আমার অনেক কথা লেখার ছিল ২১ ফেব্রুয়ারিতে, কারণ ফেব্রুয়ারি মাস অন্যান্য মাসের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। এ মাসের প্রথমদিকে আমার জন্মদিন এবং শেষের দিকে আমার সহধর্মিণীর জন্মদিন, তারপর ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, সর্বোপরি উর্দু ভাষাকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার বিপক্ষে শহীদের রক্তে রুখে দাঁড়ানো এবং প্রতিবাদ মুখরের মাস। সব মিলে হৃদয়ে তৈরি হয় প্রতি বছরই ভালোবাসার ঢেউ। এবারো হয়েছিল কিন্তু লেখার মাধ্যমে সঠিকভাবে মাসটিকে উপস্থাপন করতে পারিনি। পুরো দেশের গণমাধ্যম ছিল সুগার ড্যাডি এবং বইমেলার রং-তামাশা নিয়ে ব্যস্ত, তাই একটু বিলম্ব হয়ে গেল আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ২১ ফেব্রুয়ারি নিয়ে কিছু লিখতে। তবে হৃদয়ে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি!
রাষ্ট্রভাষা ও দাপ্তরিক ভাষায় পার্থক্য কী? আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলা, কিন্তু দাপ্তরিক ভাষা কোনটি? আমি থাকি সুইডেনে, এখানে সবকিছু সুইডিশ ভাষায় চলে অথচ বাংলাদেশে কেন সেটা সম্ভব না? নাকি আমরা যেমন আছি তেমন থাকতে চাই! আমরা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছি কিন্তু কোন ভাষা? মাতৃভাষা, বাংলা ভাষা, রাষ্ট্র ভাষা নাকি মিশ্র প্রতিক্রিয়ার ভাষা? আমি অতীতে লিখেছি, যেমন ২১ ফেব্রুয়ারি, শহীদ মিনার, পুষ্পার্পণের সবই কিন্তু বিদেশি শব্দ (ইংরেজি, আরবি, ফরাসি, সংস্কৃত)। এই শব্দগুলোকে বাংলা ভাষায় মেনে নিয়েছি আমরা সবাই, এমনকি যে প্রতিষ্ঠান বাংলা ভাষার দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকেন (বাংলা একাডেমি) সেই বাংলা একাডেমির ‘একাডেমি’ আবার ইংরেজি শব্দ। এরকম হাজারও বিদেশি শব্দের সমন্বয়ে বাংলা ভাষা। যার ফলে আমরা সবাই কমবেশি বাংলার সঙ্গে অন্য ভাষা মিশিয়ে কথা বলি এবং লিখি। দেশ স্বাধীনের আগে যতটা বাংলার ব্যবহার করেছি, দেশ স্বাধীনের পরে কিছুটা কমেছে এবং যুক্ত হয়েছে বেশি বেশি আরবি এবং ফরাসি শব্দ। কারণ প্রায় ৭০ লাখ মানুষ আরব দেশে কর্মরত। সেক্ষেত্রে ইদানীং বেশি বেশি আরবি, ফরাসি ব্যবহৃত হয়, তাছাড়া অনেকের ধারণা পশ্চিম বাংলায় বাংলা চর্চা হয় এবং তাদের বেশির ভাগই হিন্দু সম্প্রদায় বিধায় বাংলাকে বাদ দিয়ে যতখুশি অন্যান্য ভাষা ব্যবহৃত হওয়াটা অনেকের কাছে তেমন কোনো বিষয় না এখন। কই দেশের ভাষার প্রতি যদি সত্যিই এত দরদ তাহলে ১৯৫২ সালের সেই শহীদ ভাইদের মতো করে কেন আমরা ঝাঁপিয়ে পড়ছি না? আমাদের সেসব ভালোবাসা আস্তে আস্তে বিলীন হতে চলেছে। মন বলে শোষণ, শাসন আর নিপীড়নের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠে সোচ্চার হই আর ঝাঁপিয়ে পড়ি; কিন্তু না তা করব না, কারণ আমরা শান্তিপ্রিয় শান্ত জনগণ। আমরা প্রতিবাদ করতে ভুলে গেছি আর অপমান সইতে শিখেছি। নীতিহীন এবং পথভ্রষ্ট নেতার নেতৃত্বের কারণে আমরা এখন নিজের দেশে পরাধীন। আমাদের নেতা আছে তবে নেই নেতৃত্ব। তারপরও ফেব্রুয়ারি মাস ভাষা রক্ষার মাস, ফেব্রুয়ারি মাস শহীদের রক্তে রঞ্জিত একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি! এতসব কিছুর পরেও দূরপরবাসেÑ হৃদয়ে বাংলাদেশ আজও ভাসে।
কী কারণে সত্যজিৎ রায়ের পরিবার দেশ ছেড়েছিলেন সেটা হয়ত কারো অজানা নয়। একই ভাষা, একই আশা, একই মায়ের ভালোবাসা তা সত্ত্বেও যদি ধর্মের কারণেই বিচ্ছেদ তাহলে কেন সেই ধর্মটাও সঠিকভাবে আমরা পালন করছি না, এটাই আমার আফসোস! এ আফসোস কথাটাও বিদেশি শব্দ। খেয়েপরে বেঁচে আছি বিদেশে, বিদেশি অর্থে। বিদেশে পরের ভাষায় কথা বলি। বিয়ে করেছি যাকে তিনিও বিদেশি, কেমন করে বিদেশিদের ঘৃণা করি? যাই হোক না কেন, ১৯৭২ সালে সত্যজিৎ রায় ২১ ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় এসেছিলেন। তিনি একটি ভাষণও দিয়েছিলেন বাংলা ভাষা ও বাঙালির বাংলাদেশের ওপর। তার হৃদয়ের কথা আমার প্রাণে বাজে আজও।
আমি সেই ছোটবেলা থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি এলেই স্কুলেÑ ‘সালাম সালাম হাজার সালাম শহীদ ভাইয়ের স্মরণে/আমার হৃদয় রেখে যেতে চাই তাদের স্মৃতির চরণে’ গানটি গেয়েছি। হৃদয়ে গেঁথে আছে দিনটি, গানটি, সময়টি, ভাষাটি এবং প্রাণপ্রিয় দেশটিÑ তাইতো বুক ভরা আশা নিয়ে বারবার ফিরে আসি শহীদ ভাইদের স্মরণে।
[লেখক : সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন]



