রবিবার, জানুয়ারি ১১, ২০২৬
হোমখবররাজনীতিআ’লীগ-জাপা-বাম, সবাইকে বাইরে রেখে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে না: ইসির সংলাপে কাদের সিদ্দিকী

আ’লীগ-জাপা-বাম, সবাইকে বাইরে রেখে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে না: ইসির সংলাপে কাদের সিদ্দিকী

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

সম্পর্কিত সংবাদ

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ ও শক্ত ভূমিকা নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। তারা বলেছেন, মানুষ যাতে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে এবং গণভোট যাতে ‘হাস্যকর’ কিছু না হয় সেদিকেও ইসিকে সজাগ থাকতে হবে। কোনোভাবে অনিয়ম ও অদৃশ্য শক্তির কাছে নতজানু হওয়া যাবে না। বড় দলগুলোকে বাইরে রেখে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও মন্তব্য করেছেন এক নেতা।

গণভোট যেন হাস্যকর না হয়: গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুব্রত চৌধুরী

ইসি কারও হয়ে কাজ ‘করবে না’, বললেন সিইসি এএমএম নাসির উদ্দীন

ইসলামী ঐক্যজোটের একাংশকে সংলাপ থেকে বহিষ্কার

রোববার,(১৬ নভেম্বর ২০২৫) ঢাকার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে দ্বিতীয় দিনের সংলাপে দুই ধাপে ১২টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আলোচনায় সিইসি ও নির্বাচন কমিশনাররা বলেন, আইন-বিধি প্রয়োগে কঠোর থাকবেন তারা। এক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন জানিয়ে ইসিও বলেছেন, কোনো চাপের কাছে কমিশন ‘নতজানু হবে না’।

সংলাপে অংশ নিয়ে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী বলেন, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, বামদল- সবাইকে বাইরে রেখে নির্বাচন করলে, ওই নির্বাচন কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে না।

নির্বাচনের দিনে গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গণভোটে যদি ৫ শতাংশ ভোটও না পড়ে। যদি বিএনপি না বলে, তাহলে ৩০ শতাংশ ভোটার গণভোট নিয়ে ভাবতেও যাবে না। আওয়ামী লীগকে যদি নির্বাচন করতে না দেন, আওয়ামী লীগের ৪৩-৪৪ শতাংশ সমর্থক, আবার শুনতেছি আপনারা জাতীয় পার্টিকেও ব্যান করতে হবে। ১৪ দলকেও ব্যান করবেন।’

কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘জনাব ইউনূস সাহেবের সরকার আমাদের খরচের খাতায়ই ফেলে রেখেছে। এ পর্যন্ত ডাকে নাই যে আমরা একটা নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল। আওয়ামী লীগের নিবন্ধনও আমাদের পরে। আমার নিবন্ধন কিন্তু ৪ নম্বরে। আপনারা (ইসি) দয়া করে ডাকছেন, আমি কিন্তু খুশি হয়েছি।’ইসির উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘প্রবীণ নাগরিক হিসেবে এবং একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি আপনাদের পরামর্শ দিয়ে যেতে চাচ্ছি, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারদের বাইরে রেখে আপনারা ইলেকশন করতে গেলে সে ইলেকশন আপনারা ভালোভাবে করতে পারবেন না। ভোটার যাতে অংশগ্রহণ করতে পারে, সেজন্য আপনাদের আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছে। আজকে (রোববার) আপনি বললে, আওয়ামী লীগ ব্যান করলেই আওয়ামী লীগ ব্যান হবে…ওনারা যথার্থই বলেছেন, আওয়ামী লীগ ইলকশন বন্ধ রাখার, বন্ধ করার চেষ্টা করবে। অবশ্যই করবে। কেউ বোকার মতো করবে, কেউ বুদ্ধিমানের মতো করবে। আপনি (ইসি) জাতীয় পার্টিকে ইলেকশন করতে দেবেন না, তাদেরও ১৩-১৪, ১৫ পার্সেন্ট ভোট আছে। আপনি বামদল যারা সব সময় আছে আন্দোলনে, জনগণের পক্ষে, তাদের পক্ষে লোক থাকুক আর না থাকুক। তারা জনগণের পক্ষে আছে। তাদেরও ভোট করতে দেবেন না। আমি আপনাকে (ইসি) বলছি না। বলছি (অন্তর্বর্তী) সরকারকে।’

কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘যে অধ্যাপক ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংকের পাত্তা থাকতো না, সে অধ্যাপক ইউনূস আমাদের দলীয়ভাবে হিসাবের খাতায়ও ধরেন নাই। এভাবে হিসাবের খাতায় না ধরে সবাইকে যদি বাইরে রাখা হয় তাহলে কোনোমতেই একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে না। বাংলাদেশে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলে বাংলাদেশ শান্তির দেশ হবে। আমার বিশ্বার এটা সুইজারল্যানেন্ডের চেয়েও একটা শান্তিময় দেশ হতে পারে।’

*সংলাপে যে দলগুলো*

এদিনও দুই পর্বে সংলাপ হয় ঢাকার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে। সকাল ১০টা-১২টা পর্যন্ত গণফোরাম, গণফ্রন্ট, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি-বিএসপি ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির আলোচনা করে ইসি।

দ্বিতীয় পর্বে দুপুর ২টা থেকে আরও ছয়টি দলের সঙ্গে সংলাপে বসে কমিশন। এ ছয়টি দল হলো- বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-বাংলাদেশ জাসদ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ, তৃণমূল বিএনপি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সঙ্গে মতবিনিময় করবে।

*হাস্যকর যেন না হয়*

গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘৫৪ বছরের ইতিহাস ঘেঁটে লাভ নেই। তবে দুয়েকটা নির্বাচন হয়তো ভালো হয়েছে। আপনাদের মেয়াদে সংসদ হোক, স্থানীয় নির্বাচনে নিরপেক্ষতা যেন ধরে রাখেন। সেটা যেন জনগণের কাছে দৃশ্যমান হয়। এখনও আপনাদের প্রতি আশ্বস্ত আছি।…ফেব্রুয়ারিতে একটা নির্বাচন হবে, গণভোটও হবে।’

গণভোটের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘বিদ্যমান প্যাকেজে হ্যাঁ, না ভোট হলে এটা অকার্যকর হয়ে যাবে। দুটোতে হ্যাঁ, দুটোতে না এর সুযোগ নেই। সবটার মধ্যে হ্যাঁ অথবা না তে নিয়ে যাচ্ছে। দল, সরকার ও ইসির ভূমিকা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত গণভোট যেন হাস্যকরে পরিণত না হয় আপনাদের হাত দিয়ে। এ ব্যাপারে আপনাদের শক্ত থাকতে হবে।’

সুব্রত চৌধুরী সংলাপে বলেন, ‘বিগত সরকারের সময়ে জনগণের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছিল। এবার সেটা হলে দেশের মানুষ মেনে নেবে না। গণভোট যেন শেষ পর্যন্ত হাস্যকর কিছুতে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে ইসিসহ সংশ্লিষ্টদের লক্ষ্য রাখতে হবে।’

*নেতারা যা বললেন*

বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এ এন এম সিরাজুল ইসলাম বলেন, আগামী নির্বাচন ভালো করার জন্য ইসির আন্তরিকতা রয়েছে। নির্বাচনকে সুষ্ঠু করতে বিভাগওয়ারি ভোট নেয়া, জামানত কমানো, ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা রাখার সুপারিশ করেন তিনি।

জোট করলেও স্ব-স্ব দলের প্রতীকে ভোট করার বিধান চালু করায় মহাসচিব জাফর আহমেদ জয় ইসিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘শঙ্কিত যে, জারি করা বিধিমালা রাখতে পারবেন কিনা। আশা করি, অতীতের শিক্ষা থেকে কারও কাছে নতজানু হবেন না। শপথ নিয়েছেন। আপনাদের ঘাড়ে জাতির দায়িত্ব, কারও চাপে দায়িত্ব পালন যদি না করতে পারেন তাহলে উত্তম পথ আছে, সে পথ নেবেন। কিন্তু নতজানু হবেন না।’

ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান সৈয়দ বাহাদুর শাহ মোজাদ্দেদী ৯টি প্রস্তাবনা তুলে ধরে বলেন, ‘গত ১৫ বছরে যে তিনটি নির্বাচন হয়, সবটিই বিতর্কিত। ভোট নিয়ে আস্থা সংকট তৈরি হয়। গোটা নির্বাচন ব্যবস্থা সংকটাপন্ন।’ লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত, সারাদেশে একইদিনে নির্বাচন না করে চার ধাপে আয়োজন করার দাবি রাখেন তিনি।

বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির প্রতিনিধি সংলাপে অংশ নিয়ে কালো টাকা রোধে ইসির দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান।

আমন্ত্রণ বিভ্রাট, একাংশকে বের করে দেয়া

শুরুতে ইসির সংলাপে ইসলামী ঐক্যজোটের দুই পক্ষ হাজির হয়। রোববার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সংলাপ শুরু হয়। এতে ইসলামী ঐক্যজোটের দুই পক্ষের প্রতিনিধি আসায় কিছুটা হট্টগোল হয়। এ সময় সংলাপে অংশ নিতে আসা যাদের কাছে চিঠি নেই, তাদের সম্মেলন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বলেন ইসি সচিব।

সম্মেলন কক্ষ থেকে বের হওয়া অংশ থেকে মইনুদ্দিন রুহি সাংবাদিকদের বলেন, তাদের চিঠি ‘ব্ল্যাকমেইল করে’ আরেক অংশ সংলাপে অংশ নিয়েছেন। ইসলামী ঐক্যজোটের এক পক্ষ সম্মেলন কক্ষ ত্যাগ করলে ইসি সচিব বলেন, ‘আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত অসামঞ্জস্যতা দিয়ে শুরু করার জন্য।’

পরে ইসলামী ঐক্যজোটের একাংশের মহাসচিব মুফতি সাখাওয়াত হোসেন রাজী সংলাপে তার বক্তব্যে বলেন, ‘৫ আগস্টের আগে এই ফ্যাসিবাদের দোসররা কেন্দ্রীয় কার্যালয় দখল করে নিযে স্বার্থ হাসিল করেছে। ৫ আগস্টের পর থেকে তারা আত্মগোপনে ছিল। এরপর দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের নিয়ে দল নতুন করে পুনর্গঠন করা হয়েছে। আমরা সংবিধান সংস্কার থেকে ঐকমত্যে কমিশন সব বৈঠকে আমাদের প্রতিনিধি ছিল, ইসিতেও আমরাই নিয়মিত যোগাযোগ করছি । জুলাই সনদে আমি স্বাক্ষর করেছি।’

ইসি বিবদমান বিষয়টি সমাধান করে কমিটির তথ্য হালনাগাদ করবে বলে আশা রাখেন তিনি।

ইসির ৩ বার্তা

নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ‘যারা পেশি শক্তি দেখাবে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেÑ এটাই ইসির বার্তা। এ ব্যাপারে কোনো ব্যত্যয় হবে না। অপপ্রচার ছাড়ালে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কর্মকর্তারা পক্ষাপাতদুষ্ট হলে সে বা তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ তিনটি বার্তা ইসির।’

ইসির এখতিয়ারের মধ্যে আইনি সংস্কার করার পাশাপাশি বাস্তবায়নের জন্য কাজ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দীনের সভাপতিত্বে সংলাপে অন্য কমিশনাররাসহ উপস্থিত ছিলেন ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সংলাপে প্রতিটি দলের প্রতিনিধিরা আলাদা আলাদা করে নিজেদের মতামত জানান। ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি সাখাওয়াত হোসেন রাজি বলেন, ‘৫ আগস্টের আগে ফ্যাসিস্ট শক্তির সহায়তায় একটি চক্র আমাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয় দখল করেছিল। অথচ আজ তারা এখানে এসে আমাদের আসন দখল করেছে। যারা তিনটি নির্বাচনে ভোটাধিকার হরণ করেছে, তারা কীভাবে ভোট চাইবে তা বোধগম্য।’

ইসি কারও হয়ে কাজ ‘করবে না’: সিইসি

সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের জন্য জাতি ও জনগণের কাছে নির্বাচন কমিশন ‘প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’ বলে জানান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন। কমিশন কারও পক্ষে কাজ না করে, বিবেক, দেশের প্রচলিত আইন, বিধি ও বিধান অনুযায়ী নির্বাচন আয়োজন করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

রোববার দুপুরে সংলাপের শুরুতে শুভেচ্ছা বক্তব্যে সিইসি বলেন, ‘অনেকে মনে করেন আমরা তার পক্ষে কাজ করলে আমরা নিরপেক্ষ। কিন্তু আমরা কারও পক্ষে কাজ করতে পারবো না। আমাদের বিবেক দেশের প্রচলিত আইন বিধি বিধান যা বলে সেটা মনেই আমরা চলবো, ইনশাল্লাহ।’

তিনি এ উদ্দেশ্য সাধনে সব রাজনৈতিক নেতাদের সহযোগিতা কামনা করেন।

সম্প্রতি

আরও খবর