Thursday, March 5, 2026
হোমমতামতউপ-সম্পাদকীয়হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় : জ্ঞানের তাজমহল

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় : জ্ঞানের তাজমহল

সম্পর্কিত সংবাদ

২০ ডিসেম্বর ২০২৩। বাসস্ট্যান্ড থেকে তিনটার গাড়িতে উঠলাম। এমনিতে নিউইয়র্ক জ্যামের শহর। অফিস ছুটি না হওয়ায় মোটামুটি মিনিট বিশেকের মধ্যে বাস দুরন্ত গতিতে টানেল দিয়ে ছুটে চলল।

শহর পেরিয়ে দিগন্ত বিস্তৃত গ্রামীণ জনপদ। দু’পাশে শুধু শীতের ঝাপটায় জুবুথুবু পাইন গাছের সারি। দশ বা পনেরো মাইল পর দেখা মেলে একটি গ্রাম। প্রত্যেকটি বাড়ির সামনে কমপক্ষে দুটোর বেশি গাড়ি ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকে। বাড়িগুলো যেহেতু আন্ডারগ্রাউন্ডে একতলা এবং উপরে দুটো ফ্লোর সেহেতু প্রতি বাড়িতে দু’টো করে পরিবার থাকে। প্রাইভেট কার ছাড়া আমেরিকায় বাস করা প্রায় অসম্ভব। প্রাপ্ত বয়স্ক সব মানুষ নিজেই ড্রাইভ করে। আমাদের মতো ড্রাইভার রেখে গাড়ি চালানো আর্থিক কারণেই সম্ভব হয় না।

পাতাঝরা পাইন গাছগুলোর ডালপালায় বরফের বসবাস। ৬০ লাখ বছর আগে একটি বিশাল গ্রহাণু মেক্সিকো উপকূলে আঘাত হানায় অনেক দিন ধরে সূর্যের আলো পৃথিবীতে পৌঁছতে পারেনি। গাছগুলো মরে গেছে। ঘাস জন্মায়নি। বহু প্রাণী মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে। ডাইনোসর অনাহারে অর্ধাহারে মৃত্যুবরণ করলেও তেলাপোকা টিকে গিয়েছিল এবং আজও টিকে আছে। আমেরিকার ঘরের মধ্যে হিটার, গাড়িতে হিটার, ট্রেনে হিটার। বিদ্যুৎ আবিষ্কারের আগে শীতপ্রধান আমেরিকান অঞ্চলে কাঠের চুলা জ¦ালিয়ে ছয় মাস কাটানো ‘অ্যা মাদার ইন ম্যানভিল’ গল্পে কিনান রলিংস চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন।

বস্টন শহরে ঢোকার আগে চোখে পড়লো গরিবী জীবন। ছোটখাটো ঘরবাড়িতে ঠাসা। আমেরিকান গরিবী জীবন আমাদের জীবনের চেয়ে অনেক উন্নত। চার ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে গেলাম বোস্টন বাসস্ট্যান্ডে। রিসিভ করার জন্য দাঁড়িয়ে ছিল আমার এক কাজিন। মিনিট দশেকের মধ্যে পৌঁছে গেলাম ক্যামব্রিজ হাউজিংয়ের ১০৪নং বাড়িতে। তার স্ত্রীও এসে পৌঁছল কর্মস্থল থেকে। কিছু একটা কোনোমতে খেয়ে বিদ্যুৎগতিতে বেরিয়ে গেল। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ফিরে এলো আমাদের জন্য ফুল জ্যাকেট নিয়ে। ওই ফুল জ্যাকেট না হলে শীতে মারাই যেতাম।

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেট ম্যাসাচুসেটস। চার্লস নদীকে ঘিরে বেড়ে উঠেছে বন্দর নগরী ও রাজধানী বোস্টন। ব্রিটিশরা আটলান্টিকের এই বন্দর দিয়ে আমেরিকায় বসতি শুরু করেছিল বলে এর আদি নাম নিউ ইংল্যান্ড। প্রায় গোটা আমেরিকাতে ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপনে সমর্থ হয়। ভারতবর্ষের মতো পৃথিবীর যেখানেই ব্রিটিশ গেছে, সঙ্গে নিয়ে গেছে প্রযুক্তি, সাহিত্য, শঠামি, ধুর্তামী ও মুক্তবুদ্ধি। ভারতবর্ষে ধুর্তামী ও উন্নত অস্ত্র দিয়ে সিরাজদ্দৌলা ও টিপু সুলতানকে পারজিত করেছে। অস্ত্রে¿র জোরে দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্রিটিশ রাজত্ব কায়েম করেছিলো। কিন্তু বিনা যুদ্ধে আমেরিকায় ব্রিটিশ রাজত্ব কায়েম করেছিল। আমেরিকায় যেহেতু প্রতিষ্ঠিত কোন রাজশক্তি ছিল না সেহেতু ব্রিটিশ, স্প্যানিশ, ফরাসি ও পর্তুগিজরা দলে দলে আমেরিকায় গিয়ে বসতি গড়তে থাকে। বসতি গড়ার প্রতিযোগিতায় ব্রিটিশ রেড ইন্ডিয়ানদের বিতাড়িত করে অরণ্য ও দুর্গম এলাকার দিকে। সপ্তদশ শতকের ধনী ব্রিটিশ দখল করতে থাকে একের পর এক বিস্তীর্ণ এলাকা। জন হার্র্ভার্ডের বাবার নাম রবার্ট হার্ভার্ড এবং মায়ের নাম ক্যাথারিন। হার্ভার্ড ক্যামব্রিজ থেকে গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পর লন্ডনে প্লেগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ায় ক্যাথারিন ছেলেকে অভিবাসী ব্রিটিশদের দেখাশোনার জন্য (মিনিস্টার) যাজক হিসেবে বোস্টনে পাঠিয়ে দেন।

বোস্টনে একদিন ১০-১২ জন বন্ধু নিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলেন। হার্ভার্ড একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রস্তাব উত্থাপন করেন এবং উপস্থিত অন্যদের চাঁদার সংগ্রহ দাঁড়ায় ৩০০ পাউন্ড। তাৎক্ষণিকভাবে হার্ভার্ড তার অর্ধেক সম্পত্তি বিক্রি করে ১৭০০ পাউন্ড দেয়ার ঘোষণা দিলে উন্মোচিত হয় জ্ঞানের নতুন দিগন্ত। ১৬৩৬ সালে জন হার্ভার্ডের প্রতিষ্ঠিত কলেজটি আজ পৃথিবী বিখ্যাত সরকারি হার্ভার্ড বিশ^বিদ্যালয়। স্বল্প পরিসরে বিশ^বিদ্যালয়টির বহু কৃতিত্বের বর্ণনা দেয়ার সুযোগ কম। শুধু বলে রাখি আজ পর্যন্ত ১৬৮ জন নোবেল পেয়েছেন এই প্রতিষ্ঠান থেকে।

একুশ ডিসেম্বর আমার কাজিন তুলে নিল গাড়িতে। তার স্ত্রী তখনো হার্ভার্ডের কর্মস্থলে। প্রথমেই গেলাম হার্ভার্ড লাইব্রেরি সিস্টেমের অন্যতম, হ্যারি এলকিনস ওয়াইডনার মেমোরিয়াল লাইব্রেরিতে। ওয়াইডনার পরিবার আমেরিকার সবচেয়ে ধনী দুটো পরিবারের মধ্যে একটি। হ্যারি ১৯০৭ সালে হার্ভার্ড থেকে গ্র্যাজুয়েট হন। এবার ওয়াইডনার পরিবারের আকাশের কোণায় দুর্ভাগ্যের আনাগোনা শুরু। ১৯১২ সালে হ্যারি অভিশপ্ত টাইটানিক জাহাজের প্রথম অভিযাত্রায় ছিলেন একজন পর্যটক। জাহাজটি ডুবতে ডুবতে বহু মানুষ লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করে প্রাণে বাঁচাতে পারলেও হ্যারির সলিল সমাধি ঘটে। এরপর ওয়াইডনার পরিবার হার্ভার্ডে হ্যারি মেমোরিয়াল লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিলে কর্তৃপক্ষ সে প্রস্তÍাব সাদরে গ্রহণ করে। লাইব্রেরিতে কলা এবং সমাজবিজ্ঞান অনুষদের সাড়ে তিন লাখ বই ডিসপ্লেতে দেয়া আছে এবং তিন লাখ বই আছে আন্ডারগ্রাউন্ডে সংরক্ষিত অবস্থায়। লাইব্রেরি ভবনটির স্থাপিত শৈলীতে গ্রিক স্থাপত্যের প্রাচীন কাঠামো এবং অভ্যন্তরে ব্রিটিশ ডিজাইনের সংমিশ্রণ ঘটানো হয়েছে।

হ্যারি মেমোরিয়াল লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে ভাবছিলাম সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসার পরিধি কি? এটার কি কোন শেষ আছে। হ্যারির মা ইলেনর ওয়াইডনার শর্ত দিয়েছিলেন এই লাইব্রেরি ভবন নির্মিত হবে আমার মনের গহীনে আঁকা আর্কিটেকচার অনুযায়ী। ১৬ জুন ১৯১৩ ভিত্তিপ্রস্তর স্থ’াপনের মধ্য দিয়ে শুরু নির্মাণ কাজ এবং ২৪ জুন ১৯১৫ হ্যারির মা ইলেনর ওয়াইডনার চাবি হস্তান্তর করেন বিশ^বিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট লাউএলের হাতে।

একটি জাতি সামনের দিকে যায় তার জ্ঞান দিয়ে। নবম শতাব্দীর দিকে মুসলিম মনীষীরা যে রেঁনেসার জন্ম দিয়েছিল তা আত্মস্থ করেছিল ফরাসিরা ১০৪৫ সালে প্যারিস বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। ব্রিটিশরা আত্মস্থ করেছে ১০৯৬ সালে অক্সফোর্ড বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তী ছয়শ বছর গোটা বিশে^ সাহিত্য, শিল্প ও বিজ্ঞানে নেতৃত্ব দিয়েছে ব্রিটিশ ও ফরাসিরা। সপ্তদশ শতক থেকে আমেরিকা আত্মস্থ করতে শুরু করে পৃথিবীর সব জ্ঞান-বিজ্ঞান। আমেরিকার আজকের প্রগতি, মুক্তবুদ্ধি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মূলে রয়েছে নামকরা বিশ^বিদ্যালয়ের গগণচুম্বী সব সাফল্য। এগুলোর মধ্যে হার্ভার্ড বিশ^বিদ্যালয় শুধু আমেরিকাই নয়, এটি বিশ^সেরা। হ্যারি ওয়াইডনারের স্মৃৃতিতে তৈরি করা লাইব্রেরিটি যেন জ্ঞানের তাজমহল। এই লাইব্রেরিতে ঢুকে অনুভব করতে চেষ্টা করেছি কত জ্ঞান এখানে লুকিয়ে আছে। আসলে তা অনুমান করাও অসম্ভব।

[লেখক : আইনজীবী, আপিল বিভাগ]

সম্প্রতি

আরও খবর