Wednesday, March 4, 2026
হোমমতামতউপ-সম্পাদকীয়রম্যগদ্য : ‘হিং টিং ছট...’

রম্যগদ্য : ‘হিং টিং ছট…’

সম্পর্কিত সংবাদ

‘হিং টিং ছট প্রশ্ন এসব মাথার মাঝে জাগে, বেইলি রোডে লাগবে আগুন, জানত কি কেউ আগে?’ বলছিলাম বেইলি রোডে হঠাৎ ঝরে যাওয়া বহুল প্রচারিত ছেচল্লিশ (৪৬) জন ভাগ্যহতের কথা। প্রশ্ন জাগার প্রশ্ন হচ্ছে ফায়ার ব্রিগেড বলছেন, আমরা ঝুঁকিপূর্ণ ভবন বলে তিনবার নোটিশ দিয়েছি, তবুও গ্রিন কোজি কটেজের কর্তৃপক্ষ কোনো কর্ণপাত করেননি! দান দান তিন দানেও যখন গ্রিন কোজি কটেজের লোকেরা কথা শোনেননি তাই তাহাদিগকে কি কথা শোনানোর জন্য এই ব্যবস্থা? আরও বলা হচ্ছে প্রায় সমস্ত সিঁড়িতে বড় বড় গ্যাস সিলিন্ডার রেখে গ্রিন কোজি কটেজের সিঁড়ি দিয়ে চলাচলের কোনো রকম অবস্থা বিরাজ করছিল না। র্কতৃপক্ষের এই বালখিল্যতা মেনে নেয়া যায় না। ভালো কথা সাধু সাধু। এখন হিং টিং ছট প্রশ্ন জাগে বেইলি রোডের আর কোনো বিল্ডিংয়ে কি রেস্টুরেন্ট নেই! আর কোনো রেস্টুরেন্টের সিঁড়িতে কি গ্যাসসিলিন্ডার রাখা নেই? গ্রিন কোজি কটেজের কর্তৃপক্ষকে তিনবার নোটিশ দিয়েছেন; বড় জানতে ইচ্ছা করে, আর অন্যসব রেস্টুরেন্টের কর্তৃপক্ষদের কবার নোটিশ দিয়েছেন স্যার? আপনারা হয়তো বলবেন নিন্দুকরা সবসময়, সবকিছুই বাঁকা নজরে দেখে, কিন্তু এটি একটা অ্যাকসিডেন্ট, এ নিয়ে অযথা ঘুরিয়ে কথা বলা কি, সমচীন?? স্যার জানি অ্যাকসিডেন্ট বলেকয়ে আসে না। তবে আপনাকে একটু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, শ্যামলীর কৃষি মার্কেটের আগুন কি অ্যাকসিডেন্ট? বঙ্গবাজারের আগুন কি দোকানদারদের অসতর্কতার ফলশ্রুতি? আজ যেখানে আপনার হাতিরঝিল, সেখানকার পুরো বস্তি পুড়ে যাওয়াটাও কি ইলেক্ট্রিক শর্টশার্কিটের কারসাজি? এমনি শতবস্তি, নিমতলীতে রাসায়নিক গোডাউনের আগুন, চুড়ীহাট্টার অগ্নিবন্যা, বনানীর এফ আর টাওয়ারের বহ্নিশিখা, এইরুপ অ্যাকসিডেন্ট কি চলতেই থাকবে? এসবই কি এ্যাকসিডেন্ট? আর আপনার এই অ্যাকসিডেন্টের ফলে কত প্রাণ অকালে ঝরে যাচ্ছে একবার কি গণনা করেছেন? নিমতলীতে রাসায়নিক গোডাউনের আগুনে ১২৪ জন, চুড়ীহাট্টার অনলে ৭১ জন, বনানীর এফআর টাওয়ারে ২৭ জন আর এবার বেইলি রোডে ৪৬ জন অগ্নিদগ্ধ। আমাদের কিছুই করার নেই? একবার কি ভেবে দেখেছেন, আপনারা প্রায় সবাই, টাকা টাকা করে কেমন এক মরণনেশায় মেতেছেন! আর আপনাদের এই টাকার নেশায় কতশত নিষ্পাপ নিরীহ মানবসন্তান আত্মহুতি দিচ্ছে! হয়তো এই অর্থের লোভে গ্রিন কোজি কটেজের কর্তৃপক্ষ রেস্টুরেন্ট বন্ধ করতে চাননি। তারা ভেবেছেন, রেস্টুরেন্ট বন্ধ করলে এতগুলো কর্মচারী বেকার হয়ে পড়বে, তারচেয়ে যতদিন পারি রেস্টুরেন্ট চলুক, শেষমেশ দ্যেখা যাবে কী হয়। বেশি কিছু হলে প্রয়াত মাননীয় অর্থমন্ত্রীর বাতলে দেয়া পথ, স্পিডমানি দিয়ে ম্যানেজ করব। দেখুন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মহাপ্রয়াণের পর বাংলদেশে নৈতিকতার অবক্ষয় মহামারিরূপে ছড়িয়ে পড়েছে। তিন বছরের মেয়েশিশুটিও আপনার লালসার শিকার হচ্ছে। এ কোন মানষিকতা! শুনেছি ক্লাস সেভেনের মানে বার-তের বছরের ছাত্রীর সঙ্গে আদিরসাত্মক লালসা চরিতার্থ করছেন ভিকারুননিসা নূন স্কুলের তথাকথিত শিক্ষক মুরাদ। এ কোন পৈচাশিক খেলায় মেতে উঠেছেন আপনারা বীর বাঙালিরা। জানেন তো আপনারা আশ্রাফুল মাখলুকাত। সৃষ্টির সেরা জীব। এই যদি সেরা জীবের কা- হয়, তাহলে অন্য প্রাণিকুলের কী হবে? ভাবতে পারেন আপনারা কোথায় নেমে যাচ্ছেন! ধিক্ ধিক্! পুড়ে অঙ্গার হয়েছে মেয়েটি। জীবদ্দশায় আগুনের লেলীহান শিখা তাকে গ্রাস করে চিতার আস্বাদ পাইয়ে দিয়েছে। এখন সৃষ্টির সেরা জীব তরুণীটির লাশকে কবর দেব না কি আবার চিতায় তুলব এ নিয়ে শুরু হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের কর্ণধারদের মাঝে জাতীয় বিতর্ক! তরুণীটি এক মরণেই দুধরনের সৎকারের সন্মুখীন! বুয়েটের নাহিয়ান আমিন, লামিসা ইসলাম ছোট্ট দুবছরের বির্বণ পুতুল, কী করব কাকে বলব, এসব পাপের বোঝা কে বইবে? এসব পরিবারদের কাছে কোনমুখে আমরা দাঁড়াব, বলতে পারেন। আমরা যারা তথাকথিত বাংলাদেশের জাতির বিবেক, আমরা এয়ার কন্ডিশন রুমে বসে বরফ দেয়া ঠা-া চিল্ড বাতাস মেখে এসব অসঙ্গতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হব। জনগণকে বলব আবার তোরা মানুষ হ! কারণ আমরা জাতির বিবেক। আমরা যদি পথেঘাটে নেমে মিটিং-মিছিল করি তাহলে প্রশাসনের ডা-ার গুতায় জাতির বিবেক, ভূলুণ্ঠিত হবে। আমরা যারা বাংলাদেশের উন্নয়নে সারাবিশ্বে গর্বে বুক ফুলিয়ে হাঁটি আমরা কী করে ওইসব রাস্তাঘাটের ছেলেদের মতো পথে পথে ঘুরে প্রতিবাদ করে বেড়াই, তাহলে বিশ্বনেতারা আমাদের কী ভাববে! আমরা জাতির বিবেক সিসিসিপি, ডিপিডিপি, বিবিসিসিপি, আমাদের এর মাঝে না জড়ানোই ভালো। আমরা মাঝে মাঝে র্কাল মার্কস, ফ্রেডরিক এ্যঙ্গেলস, ভøাডিমির ইলিচ লেলিনের বুলি কপচাব আর সুযোগ বুঝে ওমরাহ হজ পালন করে দেশ ও জাতির জন্য রাব্বুল আলামিনের কাছে দুহাত তুলে মোনাজাত করব আর বলব, ‘এমন একটা ঝড় উঠুক, কোনোদিনও যেন কোনো রেস্টুরেন্টে আর আগুন লাগতে পারে না। এখন এমন মেঘ করুক, যেন মেঘ ছিঁড়ে কোনোদিনও এফ আর টাওয়ার আর জ্বলতে পারে না, জ্বলতে পারে না।’ জানেন পৃথিবীর সবচেয়ে নোংরা বেনিয়া ইংরেজ শাষণামলে, আমরা বলতাম ‘জননীর জন্ম ভূমিশ্চঃ স্বর্গাদপী গরিয়সী’। অথচ বর্তমান সমাজের নৈতিকতা মানবিকতার অবক্ষয় দেখলে মনে হয়, এদেশ আর আমার মা নয়, এদেশ স্বর্গাদপী গরিয়সী নয়, এদেশ-যেন কেমন এক মুত্যু উপত্যকা। পৃৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ গুণীজন উলিয়াম শেক্সপিয়র ১৫০০ শতাব্দীতে ম্যাকবেথ নাটকে লিখেছেন, ‘অষধং গু চড়ড়ৎ ঈড়ঁহঃৎু, ওঃ ঈধহহড়ঃ ইব ঈধষষবফ ঙঁৎ গড়ঃযবৎ ইঁঃ ঙঁৎ এৎধাব!’ ‘ও আমার দেশের মাটি, তোমাকে আর আমাদের মা বলতে ইচ্ছে করে না, বলতে ইচ্ছে করে তুমি আমাদের গোরস্থান!’

[লেখক: চলচ্চিত্রকার]

সম্প্রতি

আরও খবর