Wednesday, March 4, 2026
হোমমতামতউপ-সম্পাদকীয়নারী অধিকার আদায়ের অন্তহীন প্রেরণা কমলা ভাসিন

নারী অধিকার আদায়ের অন্তহীন প্রেরণা কমলা ভাসিন

সম্পর্কিত সংবাদ

কমলা ভাসিন। প্রখ্যাত নারীবাদী লেখক ও অধিকার কর্মী। কোন কোন মানুষ আছেন তাদের জন্ম যেখানেই হোক না কেনো- ব্যক্তিত্ব, কর্ম এবং আদর্শের জ্যোতিতে তিনি শুধুমাত্র সে দেশেরই নাগরিক হয়ে থাকেন না; তার প্রজ্বালিত আলোর জ্যোতি পৌঁছে যায় যেসব দেশে, সেসব দেশের নাগরিকও হয়ে যান তিনি। কমলা ভাসিনের জন্ম ১৯৪৬ সালের ২৪ এপ্রিল, ভারতের রাজস্থান প্রদেশে। ভাসিন নিজেকে ‘মিডনাইট জেনারেশনের’ শিশু বলে দাবি করতেন, এর কারণ হলো সাতচল্লিশের দেশ ভাগের এক বছর আগে তিনি জন্মলাভ করেছিলেন। ভাসিন চিকিৎসক পিতার সঙ্গে ঘুরেছেন রাজস্থান, পাঞ্জাব, উত্তর প্রদেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে। দেখেছেন দেশভাগ, উদ্বাস্তুকরণ, নারীর প্রতি সহিংসতা, যা তাকে মানবিক চৈতন্যে ও নারীবাদী দর্শনে উদ্বুদ্ধ করে। উত্তর ভারতের উর্দু-হিন্দি বলয়ে কাজ করলেও কমলার কণ্ঠস্বর দক্ষিণ এশিয়া এবং সারা বিশ্বে উচ্চকিত হয়েছিল। গবেষণা, লেখালেখি, সাহিত্য সাধনা এবং অ্যাক্টিভিস্ট রূপে তিনি নিজের জীবন ও কর্মকে প্রসারিত করেছিলেন মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের মর্মমূলে।

দক্ষিণ এশিয়ার নারী আন্দোলনের এই অন্যতন পুরোধা-আইকন, লেখক-কবি কমলা ভাসিন পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন খুব বেশিদিন হয়নি, ২০২১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তারিখে তার মহাপ্রয়াণ ঘটে। এতো বড় প্রভাব বিস্তারকারী নারী আন্দোলনের নেত্রী, যাকে দক্ষিণ এশিয়ার কঠস্বর বলে আখ্যায়িত করা হতো তার মৃত্যুতে ব্যাপক কোন সাড়া পড়েনি ভারতীয় এবং দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্র এবং সমাজ পর্যায়ে। মৃত্যুতে শোক বার্তা পাঠাননি ক্ষমতাসীন কিংবা ক্ষমতার বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর কর্ণধারেরা। তবে ভাসিনের জন্য নীরবে চোখের জল ফেলেছেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লাখ লাখ মানবাধিকার ও নারী অধিকার কর্মীরা।

ভারতের রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর করে পশ্চিম জার্মানির মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন কমলা ভাসিন। জার্মানির ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট ওরিয়েন্টেশন কেন্দ্রে বেশ কিছুদিন কাজ করে কমলা নিজ দেশে ফিরে আসেন। বাকি জীবনটা তিনি কাটান দেশের প্রান্তিক নারীদের অধিকারের কথা বলে।গত শতাব্দীর সত্তরের দশক থেকে ভারতসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে নারীর অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সোচ্চার ছিলেন কমলা ভাসিন।

দক্ষিণ এশিয়ার নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় লড়াইরত একাধিক সংগঠনের নেতৃত্বে ছিলেন ভাসিন। এসব সংগঠনের অন্যতম হচ্ছে ‘সাউথ এশিয়া নেটওয়ার্ক অব জেন্ডার অ্যাক্টিভিস্ট অ্যান্ড ট্রেইনার্স’ বা সংক্ষেপে ‘সঙ্গত’। এটি এখন দক্ষিণ এশিয়ায় নারীর অধিকার আন্দোলনে পুরোধায় ভূমিকা পালন করছে। ২০০২ সালে কমলা ভাসিন নারীবাদী নেটওয়ার্ক ‘সঙ্গত’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা গ্রামীণ এবং উপজাতি সম্প্রদায়ের সুবিধাবঞ্চিত মহিলাদের সঙ্গে কাজ করে।

কমলা ভাসিন বাংলাদেশের উন্নয়ন আন্দোলনের সাথে যুক্ত নেতৃস্থানীয় সংগঠন ও ব্যক্তিদের সাথে আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতেন। ভাসিন প্রথম বাংলাদেশ আসেন ১৯৭৬ সালে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরউল্যা চৌধুরীর আমন্ত্রণে। তিনি গণস্বাস্থ্যের সাথে ১৯৭৬ সালে গ্রামীণ জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন। ভাসিন জাফরউল্যা চৌধুরীকে এমন একজন নেতৃস্থানীয় উন্নয়ন নেতা হিসেবে গণ্য করতেন যিনি সতত ‘আউট অব বক্স’ বা চলতি প্রথা এবং অনুশীলনের বাইরে অন্য কিছু ভাবার যোগ্যতা রাখেন।

এছাড়াও সত্তরের দশক থেকে বাংলাদেশের উন্নয়ন আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব স্যার ফজলে হাসান আবেদ এবং ব্র্যাকের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে ওঠে। বাংলাদেশের প্রায় অধিকাংশ উন্নয়ন সংগঠনের কর্মীদের সাথে তার গভীর ও আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল।

বাংলাদেশের নারী অধিকার আন্দোলনে কমলা ভাসিনের সব চেয়ে বড় অবদান কী ছিল? তিনি সারা বাংলাদেশে হাজার হাজার উন্নয়নকর্মীর মনের ভেতরে নারী-পুরুষ সমঅধিকারের প্রদীপ জ্বালিয়ে দেয়ার কাজটি সফলভাবে করতে পেরেছিলেন। তার কর্মের প্রভাব যুগপৎ দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য। বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মীরা সর্বপ্রথম জেন্ডার বিষয়টি যে সমাজের চাপিয়ে দেয়া নারী পুরুষের বিভেদ, এ কথাটি স্পষ্টভাবে শুনতে পায় তার মুখ থেকে। নারী পুরুষের গঠনের পার্থক্য যে নিতান্ত প্রাকৃতিক এবং গঠন পার্থক্য যে নারীর সম্ভাবনা ও অবদানে কোন প্রভাব ফেলতে পারে না এ কথাটি তিনি সকল পর্যায়ের কর্মীদের বুঝিয়ে বলতেন। আশির দশকের মৌলবাদ প্রভাবিত সময়ে কমলা ভাসিন সমাজের পশ্চাৎপদ চিন্তার জট খুলে দিতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হন। সারা বিশ্বে নারী-পুরুষের ওপর সমাজের চাপিয়ে দেওয়া বিভেদ নিয়ে জেন্ডার সেনসেটাইজিংয়ের আলোচনাকে উসকে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করে গেছেন কমলা ভাসিন আমৃত্যু।

কমলা ভাসিন চমৎকার ব্যাখ্যা করে সেক্স আর জেন্ডারের পার্থক্য তুলে ধরতেন। সেক্স বা প্রাকৃতিক লিঙ্গ নির্ধারিত থাকে, এটি শারীর বৃত্তীয়। আমরা জন্মের সময়েই এই তফাত নিয়ে জন্মাই। এই তফাত কোন বিভেদ নয়, তফাতটি হলো প্রকৃতির বৈচিত্র্য; কিন্তু জেন্ডার বা সমাজ নির্ধারিত লৈঙ্গিক ধারণা, সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করে। নারী সন্তান ধারণ করবে, সন্তানকে দুধ খাওয়াবে- এছাড়া নারী-পুরুষের সৃষ্টিতে আর কোনো তফাত করা হয়নি। নবজাতকের ভেজা কাঁথা ধোয়া হোক আর উড়োজাহাজ চালানোই হোক, নারী-পুরুষ উভয়েই সব করতে সক্ষম। সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা নিয়ে জন্মানো শরীরটা নারীর, এটা তার প্রাকৃতিক লিঙ্গ বা সেক্স। আর তার জামার ওপর ছড়িয়ে রাখা ওড়নাটা হলো জেন্ডার। যে ওড়নাটা সমাজ তার গায়ে বসিয়ে দিয়েছে। গায়ে বসিয়েই সমাজ ক্ষ্যান্ত হয়নি, তাকে অন্ধকার ঘরে বন্দি করতে সমাজ সর্বক্ষণ উদ্ধত।

কমলা ভাসিন ব্যক্তিগত আলোচনা, ঘরোয়া আড্ডা, কর্মশালা অথবা বক্তৃতা সভায় সবার ভুল ভাঙিয়ে দিয়ে মনে করিয়ে দিতেন, নারীবাদের লড়াইটা কোথায়? তার সুস্পষ্ট মতামত, পুরুষতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে নারীতন্ত্রের সূচনা করা নারীবাদের লড়াইয়ের মূল কথা নয়; বরং মূল কথাটা হলো সমতার, সমতাভিত্তিক সমাজের। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে সমাজ সমানভাবে দেখবে আর সমান সুযোগ দেবে- এমন সমতার পৃথিবীই চায় নারীবাদ। অর্থাৎ সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পালটে ফেলে নারী-পুরুষের সমান সুযোগ সৃষ্টি করে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠাই নারীবাদ। অন্য অর্থে নারীকে মানুষ ভেবে মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াই হলো নারীবাদী আন্দোলনের মূল লক্ষ্য।

নারী আন্দোলনের সাম্প্রতিক বাস্তবতায় তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। কমলা ভাসিন ২০১৬ সালে নারীর প্রতি সহিংসতাকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এ অবস্থার পরিবর্তনে, ভয় থেকে মুক্ত হয়ে নিজেদের বদলে ফেলার আহ্বান জানিয়ে ছিলেন নারীদের। তার এ আহ্বান সমগ্র বিশ্বের সচেতন মানুষের নজর কাড়ে।

কমলা ভাসিন বিশ্বাস করতেন, ‘তোমার-আমার ব্যক্তিগত জীবন না বদলালে পিতৃতন্ত্র চলে যাবে না। সুতরাং আমি নিজের দিকে আঙুল রাখছি, তোমরা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে নিজের দিকে আঙুল রাখো।’ এসব কথা তিনি তার লেখায়-বক্তৃতায় বারবার বলেছেন।

‘কিঁউকি ম্যায় লডকি হুঁ, মুঝে পঢ়না হ্যায়’Ñ ইত্যাদি কবিতার জন্য তিনি সুপরিচিত। ১৯৯৫ সালে তিনি একটি সম্মেলনে জনপ্রিয় কবিতা আজাদীর (স্বাধীনতা) একটি পরিমার্জিত, নারীবাদী সংস্করণ আবৃত্তি করেন। তিনি ওয়ান বিলিয়ন রাইজিংয়ের দক্ষিণ এশিয়ার সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগে নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতনের ইতিহাস উন্মোচনে তিনি ছিলেন সরব। বিশ্বায়নের প্রক্রিয়ায় নারীর বিঘœ ও বিপদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার অবস্থান ছিল অগ্রণী। তিনি স্বপ্ন দেখতেন নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈষম্যহীন ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ কাঠামোর। কমলা ভাসিন জেন্ডারতত্ত্ব, নারীবাদ ও পিতৃতন্ত্র নিয়ে বেশ কিছু বই লিখে গেছেন। এসব বই ৩০টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তিনি তার লেখা বইগুলোতে পিতৃতান্ত্রিক সমাজকাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করেন।

পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করা এবং সমতার সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের মূল কর্মসূচি হাতে নেয়া উচিত ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর। শুধুমাত্র দক্ষিণ এশিয়াতেই নয় সমগ্র বিশ্বের পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কাঠামো প্রথা, ধর্ম, ইত্যাদির নামে শোষণের প্রক্রিয়াকে চলমান রাখার জন্য পিতৃতন্ত্রকে লালন করে যাচ্ছে।

কমলা ভাসিন আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন কিন্তু তার জ্বালানো প্রদীপ কিন্তু উজ্জ্বলতর হচ্ছে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অগণিত দেশে। নারীর প্রতি সহিংসতা বৈষম্য যতদিন থাকবে কমলা ভাসিনের কাজ ও আদর্শ নারী অধিকার কর্মী, মানবাধিকার কর্মীরা বহন করে নেবেন। তার জ্বেলে দেয়া প্রদীপের আলোয় আমরা এক নতুন সাম্যের সমাজ বিনির্মাণ করব। এ সমাজের ভেতরে প্রেরণা হিসেবে অগণন দিন চেতনার বহ্নিশিখা হয়ে বেঁচে থাকবেন কমলা ভাসিন।

[লেখক : প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

সম্প্রতি

আরও খবর