নদীকেন্দ্রিক পর্যটনের প্রধান শর্ত হলো স্বচ্ছ জল এবং নির্মল বাতাস। কিন্তু আমাদের বাস্তব চিত্র ঠিক তার উল্টো। ঢাকার চারপাশের নদীগুলো-বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু আজ কার্যত নর্দমায় পরিণত হয়েছে।
একজন পর্যটক যখন নৌকায় চড়বেন, তিনি নিশ্চয়ই বাতাসের বদলে আবর্জনা পচা গন্ধ নিতে চাইবেন না। বুড়িগঙ্গার কালো পানি এবং উৎকট গন্ধ পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করার জন্য যথেষ্ট। তার ওপর নদীর পাড় এবং তলদেশ পলিথিন ও প্লাস্টিকে সয়লাব। এই দৃশ্য কোনোভাবেই পর্যটকবান্ধব নয়।
বিদেশে ‘রিভার ক্রুজ’ বলতে যা বোঝায়, আমাদের দেশে তা হাতেগোনা কয়েকটি বিলাসবহুল জাহাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সাধারণ বা মধ্যবিত্ত পর্যটকদের জন্য আমাদের দেশে নৌপথ মানেই যেন দুর্ঘটনার আতঙ্ক। ফিটনেসবিহীন লঞ্চ, ট্রলারের বেপরোয়া গতি এবং পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেটের অভাব পর্যটকদের মনে ভীতি সঞ্চার করে। তাছাড়া নদীভ্রমণে নামার জন্য যে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন ঘাট বা জেটি প্রয়োজন, তা নেই বললেই চলে। কাদা মাড়িয়ে, নড়বড়ে তক্তা পার হয়ে নৌকায় ওঠার অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়।
নদীকেন্দ্রিক পর্যটনের জন্য সারা বছর নদীতে পানি থাকা জরুরি। কিন্তু অপরিকল্পিত বাঁধ, উজান থেকে পানি প্রবাহ কমে যাওয়া এবং দেশের ভেতর নদী দখলের মহোৎসবে অনেক নদীই আজ মৃত।
শীতকালে অনেক প্রধান নদী শুকিয়ে সরু খালে পরিণত হয়, ফলে বড় কোনো পর্যটকবাহী জাহাজ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।
নদীর দুই পাশ দখল করে গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা, যা নদীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে পুরোপুরি গিলে খেয়েছে। পর্যটকরা নদীর বুকে ভেসে কংক্রিটের বস্তি দেখতে আসেন না, তারা দেখতে চান সবুজ প্রকৃতি।
শুধু নৌকায় বসে নদী দেখাই পর্যটন নয়। আধুনিক পর্যটনে এর সাথে যুক্ত থাকে নানা ‘অ্যাক্টিভিটি’ বা কার্যক্রম। আমাদের দেশে নদীতে কায়াকিং, ওয়াটার স্কিং, ফ্লোটিং মার্কেট বা ভাসমান রেস্তোরাঁর সংস্কৃতি এখনো সেভাবে গড়ে ওঠেনি (কিছু বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ ছাড়া)। নদীর পাড়ে বসে সময় কাটানোর জন্য নেই কোনো সুপরিকল্পিত প্রমোদ উদ্যান বা ‘রিভার ফ্রন্ট ওয়াকওয়ে’, যা আছে, তা-ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জরাজীর্ণ।
সুন্দরবনের ভেতরে লঞ্চ ভ্রমণ বা বরিশালের পেয়ারা বাগান-এগুলো বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্র হতে পারতো। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিম-লে বা এমনকি দেশের মানুষের কাছেও এর সঠিক ব্র?্যান্ডিং করা হয়নি। বিদেশের পর্যটকরা জানেনই না যে বাংলাদেশে এত বিশাল জলরাশি এবং বৈচিত্র?্যময় নৌপথ রয়েছে।
নদীকেন্দ্রিক পর্যটনকে বাঁচাতে হলে আমাদের নদীকে বাঁচাতে হবে সবার আগে। এর জন্য সবার আগে প্রয়োজন শিল্পবর্জ্য নদীতে ফেলা বন্ধ করা এবং নদীর পানি শোধন করে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা। বিচ্ছিন্নভাবে দু-একটি বোট না নামিয়ে, পুরো এলাকাভিত্তিক (যেমন- চাঁদপুর মোহনা, কাপ্তাই লেক বা হাওর অঞ্চল) সমন্বিত পর্যটন পরিকল্পনা নিতে হবে। এইক্ষেত্রে কেবল সরকারি উদ্যোগে হবে না, বেসরকারি উদ্যোক্তাদের আধুনিক ক্রুজ শিপ, হাউসবোট এবং ওয়াটার স্পোর্টস চালু করতে উৎসাহিত করতে হবে।
আমাদের নদীগুলো আমাদের অর্থনীতির ‘ব্লু গোল্ড’ বা নীল সোনা হতে পারতো। কিন্তু অবহেলায় আমরা তা হারাতে বসেছি। নদীকেন্দ্রিক পর্যটন কেবল বিনোদন নয়, এটি নদীকে বাঁচিয়ে রাখার একটি হাতিয়ারও। কারণ, যখন নদী থেকে আয় আসবে, তখন নদীকে পরিষ্কার রাখার গরজও তৈরি হবে। তাই আর দেরি না করে, নদী ও পর্যটনকে একসূত্রে গেঁথে আমাদের এখনই কাজ শুরু করতে হবে। নতুবা ‘নদীমাতৃক বাংলাদেশ’ কথাটি কেবল বইয়ের পাতাতেই শোভা পাবে।
হেনা শিকদার



