শনিবার, জানুয়ারি ১০, ২০২৬
হোমমতামতসম্পাদকীয়আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়: সব প্রশ্নের কি মীমাংসা হলো?

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়: সব প্রশ্নের কি মীমাংসা হলো?

সম্পর্কিত সংবাদ

পাঠ্যবই সংকটের পুরোনো রোগ

সেতু আছে, সংযোগ সড়ক নেই

শীতে বিপর্যস্ত জনপদ

জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমনে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। ‘১ হাজার ৪০০ জনকে’ হত্যার ‘উসকানি, নির্দেশ, সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি ও ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ’সহ পাঁচ অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে বিচার হয়। প্রথম অভিযোগে উসকানিমূলক বক্তব্যের জন্য শেখ হাসিনাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং বাকি অভিযোগগুলোতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

চাঁনখারপুল ও আশুলিয়ার দুটি হত্যাকাণ্ডে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল ও সে সময়ের পুলিশ প্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনও দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। রাজসাক্ষী হওয়ায় মামুনকে পাঁচ বছরের দণ্ড ও কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

জুলাই অভ্যূত্থানে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এর ন্যায়বিচার হওয়া জরুরি। তবে প্রশ্ন হলো, এই রায় কি সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছে? বিচারপ্রক্রিয়া কি তর্কাতীত?

রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকা ঘটনার বিচার বাংলাদেশে প্রায়ই বিতর্ক সৃষ্টি করে। ইতিহাসেও দেখা যায়, এক রাজনৈতিক আমলের দেওয়া রায় অনেক সময় ক্ষমতার পালাবদলের পর বদলে গেছে। সাম্প্রতিক কালেও এরকম বেশ কয়েকটি রায় পুরো উল্টে যেতে দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিয়েছিলো। পাঁচই আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আপিল বিভাগের রিভিউতে রায় বাতিল হয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর এর আগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে জামায়াত নেতাদের আইনজীবী ছিলেন। তিনি একটি রাজনৈতিক দলের যুগ্ম আহ্বায়কও ছিলেন। এটা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে যে, এবার শেখ হাসিনার বিচারে কি তাড়াহুড়ো করা হয়েছে? অভিযুক্তদের অনুপস্থিতিতে বিচার হলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পুরোপুরি মানা সম্ভব কি না- এটিও বড় প্রশ্ন। যদিও দেশের আইনে এতে কোনো বাঁধা নেই। পলাতক অভিযুক্ত আইনজীবি নিয়োগ করতে পারেন না। যদিও রাষ্ট্রের পক্ষে সরকার বা ট্রাইব্যুনাল তার জন্য আইনজীবি নিয়োগ দেয়। তবে তারা আইনের সব সুযোগ-সুবিধা পান না। তার পক্ষে সাক্ষী বা দলিল-দস্তাবেজ হাজির করতে পারেন না।

অন্তর্বর্তী সরকার বারবার বলেছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখা হবে। কিন্তু বাস্তবে কতটা তা মানা হয়েছে?

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক আগেই বলেছিলেন, “বাংলাদেশের আইনি কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে এবং সেটিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করাই বড় চ্যালেঞ্জ।” জাতিসংঘ বলেছিল, বিচার প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ না হলে জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধান দলের সংগ্রহ করা তথ্য-উপাত্ত বাংলাদেশের কাছে দেওয়া সম্ভব হবে না। মৃত্যুদণ্ড সংক্রান্ত নীতিগত অবস্থানের কারণে জাতিসংঘ এমন বিচারপ্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতে পারে না- এ কথাও পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা বিচারে স্বচ্ছতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড রক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো বিচার শেষ হওয়ার সময়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনায় এক বছরের মধ্যে বিচার সম্পন্ন হয়েছে। ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে দীর্ঘ সময় লেগেছিল। এত দ্রুত শেখ হাসিনার বিচার হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, প্রক্রিয়াটি কি যথেষ্ট পরিপূর্ণ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ ছিল?

রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর মামলার রায় খুব কমই সর্বজনগ্রাহ্য হয়। এই রায়ও কি একদিন ‘বিজয়ীদের বিচার’ বা ‘প্রতিহিংসার বিচার’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হবে?

আরেকটি প্রশ্ন হচ্ছে, এই রায় কীভাবে কার্যকর হবে? অভিযুক্ত শেখ হাসিনা এখন ভারতে। ভারত কি তাকে ফেরত দেবে? যদি না দেয়, তাহলে এই রায় কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে কি? নিহতদের পরিবারের কাছে এটিকে তাহলে কতটা ন্যায়বিচার বলা যাবে?

এর আগে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং কানাডা বাংলাদেশের বিচার প্রক্রিয়ায় দোষী সাব্যস্ত এবং সাজা পাওয়া ব্যক্তিদের এদেশের কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেয়নি।

জুলাই আন্দোলনে নিহতদের স্বজনেরা ন্যায়বিচার দাবি করেন। কিন্তু সেই ন্যায়বিচার যদি প্রক্রিয়াগত ত্রুটি, রাজনৈতিক প্রভাব ও দীর্ঘস্থায়ী বিতর্কের মধ্যে দিয়ে আসে, তাহলে তা দেশের জন্য ভবিষ্যতে জটিলতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এই রায় সেই পরীক্ষায় কতটা উত্তীর্ণ হলো সময়ই তা বলে দেবে। তবু সবচেয়ে নিরাপদ পন্থা বা ভাল বিকল্প হতো আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) শরণাপন্ন হওয়া। এতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় থাকত এবং রায় নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগও কম হতো।

আমরা আশা করবো শেষ পর্যন্ত ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা পাবে এবং দোষীর সাজা পাবেন।

সম্প্রতি

আরও খবর