Thursday, March 5, 2026
হোমমতামতউপ-সম্পাদকীয়সরকারি কর্তৃপক্ষের অনুমোদন থাকে কোথায়

সরকারি কর্তৃপক্ষের অনুমোদন থাকে কোথায়

সম্পর্কিত সংবাদ

এটা কি প্রেমের চিঠি যে, প্রেমিকা যতদিন না শুনবে চিঠি দিয়েই যাব? এসব কর্তৃপক্ষের কি অ্যাকশন নেয়ার কোন মুরোদ নেই! তিনবার চিঠি দেয়ার পর তো স্বাভাবিকভাবে অ্যাকশনে যাওয়ার কথা। গেলেন না কেন? কিসের আশায়? বা কী পেয়ে? সবাই সর্বোচ্চ মুনাফার অর্জনের পেছনে ছুটছে। এক্ষেত্রে মানুষ মরল নাকি বাঁচল, এ নিয়ে কারও কোনো ভ্রƒক্ষেপ নেই। এভাবে চলতে পারে না। তাহলে রাজউকের এতো এতো কমকর্তা না রেখে সব ছাঁটাই করে ২ জনের একটা কমিটি থাকলেই হয়! আগুনে পুড়ে মরার পর তাদের ডেলিভারি হবেÑ অনুমোদন ছিল না, নোটিশ দিয়েছি… হ্যান-ত্যান!

রাজধানীর বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় তিনবার নোটিশ দেয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক। অন্যদিকে রাজধানীর বেইলি রোডে যে ভবনে আগুন লেগে প্রায় অর্ধশত লোকের মৃত্যু হয়েছে, সেটিতে রেস্তোরাঁ করার অনুমোদন ছিল না বলে জানিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। আগুনে জান-মালহানির ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতির পর রাজউকের কমন উত্তর ভবনটি অনুমোদন ছিলো না। তাহলে আমরা বলতে চাই, অনুমোদন থাকে কোথায়?

নিয়মনীতি ঠিক নেই বলছেন, কিন্তু কেন নেই তার উত্তর কার কাছে। বাসা থেকে অফিসে আর অফিস থেকে বাসায় এসির বাতাস লাগিয়েছেন, আর বসে বসে ফায়দা হাসিলের ধান্ধা করেছেন! দুর্ঘটনা ঘটলেই চেহারা দেখাতে আসেন। কোনো দুর্ঘটনা হলেই যেন এই সমস্যা ছিল, ওই সমস্যা ছিল। আবিষ্কার করতে শুরু করবেন, ভবনে এইটা ছিল না, সেইটা ছিল না! সিঁড়ি ছিল না! দরজা ছিল না! ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন ছিল না, ফায়ার এসকেপ ছিল না, সিলিন্ডার আর সিলিন্ডার! কিন্তু একসঙ্গে এতগুলো প্রাণের দায় কার?

বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজের আগুন প্রথম ছিলো না, এই আগুনই শেষ আগুন নয়! অজ্ঞতার আগুন নেভানো অত সহজ কথা নয়! এই আগুন অজ্ঞতার, লোভের, লালসার ও নির্লজ্জ অসম প্রতিযোগিতার! যতোদিন ঘুষ আর ক্ষমতার জোরে অন্যায়ভাবে এইসব স্থাপনা দাঁড়িয়ে থাকবে, আমাদের মরতেই হবে। যারা এইসব মৃত্যুফাঁদ বানান তারা অর্থবিত্তে ফুলেফেপে ওঠেন। সরকারি কর্তৃপক্ষ ব্যস্ত উপরি ‘ইনকাম’ নিয়ে। অযথা শহর-নগরের তদারকিতে সময় নষ্ট না করে, উপরি ইনকাম বাণিজ্যে সময় ব্যয় করলে আয় অনেক বেশি। জেনেশুনে উচ্চ বাণিজ্যের লালসায় একদল মানুষকে নিয়মিত মৃত্যকূপে ঠেলে দেয়ার পর যদি বলা হয়- এদের মৃত্যু দুর্ঘটনা। মেনে নেয়া যায় কী?

নিমতলী, চুড়িহাট্টা, বনানী এফআর টাওয়ার, মগবাজার, বঙ্গবাজারের অগ্নিকা-ের ঘটনার পর বেইলি রোডের এ ঘটনা ঢাকায় জীবনের নিরাপত্তার বিষয়টি আবার সবার সামনে নিয়ে এলো। বিশ্বের বিভিন্ন শহরের বাসযোগ্যতার সূচকে ঢাকার অবস্থান নিচের সারিতে, বিষয়টি বহুল আলোচিত। কিন্তু ঢাকায় যে পরিমাণ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাধারণ মানুষকে বসবাস করতে হয়, বিশ্বের আর কোনো শহরে এমন ঝুঁকি আছে কিনা, সেটা বিবেচনার দাবি রাখে।

বেইলি রোডের হƒদয়বিদারক ও মর্মান্তিক অগ্নিকা- সর্বসাধারণের মনে শোক ও চরম ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। একেকটা মৃত্যু যেনো একেকটা পৃথিবীকে শূন্য করে দেয়া। কোনো ভবন বা প্রতিষ্ঠানে আগুন লাগার ঘটনা এই প্রথম নয়। ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিজেদের দায় অন্যের ওপর চাপানোর লক্ষ্যে নানা অজুহাত ও দোষত্রুটি খোঁজার চেষ্টা চালায়। প্রকৃত অর্থে কর্তৃপক্ষের নজরদারি ও যথাযথ পদক্ষেপের অভাবে প্রতিনিয়ত এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে এবং এর খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

কেবল বেইলি রোডের ভবনটি নয়, ঢাকা শহরে এ রকম কাঠামো ব্যাপক রয়েছে। দুর্ঘটনা ঘটার পরই আমরা জানতে পারি, সেখানে কী কী ত্রুটি বা দুর্বলতা ছিল। দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের তদারকির অভাব ও অবহেলায় বার বার অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটছে। বেইলি রোডের অগ্নিকা-ে শতভাগই অসচেতনতা ও অবহেলা ছিল।

একটি ভবন গড়ে ওঠা থেকে শুরু করে এর কার্যক্রম চলা পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপের সঙ্গে সরাসরি ছয়টি সংস্থা যুক্ত থাকে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), সিটি করপোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর এমনকি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও রয়েছে। কারণ এসব সেবা সংস্থা ও কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের মধ্য দিয়ে এমন ভবন গড়ে ওঠা ও এর কার্যক্রম চলার কথা। ভবন নির্মাণে যে ছয়টি সংস্থার সনদ লাগে, তাদের দায়িত্ব আছে প্রতিা ভবনের নিয়মকানুন, নিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, বিল্ডিং কোড, নিরাপত্তা কোড দেখার, নিশ্চিত করার, অনুমতি দেয়ার, অনুমতি বাতিল করার। কেউ কোনো দায়িত্ব পালন করছেন না। গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ এই ভবনের সনদ বাতিল করেছিল, জোর করে, তদবির করে আদায় করা হয়েছে।

এ ঘটনায় রাষ্ট্রের নগর ও প্রশাসন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার গাফিলতিজনিত দায় শতভাগই? নগর সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব রয়েছে বলে আমরা মনে করছি। একটি বহুতল ভবন পুরোটাই খাবারের দোকান, প্রতি তলায় রান্নাঘর, সিঁড়ি আর রান্নাঘরে গ্যাস সিলিন্ডারের সঙ্গে এক নতুন খাদ্য সংস্কৃতি আমাদের শহরগুলোতে। রাজউক যে ভবনে কেবল অফিস করার অনুমতি দিয়েছে, সেই ভবনে সিটি করপোরেশন কিভাবে রেস্তোরাঁ করার জন্য ট্রেড লাইসেন্স দিচ্ছে? আবার ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন না নিয়েই কীভাবে এই রেস্তোরাঁর ব্যবসা চলছে, সেটাও বিস্ময়কর। নগর সংস্থাগুলোর কার্যকর সমন্বয়ের অভাবেই ঢাকার ভবনগুলো যেনো একেকটি ‘টাইম বোমা’। ঢাকার অবস্থা বর্তমানে পারমাণবিক চুল্লির চেয়ে কম কিছু নয়। আমরা যেন বারুদের স্তূপের উপর বসে আছি। সার্বিক নৈরাজ্যের প্রতিফলন হচ্ছে এসব দুর্ঘটনা।

নিমতলীতে ১২৪ জন মারা যাওয়ার পরে কী হয়েছে? কিছুই হয়নি। নিমতলীর পর চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ওয়াহেদ ম্যানশনে আগুন লেগে ৭১ জন মারা যান। বানানীতে আগুনে ৪৮ জন মারা যান। আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনসের ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনায় ১১১ জন পোশাক শ্রমিক পুড়ে ছাই হন। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসে ১ হাজার ১৩৫ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। ২০২২ সালে সীতাকু-ের বিএম কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিকা-ের দুর্ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের ১৩ জনসহ মারা যান ৫১ জন। এভাবে একের পর এক ঘটনা ঘটেই চলেছে। গত ২৯ ফেব্রুয়ারি বেইলি রোডে ৪৬ জন মারা গেছেন। এ মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে শুনেছি আমি।

দেশে বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন অ্যাক্ট আছে এবং এই আইনে জেল-জরিমানার বিধান আছে। আইন প্রয়োগ করে রাজউক ভবন মালিকদের জবাবদিহি করতে পারে। কিন্তু সেটা তারা বেশির ভাগ সময়ই করে না। রাজউক একটা অকার্যকর প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের নাম উচ্চারণ করাটাও একটা যন্ত্রণার বিষয়। মনে করি, রাজউক না হয় নিয়মিত পরিদর্শন করে না। ঢাকায় যে সিটি করপোরেশন আছে, তারা কি করে কাগজপত্র যাচাই-বাছাই না করে রেস্তোরাঁগুলোকে ট্রেড লাইসেন্স দিয়ে থাকে? আমাদের আসলে পুরো ব্যবস্থায় গলদ আর অনিয়ম।

ভবনে যে কার্যক্রম চলবে, সে অনুযায়ী ভবনের নির্মাণ-কাঠামো ও নকশা করতে হয়। আবাসিক ভবন, স্কুলভবন, গোডাউন, হাসপাতাল, রেস্তোরাঁ, পোশাক কারখানা, রাসায়নিক কারখানা একই রকমভাবে নকশা করা হয় না। কাজেই যে ভবন যে উদ্দেশ্যে তৈরি, সেই ভবন সেই কাজেই ব্যবহƒত হতে হবে। ইচ্ছা করলেই বাণিজ্যিক বা আবাসিক ভবনে রেস্তোরাঁ করার কোনো সুযোগ নেই।

সরকারি কর্তৃপক্ষ এখন দয়া করে এরকম আর কতজনকে চিঠি দিয়েছেন তার তালিকাটা যদি দিতেন তাহলে মানুষ অন্তত সচেতন হতো। এখন খবর নেন বাকি ভবনগুলোর অনুমোদন আছে কিনা, নাকি তাও আরেকটা দুর্ঘটনা ঘটার পরে নতুন চিত্রনাট্য করবেন?

রাজধানীর বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে আগুনের এ মৃত্যু কাম্য নয়। মর্মান্তিক এ মৃত্যু কখনো মেনে নেয়া যায় না। প্রায় অর্ধশত মানুষ মারা যাবে, এটা ভাবনারও অতীত। এতে আবারো প্রমাণিত হলো, ঢাকার ভবনগুলো কতটা অনিরাপদ। গ্রিন কোজি কটেজ ট্র্যাজেডি বলছে, অন্য কোথাও এমন অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটলে একই পরিণতি অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। নানা অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোয় না জানি ভবিষ্যতে আরও অনেক আগুন, আরও অনেক প্রাণ ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি লুকিয়ে আছে!

[লেখক : প্রাবন্ধিক]

সম্প্রতি

আরও খবর