Wednesday, March 4, 2026
হোমমতামতউপ-সম্পাদকীয়প্রবীণের করুণ আর্তনাদ

প্রবীণের করুণ আর্তনাদ

সম্পর্কিত সংবাদ

শবেবরাত ছিল গত ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে। ওই রাতে বয়োবৃদ্ধ ও অচল এক নারী মুমূর্ষু অবস্থায় পড়েছিলেন রাস্তায়। কিছু মানবিক মানুষ কক্সবাজার সরকারি কলেজের সামনে থেকে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন সদর হাসপাতালে। হাসপাতালে নেয়ার পর বৃদ্ধার আর্তনাদ ছিল, তোরা কোথায়? আমাকে কেন ফেলে গেলি? আমাকে এখান থেকে নিয়ে যা; কিন্তু সেখানেই রাত আড়াইটার দিকে মারা যান তিনি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে এই খবর।

ধারণা করা হচ্ছেÑ সন্তানেরা তাকে সড়কে ফেলে গেছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সবাই লিখেছেন, যখন দুনিয়ার মানুষ জান্নাত খুঁজতে ব্যস্ত, তখন কিছু মানুষ জান্নাতকে ফেলে দিয়ে গেছে রাস্তায়! জানা যায়, পরিচয় না মেলায় এবং কোনো আত্মীয়স্বজনের খোঁজ না মেলায় বৃদ্ধার লাশ কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে বেওয়ারিশ হিসেবে পড়েছিল। যদিও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন বৃদ্ধার পরিচয় উদ্ধারে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

গণমাধ্যমে আরেকটি খবরের শিরোনাম ছিলÑ ‘ওরা জামিন পেলে মেরে ফেলবে’। সরকারি কর্মকর্তা ছেলেমেয়ে ও তার জামাইয়ের জামিন ঠেকাতে হাইকোর্টে এমন আকুতি জানান ৭২ বছর বয়সি এক মা। বৃদ্ধা মায়ের আর্তনাদে সাড়া দিয়ে জামিন দেয়া থেকে বিরত থাকেন উচ্চ আদালত। মায়ের ওপর নির্যাতনের জন্য ভর্ৎসনা করেন বিচারপতি।

জানা যায়, ভুক্তভোগী খুরশিদা আক্তার অন্যের সাহায্য ছাড়া হাঁটতে পারেন না, কথাও জড়িয়ে যায় মুখে; তবুও আদালতে বিচারকের সামনে উপস্থিত হয়েছিলেন। নিজের ভরণপোষণের জন্য কিছু সম্পত্তি বিক্রি করেন খুরশিদা আক্তার। সেই টাকা এবং বাকি সম্পত্তি ছেলেমেয়েদের নামে লিখে দেয়ার জন্য মাকে মারধর এবং নির্যাতন করতো ছেলেমেয়ে এবং মেয়ের স্বামী। মারধরের কারণে তাকে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। সেসব রিপোর্ট আদালতে জমা দেয়া হয়েছে। এসব নির্যাতন এবং মারধরের জন্য এই মা আদালতের দ্বারস্ত হতে বাধ্য হয়েছেন। খুবই জঘন্য এবং নিন্দনীয় বিষয় হচ্ছে আদালত প্রাঙ্গণেও সন্তানেরা মায়েরে সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতে কসুর করেনি।

সন্তান মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় প্রসূতি মা নানাবিধ শারীরিক এবং মানসিক সমস্যা অতিক্রম করেন। সবার ধৈর্য-সহ্য কষ্ট আত্মত্যাগের সমাপ্তি ঘটে শিশুর জন্মদানের মধ্য দিয়ে; কিন্তু সন্তান জন্মদানের সময়টা? নাড়িছেঁড়া ধন পৃথিবীর আলোয় আসার মুহূর্তটাকে মায়ের জায়গা থেকে উপলব্ধি করার চেষ্টাটুকুও কেউ যদি করেন, অশ্রু ধরে রাখা তার পক্ষে কঠিন হবে। সন্তানের হাসিমাখা মুখ মায়ের সব দুঃখ-বেদনা কষ্ট আত্মত্যাগের পরিসমাপ্তি ঘটায়।

তারপর শুরু হয় মা ও বাবার শিশুর লালান-পালন সেবা-যতœ পরিচর্চার পালা। মুখে খাবার তুলে দেয়া হাঁটি হাঁটি পা-পা করে চলতে শেখা শিক্ষা-দীক্ষা দেয়া সুন্দর এবং মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সেকি প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। সবচেয়ে বেশি দুঃখ-কষ্ট হয় দুঃখী মেহনতি মানুষের। তারা নিজেরা খেয়ে না খেয়ে নিজেদের সন্তানকে শিক্ষিত আদর্শ চরিত্রবান মানবিক এবং সুসন্তান হিসেবে গড়ে তুলতে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যান।

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, অনেক সন্তান তাদের মা-বাবার মুখে দু’মুঠো খাবার তুলে দিতে অস্বীকার করে। আবার অনেকে বেঁচে থাকা মা-বাবাদের টাকা ধন-সম্পদ হাতিয়ে নেয়ার জন্য তাদের নির্মম-নির্দয়ভাবে মারধর এবং নির্যাতন করে। পাশাপাশি হত্যার হুমকি দেয় সবকিছু লিখে দেয়ার জন্য। এ অবস্থার অবসান হবে কবে?

[লেখক : প্রাবন্ধিক]

সম্প্রতি

আরও খবর