গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চিকিৎসাধীন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদির অবস্থা এখনও ‘আশঙ্কাজনক’ বলে জানিয়েছে তার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ড। শনিবার,(১৩ ডিসেম্বর ২০২৫) বিকেলে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালের আইসিইউ অ্যান্ড এইচডিইউর সিনিয়র কনসালটেন্ট ও কো-অর্ডিনেটর ডা. মো. জাফর ইকবালের পাঠানো বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়। বার্তায় বলা হয়েছে, সেখানে হাদির চিকিৎসায় বিভিন্ন বিভাগের ১৩ জন চিকিৎসকের সমন্বয়ে মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে।
সন্দেহভাজন একজনকে শনাক্তের দাবি পুলিশের, তথ্য দিতে অনুরোধ
হাদির হামলাকারীকে ধরিয়ে দিতে ৫০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা
গুলির ঘটনায় সীমান্তে বিজিবির কড়া নজরদারি ও তল্লাশি
হাদির বর্তমান অবস্থার বিষয়ে বলা হয়েছে, তার মস্তিষ্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ‘যেহেতু অস্ত্রোপচার হয়েছে সেহেতু এখন কনজারভেটিভভাবে ম্যানেজ করতে হবে। ব্রেইন প্রটেকশন প্রটোকল অনুসরণ করে অন্যান্য সব সাপোর্ট চালিয়ে যেতে হবে। যদি অবস্থা একটু স্থিতিশীল হয়, তাহলে মস্তিষ্কে আবার সিটি স্ক্যান করানো যেতে পারে।’
‘ব্রেইন স্টেমে’ আঘাতের কারণে রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন উঠানামা করছে জানিয়ে বার্তায় বলা হয়, ‘রক্তচাপের জন্য সাপোর্ট যেভাবে দেয়া আছে, সেটা সেভাবেই চলবে। যদি হৃদস্পন্দন কমে যায়, তাহলে সাময়িকভাবে পেস মেকার লাগানোর একটি দল প্রস্তুত আছে, সেটা লাগানো হবে।’ হাদির ফুসফুসে আঘাত আছে ও ‘চেস্ট ড্রেইন টিউবে’ অল্প রক্ত আসছে বলেও মেডিকেল বোর্ডের বার্তায় বলা হয়।
‘ফুসফুসে সংক্রমণ’ ও ‘এআরডিএস’ যেন ডেভেলপ না করে, সেদিকে খেয়াল রেখে ভেন্টিলেটর সাপোর্ট চালিয়ে যাওয়ার কথাও বলা হয়েছে। বার্তায় বলা হয়, ‘তার কিডনির কার্যক্ষমতা ফেরত এসেছে, সেটাকে ধরে রাখার জন্য ‘ফ্লুইড ব্যালেন্স’ যেভাবে ঠিক রাখা হচ্ছে, সেভাবেই চালিয়ে যেতে হবে।’ হাদির শরীরে রক্ত জমাট বাধা ও রক্ত ক্ষরণ হওয়ার মধ্যে যে ‘অসামঞ্জস্যতা’ দেখা দিয়েছিল (ডিআইসি) সেটা অনেকটাই ঠিক হয়ে আসছে জানিয়ে বোর্ড বলছে, ‘এটাকে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করে রক্ত ও রক্তের বিভিন্ন উপাদান ট্রানফিউস করতে হবে।’
এর বাইরে তার চিকিৎসা শুরু করা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট সবাইকে ‘হিরোইক’ কাজ করেছেন জানিয়ে তাদেরকে ধন্যবাদ দিয়েছে এই বোর্ড। গতকাল শুক্রবার দুপুরে ঢাকার বিজয়নগর পানির ট্যাংকির সামনে ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়। চলন্ত অটোরিকশায় থাকা হাদিকে গুলি করেন চলন্ত মোরসাইকেলের পেছনে বসে থাকা আততায়ী। গুলিটি লাগে তার মাথায়। হাদিকে প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে এক দফা অস্ত্রোপচারের পর তাকে নেয়া হয় এভারকেয়ার হাসপাতালে। ঢাকা মেডিকেলে অস্ত্রোপচার করা চিকিৎসকদলের ধারণা, গুলিটি হাদির মাথা ফুঁড়ে বেরিয়ে গেছে।
সন্দেহভাজন একজনকে শনাক্তের দাবি পুলিশের
হাদিকে গুলি করার ঘটনায় সন্দেহভাজন একজনকে শনাক্তের দাবি করেছে পুলিশ। ঘটনার সিসিটিভি ক্যামেরা ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ওই ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। তার ব্যাপারে তথ্য দিতে সবাইকে অনুরোধ জানিয়েছে ডিএমপি। শনিবার,(১৩ ডিসেম্বর ২০২৫) ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ খবর জানিয়েছে। ওসমান হাদির ওপর হামলাকারীদের খুঁজতে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে বলে ওই বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। শনাক্ত ব্যক্তির সম্পর্কে কোনো তথ্য থাকলে পুলিশকে জানাতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। যোগাযোগের জন্য তিনটি মুঠোফোন নম্বর জানিয়েছে পুলিশ। এগুলো হলো- ০১৩২০০৪০০৮০ (মতিঝিলের উপ-কমিশনার), ০১৩২০০৪০১৩২ (পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) ও ৯৯৯ নম্বর। তথ্যদাতার পরিচয় গোপন থাকবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
হামলাকারীকে ধরিয়ে দিতে ৫০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা
হাদির হামলাকারীকে ধরিয়ে দিতে ৫০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি আরও বলেছেন, জুলাই সম্মুখসারির যোদ্ধাদের বিশেষ নিরাপত্তায় একটি কমিটি গঠন করেছে সরকার। শনিবার সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির জরুরি বৈঠক শেষে তিনি এ কথা বলেন। জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সার্বিক নিরাপত্তা প্রস্তুতি, জুলাই যোদ্ধা ওসমান হাদিসহ জুলাইয়ের সম্মুখসারির যোদ্ধাদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ এবং লুট হওয়া অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনা করা হয়েছে।
‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সম্মুখসারির যোদ্ধা ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছে। এই বিষয়টিকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। অনতিবিলম্বে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘আশা করছি অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে আমরা দুষ্কৃতকারীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে পারবো। এই হামলায় জড়িত কাউকে কোনো প্রকার ছাড় দেয়া হবে না। এই বিষয়ে আমরা জনগণের সার্বিক সহযোগিতা পাবো বলে দৃঢ় বিশ্বাস করি।’
তিনি বলেন, ‘ওসমান হাদির ওপর আক্রমণের ঘটনা আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার অপপ্রয়াস বলে আমরা মনে করি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত বা বানচাল করার যে কোনো ধরনের অপচেষ্টা অন্তর্বর্তী সরকার কঠোর হস্তে দমন করবে। ‘বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারির যোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বদ্ধপরিকর। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।’ ওসমান হাদির সন্দেহভাজনকে ধরার বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘আসামি ধরার প্রক্রিয়াটা চলমান আছে। আমরা আশা করি, আপনাদের সহযোগিতায় খুব তাড়াতাড়ি হয়তো তাকে ধরতে পারবো।’ তিনি বলেন, ‘জুলাই যোদ্ধাদের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য আমার একটা ছোট্ট কমিটি করে দিয়েছি। ওই কমিটি অ্যাসেস করে তারা ব্যবস্থা নেবে।’
গুলির ঘটনায় সীমান্তে বিজিবির কড়া নজরদারি ও তল্লাশি
হাদিকে হত্যাচেষ্টায় জড়িত ব্যক্তিরা যাতে দেশত্যাগ করতে না পারে সেজন্য যশোরের বেনাপোল সীমান্তে নিরাপত্তা ও তল্লাশির কাজ জোরদার করেছে বিজিবি। যশোর-৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়ন জানায়, সীমান্তের মেইন পিলার ১৮/১ এস থেকে ৪৭/৩ এস পর্যন্ত প্রায় ৭০.২৭৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কড়া তল্লাশি চলমান রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে, রয়েছে অতিরিক্ত বিজিবি। সীমান্তের যে স্থানে কাঁটাতারের বেড়া নেই, সে স্থান সিলগালা করা হয়েছে।
যশোর-৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল্লাহ সিদ্দিকী বলেন, ‘ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত আসামিরা যাতে কোনোভাবেই সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে পালাতে না পাওে, সেজন্য বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সীমান্তের প্রতিটি পয়েন্টে তল্লাশি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। বেনাপোল আইসিপি, আমড়াখালি, সাদীপুর, রঘুনাথপুর, ঘিবা, শিকারপুর, শালকোনা, কাশিপুর, মাসিলা, আন্দুলিয়া এবং পাঁচপিসতলা এলাকাসহ সীমান্ত সংলগ্ন বিভিন্ন স্থানে বিজিবির নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সকাল থেকেই এসব এলাকায় যানবাহন ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তল্লাশি করা হচ্ছে।
যশোর-৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের সহকারী পরিচালক সোহেল আল মুজাহিদ বলেন, ‘সীমান্তে যে কোনো অনুপ্রবেশ বা অপরাধমূলক তৎপরতা রোধে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে বিজিবি। সীমান্তে অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে সেক্ষেত্রে সব স্থানে সিলগালা করে দেয়া হয়েছে, সঙ্গে অতিরিক্ত বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই নজরদারি ও তল্লাশি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মতিঝিল, শাহজাহানপুর, পল্টন, রমনা ও শাহবাগ থানা এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছিলেন হাদি। সেজন্য প্রতি শুক্রবার তিনি জনসংযোগ করতেন। গতকাল শুক্রবার দুপুরে মতিঝিলের একটি মসজিদে প্রচার শেষে সতীর্থদের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজের জন্য ব্যাটারি রিকশায় করে সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে যাচ্ছিলেন তিনি। যাওয়ার পথে বক্স কালভার্ট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন তিনি। চলন্ত রিকশায় থাকা অবস্থাতেই মোটরসাইকেলের পেছনে বসা আততায়ী তাকে লক্ষ্য করে একটি গুলি ছোড়ে, যেটি তার মাথায় লাগে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর হাদিকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে মস্তিষ্কে একটি অস্ত্রোপচার শেষে খুলি খুলে রেখে তাকে পাঠানো হয় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় অবস্থিত এভারকেয়ার হাসপাতালে। বর্তমানে সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) তার চিকিৎসা চলছে। হাদির জীবন সংকটাপন্ন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।



