Wednesday, March 4, 2026
হোমমতামতউপ-সম্পাদকীয়‘সমতার বিশ্ব গড়ি’

‘সমতার বিশ্ব গড়ি’

সম্পর্কিত সংবাদ

আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। নারী-পুরুষের ঐক্যতায় নতুন সমতার বিশ্ব গড়ার প্রত্যয়কে সামনে রেখে আজকের এই দিনে অর্থাৎ ৮ মার্চ এ দিবস পালিত হয়ে থাকে। আজ থেকে প্রায় ১৬৭ বছর আগে অর্থাৎ সেই ১৮৫৭ সালের সেই কঠিন সময়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই নারীদের জন্য এ বিশেষ দিনটি পালনের কথা আজকাল কম-বেশি সবাই জানে। মজুরি-বৈষম্য ও বিভিন্ন দিক থেকে বঞ্চিত হবার ফলে ১৮৫৭ সালের সেই ঐতিহাসিক দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউয়র্ক শহরের পোশাক কারখানায় নারী শ্রমিকেরা দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, শিশুশ্রম, মজুরি-বৈষম্য ইত্যাদির প্রতিবাদে এবং ন্যায্য ও সম-মজুরি, ভোটদানের অধিকার, শ্রমঘণ্টা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে রাজপথে নেমে এসেছিল। আন্দোলেন ঠেকাতে সামগ্রিকভাবে সেদিন মালিকপক্ষ অসহায় শ্রমিকপক্ষের প্রতি বিশেষ করে নারীদের প্রতি অমানবিক নির্যাতন চালিয়েও তাদের দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ প্রতিবাদকে কোনোভাবেই রুখতে পারেনি।

পরবর্তীকালে ১৯৯০ সালে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন শহরে এক বিশাল আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সম্মেলনে তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক নারী নেত্রী ক্লারা জেৎকিন বিশ্বের সবাই নারী জাতিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জোটবদ্ধ হবার আহ্বান করেন। একই সঙ্গে উক্ত দিনটিকে সারা বিশ্বে ‘নারী দিবস’ হিসেবে পালন করার জন্য প্রস্তাব করেন। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৯১ সালের ৮ মার্চ সর্বপ্রথম উক্ত দিবসটি অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডে উদযাপিত হয়। তারপর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নারী-পুরুষের সমতা, সম-অংশীদারিত্ব, ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় ও সর্বোপরি নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ পালিত হয়ে আসছে।

বাস্তবতা বড়ই নিষ্ঠুর। আজও নারী-পুরুষের মধ্যে সমতার বিশ্ব গড়ে ওঠেনি। আজও অতি সাধারণ মানুষের কাছে ‘জেন্ডার’ মানে নারীর প্রতি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ‘নির্যাতন’ টাইপের একটি বিষয়। আশির দশকে বিষয়টি প্রায় এমনই ছিল; কিন্তু কালক্রমে এ ধারণার অনেক পরিবর্তন সাধিত হলেও জনমনে ভ্রান্ত ধারণাটি যেন অস্থি-মজ্জার সঙ্গে মিশে আছে। উন্নয়ন জগতে ‘জেন্ডার’ হলো নারী-পুরুষের সমতায়নের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় বা বিশেষ উদ্যোগ। সময়ের প্রয়োজনে, পরিস্থিতির বিবেচনায় কৌশলগত কারণে ও সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে নারীর প্রতি পুরুষের; পক্ষান্তরে, পুরুষের প্রতি নারীর যে সহযোগিতা-সহমর্মিতা ও কাজ করার অনূকুল পরিবেশ সৃষ্টি করে দেবার যে উদ্যোগ তা-ই মূলত উন্নয়ন জগতে ‘জেন্ডার’ হিসেবে অভিহিত। সঙ্গতকারণেই নারীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা ও জেন্ডার সম্পর্কে আলোচনা এখনো অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নারীরা আজ প্রায় সবদিক থেকেই এগিয়ে চলেছে বটে! বিভিন্ন ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক অবদান রাখলেও আজও সিংহভাগ নারীর প্রতি সহিংসতা ঘটে হরহামেশায়।

‘নারীর সমঅধিকার, সমসুযোগ এগিয়ে নিতে হোক বিনিয়োগ’Ñ এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও সরকারি-বেসরকারি মহলে আন্তর্জাতিক নারী দিবস-২০২৪ উদযাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। যেহেতু সমঅধিকার ও সমসুযোগ ছাড়া আধুনিক বিশ্বে নারী-পুরুষের সমতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা কোনোভাবেই সম্ভব নয়, তাই উন্নয়ন পরিকল্পনায়, বাস্তবায়নে ও মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ আরও বাড়াতে হবে। নারীর সামাজিক নিরাপত্তা ও বাক-স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সরকারের সুদৃষ্টি আশু প্রয়োজন। একই সঙ্গে নারীকে প্রযুক্তিগত ব্ল্যাকমেইল ও অনলাইন সহিংসতা থেকেও সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রেখে যোগ্য সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলে ক্ষমতায়িত করা এখন সময়ের দাবি।

সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও নারী ও পুরুষের মধ্যে নানাবিধ বৈষম্য আজও বিরাজমান। এমনকি অসমতার মতো বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও বৈষম্য রয়েছে; অর্থাৎ নারীদের জন্য অপেক্ষাকৃত কম বিনিয়োগ বা বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয় নিদেনপক্ষে নিজ পরিবার থেকে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে বিভিন্ন মহলে হয়তো আলোচনার ঝড় উঠেছে! নারীর উন্নয়ন বিষয়ক অনেক গালভরা বুলি আওড়ানো হলেও ক্ষাণিক বাদেই জনৈক আলোচক যখন নিজের স্ত্রীর প্রতি শারীরিক তথা পারিবারিক সহিংসতার অনুঘটক হন তখন বিষয়টি বড্ড সাংঘর্ষিকই বটে!

নারীর প্রতি সহিংসতা মোকাবিলা কোন সহজ কাজ নয়! যেহেতু পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষেরা প্রায় সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, তাই সর্বাগ্রে পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি। নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় পুরুষদের এগিয়ে আসতে হবে। পরিবারে, বিদ্যালয়ে, কর্মস্থলে, শহরে, বন্দরে, যানবাহনে এমনকি বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠানে তাদের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন খুবই জরুরি। সমাজে নারী-পুরুষের যে ন্যায্য অধিকার ও গুরুত্ব রয়েছে, উভয়ে মিলে যে অভিন্ন সত্তাÑ এই মানবিকতাবোধটুকু সমাজ ও মানুষেরা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে না পারলে নারীর প্রতি বৈষম্য চলতেই থাকবে। আর এ কাজগুলো শুরু করতে হবে একদম গোড়া থেকে, অর্থাৎ পরিবার থেকে। তাই আসুন সবাই সহিংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই। নিজ নিজ জায়গা থেকে সোচ্চার হয়ে প্রতিরোধ করি নারী নির্যাতন। উপরোক্ত করণীয়গুলো নিতান্তই মানবজাতির! নারীজাতিকে ’মানুষ’ হিসেবে যোগ্য সম্মান প্রদান করবার জন্য দায়িত্ব ও কর্তব্য আমাদের সবার; বিশেষ করে পুরুষ জাতির।

উন্নয়নশীল বা মধ্যম আয়ের এ দেশের সিংহভাগ মানুষ নিশ্চয়ই নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ তথা নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই! তাহলে কোথায় এত বাধা? শুধু পৌরুষ আচরণই কী এর মূল কারণ? নাকি গণসচেতনতার অভাব? নাকি দুষ্টচক্রের প্রভাব? অনেকাংশে কৌশলগত সমস্যাও কি নেই?

যাই হোক, নিশ্চয়ই আমরা নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই! সেক্ষেত্রে সবার আগে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা অনেক বেশি জরুরি। এছাড়া পুরুষদের সংবেদনশীলতা অনেক বেশি প্রয়োজন। এ দেশের প্রত্যেকটি ছেলে ও তাদের পরিবারের সদস্যদের মনে করা উচিতÑ ‘আমি/আমরা আমাদের মা-বোন-স্ত্রীসহ সমস্ত নারীকুলকে মন থেকে সম্মান করবো!’ একই সঙ্গে পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশনের টক শো’তে আলোচনার বিষয়বস্তু পরিবর্তন করার সময় এসে গেছে! অর্থাৎ নারীর প্রতি সহিংসতার শিকার মেয়ে অথবা তার পরিবারকে নিয়ে কথা বলার চেয়ে ছেলে তথা সহিংসতাকারীকে নিয়ে সংবেদনশীল অলোচনা করা অত্যন্ত প্রয়োজন। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো পুরুষদের সম্পৃক্তকরণের মধ্য দিয়ে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্যাম্পেইন চালিয়ে যেতে পারে! প্রয়োজনে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করা দরকার। এমনি করে একদিন নিশ্চয়ই আমাদের সমাজ থেকে ও দেশে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।

সর্বোপরি শুধুমাত্র ৮ মার্চেই কেন এত ‘নারী বিষয়ক’ আলোচনা? বরং আলোচনা হোক সর্বত্রই! তাই আসুনÑ নারীদের জন্য সমতার বিশ্ব গড়ি!

[লেখক : উন্নয়ন সহযোগী]

সম্প্রতি

আরও খবর