দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাকে ‘গণতন্ত্র ও জুলাই অভ্যুত্থানের ওপর সরাসরি আঘাত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিক নেতারা। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ভিন্নমত দমনে মধ্যযুগীয় কায়দায় সংবাদমাধ্যম পুড়িয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি রাষ্ট্রকে ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্ট এসব ব্যক্তিরা মব ভায়োলেন্সর অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহবান জানিয়েছেন।
সোমবার (২২ ডিসেম্বর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সম্পাদক পরিষদ ও নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) আয়োজিত ‘মব ভায়োলেন্সে আক্রান্ত বাংলাদেশ’ শীর্ষক যৌথ প্রতিবাদ সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন নোয়াব সভাপতি এ কে আজাদ এবং সঞ্চালনা করেন বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ।
প্রতিবাদ সভায় সংহতি প্রকাশ করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ওপর হামলা কেবল দুটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নয়, বরং এটি স্বাধীন চিন্তা ও গণতন্ত্রের ওপর আঘাত। আবেগময় কণ্ঠে ৭৮ বছর বয়সী এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ বলেন, ‘সারা জীবন সংগ্রাম করেছি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ দেখব বলে। কিন্তু আজকে যে বাংলাদেশ দেখছি, এই বাংলাদেশের স্বপ্ন কখনোই দেখিনি।’
বিএনপির এই শীর্ষ নেতা আরও বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান হয়েছিল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, আজ সেই জায়গাতেই আঘাত এসেছে। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেবল সচেতনতা নয়, বরং সব গণতন্ত্রকামী মানুষকে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে ঐক্যবদ্ধভাবে ‘রুখে দাঁড়ানোর’ আহ্বান জানান তিনি।
হামলার ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবির বলেন, গণমাধ্যমের সম্পাদকীয় নীতি পছন্দ না হলে আগুন লাগিয়ে দেওয়া কোনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হতে পারে না। তিনি অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা কেবল ভয় দেখাতে চায়নি, তারা ভবনের ভেতর থাকা সাংবাদিকদের ‘মধ্যযুগীয় কায়দায়’ পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিল।
সভায় এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার ও প্রশাসনের একটি অংশের সমর্থন এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া মব ভায়োলেন্সের ঘটনা ঘটানো সম্ভব হতো না। তিনি উল্লেখ করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্লোগান ও শহীদদের নাম ব্যবহার করে এই হামলাগুলো ‘পরিকল্পিত অপরাধ’ হিসেবে সংগঠিত করা হয়েছে।
অপর এক বক্তা বলেন, সরকারের নিষ্ক্রিয়তার কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর সহ-সম্পাদক জুবায়ের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম বলেন, তাদের ও প্রথম আলোর সাংবাদিকদের ঘরে ঘরে গিয়ে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। হামলার দিন ২৬-২৭ জন কর্মী ভবনের ভেতরে আটকা ছিলেন এবং ফায়ার সার্ভিসকে আগুন নেভাতে বাধা দেওয়া হয়েছিল, যা হত্যার উদ্দেশ্যেরই ইঙ্গিত দেয়।
নোয়াব সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, মাহফুজ আনাম সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করে নিরাপত্তা চাইলেও কেউ সাড়া দেননি। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সেদিন যদি আর ১৫ মিনিট আগুন জ্বলতো, তবে ধোঁয়ায় শ্বাস বন্ধ হয়ে সাংবাদিকরা মারা যেতেন।’
সভায় এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার ও প্রশাসনের একটি অংশের সমর্থন এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া মব ভায়োলেন্সের ঘটনা ঘটানো সম্ভব হতো না। তিনি উল্লেখ করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্লোগান ও শহীদদের নাম ব্যবহার করে এই হামলাগুলো ‘পরিকল্পিত অপরাধ’ হিসেবে সংগঠিত করা হয়েছে।
গীতি আরা সাফিয়া চৌধুরী বলেন, সরকারের নিষ্ক্রিয়তার কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর সহ-সম্পাদক জুবায়ের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
নোয়াব সভাপতি এ কে আজাদ ঘোষণা দেন, সংবাদপত্রের ওপর হামলার প্রতিবাদে আগামী জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে সারা দেশের সাংবাদিকদের নিয়ে একটি ‘মহাসম্মেলন’ করা হবে। সেখান থেকেই পরবর্তী কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমাদের কণ্ঠকে স্তব্ধ করা যাবে না। বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।’
প্রতিবাদ সভায় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সারা হোসেন, আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও সাংবাদিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা সভা শেষে সোনারগাঁও হোটেলের সামনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে একটি মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বক্তারা মব ভায়োলেন্সের অপশক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের শপথ নেন।









