সব মানুষ সমান অধিকার, সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার হকদার। এমন মহান নীতি ও আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত মানবতা। অথচ এই মহান রীতি-নীতি, ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্ব আত্মীয়ত্ব বা সাম্যত্ব দিন দিন লোপ পেয়ে মানুষে মানুষে বর্ণ-ভেদ-বৈষম্য অস্পৃশ্যের মতো আচরণ করছে ও একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে, শ্রেণীতে শ্রেণীতে, জাতিতে জাতিতে স্বার্থের দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। ধনী-গরিব ছোট বড়, উঁচু নিচু ভেদাভেদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। মানুষ ধনে-জনে, বিদ্যা-বুদ্ধিতে, মযার্দা প্রতিপত্তিতে গর্বিত হয়ে অহংকার প্রকাশ করে, সমাজের গরিব দুঃখী, অসহায়, ব্রাত্যজন, অন্তোজ, দলিত-বঞ্চিত, অনগ্রসর, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, মানুষের ঘৃণা, অবজ্ঞা, বর্ণ-বৈষম্যের চোখে দেখছে। এমনকি চাষা-মূর্খ, দিনমজুর, কুলি, দলিত, হরিজন মুচি-চামার বলে তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছে।
মানুষের এই অমানবিক ব্যবহার জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মনে বেদনার সৃষ্টি করেছে। তাই এসব দলিত-বঞ্চিতদের প্রতি সহানুভূতিপূর্ণ কন্ঠে তিনি বলেন।
চাষা বলে কর ঘৃণা!/ দেখো চাষারূপে লুকায়ে জনক বলরাম এলো কি না! মানুষের জীবন জীবিকার জন্য বিভিন্ন কর্ম ও পেশা অবলম্বন করে। শিক্ষা অর্জন করে কেউ ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক, শিল্পী ও সাহিত্যিকরূপে সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। আবার কেউ বা চাষা-চাষি, কুলি-মজুর শ্রমিক অর্থাৎ কায়িক মেহনতি বা শ্রমজীবী পেশা গ্রহণ করেন। বিভিন্ন মানুষের গৃহীত পেশা বা কর্মের ওপর ভিত্তি তৈরি হয়েছে। সেই শ্রেণী বিভেদের সুযোগ নিয়ে সমাজের উঁচুতলার মানুষেরা নিচুতলার শ্রমজীবী পেশাদার মানুষের কাছ থেকে তাদের সুখ-শান্তি সমৃদ্ধির মান সম্মান আহরণ করে। শ্রমিকদের রক্ত ক্ষয় করা শ্রমের বিনিময়ে আপন আভিজাত্য বজায় রাখে। শ্রমিকদের যন্ত্র হিসাবে ব্যবহারকরে সীমাহীন সম্পদ জড়ো করে তোলে কিন্তু তাদের কথা ভুলে যায়।
ভুলে যায় তাদের মৌলিক অধিকারের কথা ভুলে যায় দলিত-বঞ্চিত শ্রমিকরা তাদের মতো সেও মানুষ। অথচ এই শ্রমিকেরাই তাদের সবটুকু জীবনী শক্তি দিয়ে তিলে তিলে নিঃশেষ করে উৎসর্গ দিয়েছে বিত্তশালীদের সুখের জন্য। আর বিনিময়ে তাদের সঙ্গে স্বাভাবিক মানবীয় সহানুভূতি সুচক ব্যবহারটুকু করার প্রয়োজনেও ধনীরা মনে করে না। একটি পশুকে তারা ভালোবাসলে ও দলিত-বঞ্চিতদের নিকৃষ্ট জীবের থেকেও অস্পৃশ্য ও অপবিত্রভাবে এবং তাদের সঙ্গে সেই রকম আচরণ বা ব্যবহার করে এবং কটূক্তি বলে হেয়প্রতিপন্ন করে।
পথে-ঘাটে হাটে-বাজারে মাঠে-ময়দানে, যানবাহনে চলা-ফেরা ও ওঠানামা করার সময় পর্যন্ত মানুষের প্রতি মানুষের ছোটদের প্রতি বড়দের দুর্ব্যবহার হর-হামেশাই চোখে পড়ে। সমাজের বিত্তবান মানুষ মহাজন সেজে সমাজের দরিদ্র, অসহায় ও দুর্বল মানুষদের সুযোগ নিয়ে আর্থিক সাহায্যের উসিলায় তস্করের মতো তাদের যথাসর্বস্ব অপহরণ করেই ক্ষান্ত হয় না, জোঁকের মতো তাদের সমস্ত প্রাণশক্তি শোষণ করে শেষপর্যন্ত তাদের যথাসর্বস্ব কেড়ে নিয়ে ধড়িবাজ, ধূর্তরা যথাসর্বস্বের মালিক হয়ে বসে।
মেহনতি মানুষের প্রতি ধনগর্বী অভিজাত মানুষের অকথ্য অত্যাচারে কবি নজরুল ইসলাম অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছেন। অত্যাচারিত-নির্যাতিত, প্রবঞ্চিত, দলিত-বঞ্চিত, অন্তোজ শ্রমিক শ্রেণী মানুষদের প্রতি সহানুভূতিতে ও সমবেদনায় তার চোখের পাতা দিয়ে অশ্রু ঝড়েছে। তাই তিনি অন্তর দিয়ে দিনমজুর, শ্রমিক, দলিতদের মুক্তি কামনা করেছেন। এমতাবস্থায় আশাভরা কন্ঠে দলিত-বঞ্চিতদের স্বজন কবি নজরুল ইসলাম বলেন, আসিতেছে শুভদিন/ দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ!
[লেখক : আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]



