Friday, March 6, 2026
হোমমতামতউপ-সম্পাদকীয়টেকসই ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে জৈব সার

টেকসই ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে জৈব সার

সম্পর্কিত সংবাদ

আমরা প্রতিদিন বিশ্বব্যাপী বর্তমানে নিরাপদ খাদ্য এবং এর উৎপাদন ব্যাবস্থা ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে। দিন দিন দেশেও নিরাপদ খাদ্য উপাদন প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন লক্ষণীয়। অল্প সময়ে ও অল্প জায়গায় অধিক লাভের আশায় বর্তমানে কৃষকরা বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক সার ও কীটনাশক অধিক মাত্রায় ব্যবহার করে থাকে। এর কারণ হলো দেশের অধিকাংশ কৃষক জানেই না যে, রাসায়নিকের সারের কী ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া রয়েছে। তারা অনেকেই মনে করেন প্রচুর পরিমাণে জমিতে রাসায়নিক সার প্রয়োগ করলেই অধিক ফসল ঘরে তোলা সম্ভব। কিন্তু তাদের এই মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার প্রয়োগের ফলে প্রভাব পড়তে পারে মাটি, পানি, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য সর্বোপরি মাটির উর্বরতায়। তবে আশার কথা এই যে, বর্তমানে অনেক শিক্ষিত কৃষক এগিয়ে আসছে অর্গানিক ফসল উৎপাদন করতে। বলে রাখা ভালো এই যে, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের প্রিয় জন্মভূমিও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের দিকে নজর দিতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের জনসংখ্যা বর্তমানে ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার ৯১১ জন। এ বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ খাদ্যের, বিশেষ করে নিরাপদ খাদ্যের প্রয়োজন হয়। কারণ খাদ্য যদি নিরাপদ না হয় তাহলে সুস্থ সুন্দর একটা জাতির কথা চিন্তা করা আর বোকার স্বর্গে বাস করা একই সূত্রে গাঁথা। ভবিষ্যৎ সুস্থ সুন্দর একটা জাতির কথা মাথায় রেখে দেশেও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার প্রতি ব্যাপক জোর দেয়া হচ্ছে। আর এর একটি অন্যতম কার্যকর অনুশীলন হচ্ছে কৃষি খাতে জৈব সারের ব্যবহার উত্তর উত্তর বৃদ্ধি।

এখন ছোট করে একটু জেনে নেয়া যাক, জৈব সার কী? সাধারণ অর্থে যেসব সার কোনো জীবের দেহ থেকে পাওয়া যায় অর্থাৎ উদ্ভিদ বা প্রাণীর ধ্বংসাবশেষ থেকে পাওয়া সারের নামই জৈব সার। যেমনÑ গোবর সার, সবুজ সার, খৈল ইত্যাদি। গাছের প্রায় সব খাদ্য উপাদানই জৈব সারে থাকে। জৈব সার কার্বন সমৃদ্ধ, যা প্রাকৃতিকভাবেই উৎপন্ন হয়ে থাকে। জৈব সার মাটি ও উদ্ভিদের পুষ্টি সরবরাহ ও পুষ্টিগুণ বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি হওয়ায় তেমন কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই বললেই চলে। টেকসই ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে জৈব সারের গুরুত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি সাম্প্রতিক কৃষির জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত এবং বায়োডাইভার্সিটির বৃদ্ধির জন্য সহায়ক। জৈব সার ব্যবহারে বৃদ্ধি পায় মাটির গুণগত, জলসংগ্রহ, পুষ্টি সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণ এবং জৈব উৎপাদনের মাধ্যমে উন্নত খাদ্য সুরক্ষা প্রদান। এছাড়া জৈব সার ব্যবহারের ফলে স্বাস্থ্যবিধি ও পরিবেশের জন্য ক্ষতি কমে। সৃষ্টি হয় স্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং ভবিষ্যতের খাদ্য সুরক্ষা। মাটির জীববৈচিত্র্য হলো ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, কেঁচো ও মাটির মধ্যে বসবাসকারী বিভিন্ন উপকারী জীব। বিস্ময়কর তথ্য হলো উপরিস্তরের এক চা চামচ মাটিতে বহু প্রজাতির ৬০০ কোটির মতো অণুজীব বসবাস করতে পারে।

১৯৪৫ সালের ১৬ অক্টোবর জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রতিষ্ঠিত হয়। সমগ্র বিশ্বের মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যের জোগান, দারিদ্র্য ও পুষ্টিহীনতা দূর করার মাধ্যমে ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে এফএও কার্যক্রম শুরু করে। নিরাপদ খাদ্য বলতে স্বাস্থ্যকর এবং সুষম খাদ্যকে বোঝায়। অর্থাৎ জৈব্য পদ্ধতি ব্যবহার করে খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, বিপণন, প্রস্তুত ও পরিবেশন করা হয় তাকে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা বলে। নিরাপদ খাদ্য পুষ্টি ও সুস্বাস্থ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাছাড়া অনিরাপদ খাদ্য আমাদের শরীরে একদিকে যেমন রোগের কারণ অন্যদিকে তেমনি স্বাস্থ্যহানির কারণ হিসেবেও বিবেচিত। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার দেয়া তথ্য মতে, বিশ্বে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন মানুষ অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে ফুড পয়জনিং সহ ফুড ইনফেকশন সমস্যার সম্মুখীন হয়। এদের মধ্যে কমপক্ষে ৪২০,০০০ মানুষ বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে মারা যায়। আর এ সমস্যার একটি সহজ সমাধান হচ্ছে কৃষিতে জৈব সারের ব্যবহার উত্তর উত্তর বৃদ্ধি করা। কিন্তু অনেকের মধ্যেই একটা ভুল ধারণা লক্ষ্যনীয় যে, জৈব সারে তেমন কিছুই নেই, আর তা ব্যবহার করলে আশানুরূপ ফলাফল পাওয়া যাবে না। কিন্তু অতি আশ্চর্যের বিষয় এই যে, জৈব সারে মাটি ও গাছের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ১৭টি পুষ্টি উপকরণের সবগুলোসহ মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার দরকারি অণুজীবসমূহ বিরাজমান থাকে। বিশ্বের অনেক নামিদামি আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত প্রবন্ধগুলো বিচার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রতি টন জৈব সারের পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ (শুষ্ক নমুনা) পরিপক্ব গোবর সার, কেঁচো সার, মুরগির বিষ্ঠা আবর্জনা বা কিচেন মার্কেট কম্পোস্ট সারে ৩০-৭০ কেজি ইউরিয়া, ১৭-৯০ কেজি টিএসপি, ১০-৪২ কেজি এমওপি, ক্যালসিয়াম সালফেট ৩-১৩ কেজি, ম্যাগনেশিয়াম সালফেট ১.০-১.৬ কেজি, জিপসাম ১১-২০ কেজি।

এছাড়া অনুপুষ্টি সার হিসেবে, জিঙ্ক সালফেট ০.০৫-১.৮ কেজি, বোরিক এসিড ১৪৫-২৪০ গ্রাম, অ্যামোনিয়াম মলিবডেট ২৪-৯৫ গ্রাম, কপার সালফেট ৪০-৩৬৬ গ্রাম, মাঙ্গানিজ সালফেট ৩৫-৯৫ গ্রাম পাওয়া যায়। উক্ত উপাদানসমূহ ছাড়াও প্রতি গ্রাম জৈব সারে মোট ব্যাকটেরিয়া, অ্যাকটিনুমাইসিটিজ, ছত্রাক, এজোটোব্যাক্টর, রাইজোবিয়াম, ফসফেট সলিবুলাইজার, নাইট্রোব্যাক্টর থাকে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৮৮.২৯ লাখ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, ধান ছাড়া অন্যান্য ফসল চাষে প্রতি হেক্টর জমিতে গড়ে ৩ টন জৈব সার ব্যবহার করতে হবে। ধানের জমি, বাগান হিসেব করলেও দেশে জৈব সারের বাৎসরিক চাহিদা রয়েছে ১৮-১৯ মিলিয়ন টন। দেশে ৩৮টি নিবন্ধিত কোম্পানি ছাড়াও দেড় শতাধিক অনিবন্ধিত উদ্যোক্তা আছেন। সবমিলে উৎপাদন সক্ষমতা ১২-১৫ মিলিয়ন টন। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে দেশে এখন ২০-২২ হাজার কেঁচো সার উৎপাদক রয়েছে। এরা বছরে ২৫-৩০ হাজার টন কেঁচো সার উৎপাদন করে, যার বাজারমূল্য আনুমানিক ২০-২৫ কোটি টাকা, যা আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে। দেশে উঁচু, মাঝারি উঁচু ও মাঝারি নিচু মিলে ৭৫ ভাগ কৃষিজমি হয়। তাতে প্রতি হেক্টরে ১০ টন সাদামাটা হিসেবে, ৬০-৬২ মিলিয়ন টন (১০-১২ শতাংশ আর্দ্রতার ভিত্তিতে) চাহিদা রয়েছে। এসডিজি-২ ক্ষুধা নিবারণ এবং খাদ্যের প্রাপ্তি ব্যবস্থা উন্নত করা; সব ধরনের অপুষ্টির অবসান ঘটানো; কৃষি উৎপাদনশীলতা; টেকসই খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা এবং স্থিতিস্থাপক কৃষি পদ্ধতি। এসডিজি-২ বাস্তবায়নে কৃষিতে উত্তর উত্তর জৈব সারের ব্যাবহার বৃদ্ধি করতে হবে। খাদ্য ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানোর প্রতি গভীর মনোযোগ প্রদর্শন করতে হবে। কৃষিজমিতে জৈব সারের ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রাসায়নিক সারের ভর্তুকি থেকে ২৫ ভাগ জৈব সারের উৎপাদন ও প্রয়োগের জন্য দিতে হবে। এছাড়া দেশে জৈব সার উৎপাদনে বড়, মাঝারি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি ও তাদের কারিগরি-আর্থিক প্রণোদনা প্রদান, মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে কৃষি সৃম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একটি স্থায়ী কর্মসূচি থাকা, স্ব-উদ্যোগী তরুণদের সস্পৃক্ত করে জৈব সারের কারখানা গড়ে তোলা, বিপণন, সবাই স্তরে আইসিটি ও জিসিএস ব্যবহার করে জৈব সার প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং সর্বোপরি জৈব সারের মান উন্নয়নে আরও গবেষণা জোরদার করতে হবে। সর্বোপরি নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে জৈব সার ব্যবহার করতে সাধারণ জনগণকে আরও উৎসাহিত করতে হবে।

জৈব সার উৎপাদনে যেহেতু রাসায়নিক উপাদানের ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়ে না সেহেতু তা কোনো ধরনের বিষক্রিয়া প্রদর্শন করে না মানুষের স্বাস্থ্য কিংবা পরিবেশের ওপর। তাছাড়া জৈব সার ব্যবহার করে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করা গেলে তা বিদেশে রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। উন্নত দেশের মানুষ খুব বেশিই স্বাস্থ্য সচেতন। তারা তাদের খাদ্য তালিকায় অবশ্যই খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি সবার আগে গুরুত্ব দিয়ে থাকে, যা আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য অনেক বড় একটি সুযোগ হতে পারে। এর ফলে একদিকে যেমন দেশের অনেক বেকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে তেমনি অর্থনৈতিকভাবেও সমৃদ্ধির পথে অন্তত একধাপ এগিয়ে যাবে আমাদের প্রিয় স্বদেশ, পাশাপাশি পরিবেশেরও উন্নয়ন হবে। রেডিও, টেলিভিশন, পত্রপত্রিকায় ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে জৈব সারের গুরুত্ব নিয়ে ব্যাপক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। অধিকন্তু জৈব সারের ব্যবহার করে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করার মাধ্যমে দেশে জৈব কৃষির এক অপার সম্ভাবনা তৈরি হবে। এসডিজি ২০৩০ বাস্তবায়নে ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে জৈব সার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। পরিশেষে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে জৈব সারের ব্যবহার রূপকল্প ২০৪১ বা বাংলাদেশ ভিশন ২০৪১ ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত এবং উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে গুরত্বপূর্ণ অংশীদার হিসাবে কাজ করবে এটাই প্রত্যাশা।

[লেখক : শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়]

সম্প্রতি

আরও খবর