একই সাথে স্বজন হারানোর বেদনায় কাতর ও ঘটনার আকস্মিকতায় স্তম্ভিত৷
সেই সাথে হঠাৎ করে বিশ্ব মিডিয়ার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছেন তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের স্যান এন্টোনিও তে অবস্থিত লেকল্যান্ড এয়ার বেইজে কর্মরত ছিলেন অ্যারন বস্নেল। ২০২০ থেকে গত বছর পর্যন্ত এই শহরেই তিনি বসবাস করেন।
সেখানে তার পরিচিতজনেরা বলেন বুসনেলের মৃত্যু বিভিন্ন মহলে ‘শকওয়েভের মত’ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
শুক্রবার স্যান এন্টনিওতে একটি শোক সভা শুরুর আগে বুশনেলের পরিচিতদের মধ্যে একজন, মেসন এসামিলা(২৫) বিবিসিকে বলেন, “প্রথমত, সে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে এমন বিষয়ের প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের একমাত্র পন্থা এটি, তার এমন মনে হওয়ার এই ব্যাপারটিই সবথেকে আকস্মিক ও দুঃখজনক। এটা দুঃখের যে তাকে এই পথ বেছে নিতে হয়েছে । এমনকি যুদ্ধ বিরতির পক্ষপাতি ও ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতিশীল মানুষদের জন্যও বিষয়টি অনুধাবন করা কঠিন।”
সেখানে বসবাসরত ফিলিস্তিনি সহ কমপক্ষে ২০০ মানুষ এইসব সভায় অংশ নেন। এক এক করে তার বন্ধুরা তার স্মরণে বক্তব্য রাখেন ও দুঃখ প্রকাশ করেন।
এই ঘটনার আগে জনাব এসামিলা একজন ‘সাধারণ চুপচাপ বন্ধু বৎসল ও মজার মানুষ’ হিসেবে বুস্নেল কে চিনতেন। যে রুট বিয়ার খেত, বামপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শ ধারণ করত এবং গৃহীনদের সাহায্যকারী সংগঠনের সাথে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতো। এই বৈমানিকের সুগার নামে একটি বিড়াল ছিল এবং তিনি লর্ড অব দ্য রিং সিরিজটি বেশ পছন্দ করতেন।
স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করতে গিয়ে বুশনলের পরিচিত ও পরে বন্ধু হন মুন। যিনি শুধুমাত্র ডাকনামেই সম্বোধিত হতে চেয়েছেন।
তিনি জানান, বুশনেল খুবই দৃঢ় ইচ্ছা শক্তির অধিকারী ছিলেন। তিনি বলেন, তার শেষ মুহূর্তের দৃশ্যগুলো ‘দেখা বেশ কঠিন ছিল‘।
৩২ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি আয়োজক সারা মাসউদ, যিনি এই শোক সভায় অংশ নেন, জানান যে তার মৃত্যু সংবাদটি ‘হৃদয়বিদারক ছিল‘।
তিনি আরো বলেন, এই আকস্মিক ঘটনা কর্মী মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন যারা তার এমন ‘বিস্ময়কর কর্মকাণ্ডের নেপথ্যের নিষ্ফলতার সাথে একাত্মতা বোধ করছেন।‘
বুশনেল নিজেকে একজন নৈরাজ্যবাদী হিসেবে বর্ণনা করেন। একবার লিখেছিলেন যে তিনি ‘আইনি পদ্ধতিতে সকল প্রকার ক্ষমতার অনুক্রমিক কাঠামোর সার্বিক বিলুপ্তিকরণে বিশ্বাসী’
তার বন্ধুরা বলেন, বিমানবাহিনীর অধীনে স্যান এন্টনিওতে থাকাকালীন তিনি পাশাপাশি বেশ কিছু সমাজকল্যাণ ও মিউচুয়াল এইড গ্রুপে সক্রিয় ছিলেন এবং গৃহহীন মানুষদেরকে সাহায্য করার ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন।
প্রথম দিকে স্বেচ্ছাসেবক কার্যক্রমের সময়, ফার্স্ট এইড ও জামাকাপড় ইত্যাদি ত্রানসামগ্রী বিতরণের সময়, বুশনেল কিছুটা ‘লাজুক স্বভাবের ছিলেন”, মি. এসামিলা মনে করেন, তবে তিনি দ্রুতই সাহায্যপ্রার্থী মানুষের সাথে আন্তরিক হতে শুরু করেন।
এসামিলা বিশ্বাস করেন যে তিনি(বুশনেল) তার সৈনিক দায়িত্ব ও রাজনৈতিক মতাদর্শের মাঝে এক ধরনের দোটানা অনুভব করতেন।
গত বছর অক্টোবরে যখন ইজরাইল গাজা যুদ্ধ পুনরায় ছড়িয়ে পড়ে তখনও তিনি মিলিটারিতেই ছিলেন। ইজরায়েলের দক্ষিণ সীমান্ত অঞ্চলে হামাস বন্দুকদারীদের হামলায় প্রায় ১২০০ জন নিহত হন৷ তারা প্রায় আড়াইশো জনকে বন্দী করে গাজা উপত্যকায় নিয়ে যায় যাদের মধ্যে অনেকেই এখনো জীবিত আছেন।
ইসরাইলের পাল্টা হামলা, যে টিকে তারা হামাসকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে বলে দাবি করছেন তাতে প্রায় ১৮ লক্ষ ফিলিস্তিনি বাস্তহারা হয়ে পড়েছেন।
বুশনেল কট্টর ফিলিপিন পন্থী ও স্থানীয় অ্যাক্টিভিস্ট গ্রুপের সাথে যুক্ত থাকলেও তিনি যে গাজায় হামলার প্রতিবাদে নিজের জীবন দিয়ে দিবেন এমনটা কেউ ভাবতেও পারেননি।
ভিন্নধর্মী যাত্রা
অ্যারন বুশনেল বেড়ে ওঠেন ম্যাসাচুসেটসএর অরলিন্সের একটি বেশ গোরা ধার্মিক সমাজে। তার বন্ধুদের মতে যেটিকে ‘কমিউনিটি অফ জিসাস’ বলা হয়।
একজন বাল্যবন্ধু আসলি স্যুম্যান নিউ ইউর্ক টাইমসকে বলেন যে তিনি(বুশনেল) তাকে বলেন যে তিনি ২০১৯ এ ওই জায়গা ছেড়ে চলে আসেন।
এসামিলা জানান, তারপরে তিনি আর ওই কমিউনিটির সাথে যুক্ত ছিলেন না এবং তার পরিবারের সাথেও দূরত্ব বজায় রাখেন।
২০২১ সালে এবিসি নিউজ এর একটি তদন্তে কমিউনিটি অফ জিসাসের কিছু প্রাক্তন সদস্য এর বিরুদ্ধে মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ আনেন।
বুশনেলের বাবা-মা, কমিউনিটি অফ জিসাস ও এর একজন প্রাক্তন কর্মকর্তা বিবিসিকে বক্তব্য দেয়া থেকে বিরত থাকেন।
তরুণ বয়সে তিনি স্পিরিট উইন্টার পারকিউশন নামে একটি প্রতিযোগিতামূলক পারফমেন্স গ্রুপ এর সদস্য ছিলেন। ৬ বছর আগের একটি ফেসবুক গ্রুপ ফটোতে এই তরুণ শিল্পীর জমকালো রঙিন পোশাক ও চওড়া হাসি ছিল লক্ষণীয়।
“ওই সময় সে খেলাধুলা আর গান-বাজনা ছাড়া তেমন কিছু নিয়ে কথা বলত না” বিবিসিকে বলেন ব্রায়ান স্পেন্সার, যিনি ওই পারকিউশন গ্রুপে বুশনেলের সাথে ছিলেন।
“তবে সে একজন ভালো লোক ছিল এবং যে কোনও প্রয়োজনে তাকে পাশে পাওয়া যেত।”
বিমানবাহিনীর মতে, তিনি ২০২০ সালের সালের ৫ই মে যোগদান করেন। তার সর্বশেষ রোল ছিল সাইবার ডিফেন্স অপারেশন এ।
বুশনেলের বন্ধুরা বলেন, তিনি গত বছর স্যান এন্টনিও ত্যাগ করেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওহাইওতে বাস করতেন। তার লিংকডইন প্রোফাইলে দেখা যায় তিনি ইউএস মিলিটারির স্কিলব্রিজ প্রোগ্রামের অধীনে কাজ খুঁজছিলেন যেটা সার্ভিস শেষ হওয়ার পর প্রাক্তন সামরিক সদস্যদের সিভিলিয়ন জবের সুযোগ দেয়। তার মৃত্যুর সময় তিনি বাহিনীর সদস্য ছিলেন।
মার্কিন বিমাণ বাহিনীর কর্নেল সেলিনা নয়েস একটি বার্তায় বলেন, “সিনিয়র এয়ারম্যান বুশনেলের মৃত্যুতে আর পরিবার ও বন্ধুদের প্রতি আমরা আন্তরিক সমবেদনা প্রকাশ করছি।“
তার নাম কিভাবে বিশ্ববাসী জানলো তার পরিবর্তে তার বন্ধুরা তাকে যেভাবে চিনত এবং যে সমস্ত সৎকর্মে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন সেগুলোর প্রতি বিশেষ জোর দেওয়ার আহ্বান জানানো হয় শুক্রবারের শোক সভায়।
একজন নারী যিনি বুশনেলের স্বেচ্ছাসেবক সহকর্মী ছিলেন তিনি শুক্রবারে শোক সভায় তার বক্তব্য শুরু করার আগে বলেন, “আপনার এখন অনেক দুঃখের কথাই শুনবেন তবে অনেকগুলো ভালো কথাও শুনবেন কারণ এই একটি বিচ্ছিন্ন মুহূর্তই তার জীবনের সারমর্ম ছিল না”



