Thursday, March 5, 2026
হোমমতামতউপ-সম্পাদকীয়নদী, বৃক্ষ এবং মানুষ

নদী, বৃক্ষ এবং মানুষ

সম্পর্কিত সংবাদ

খেয়াল করে দেখবেন যেখানে নদীময় অঞ্চল সেখানে ভূমি খুব পরাধীন। যদি ভূমি কখনো অহংকার করে তখন নদী তাকে গ্রাস করে। আবার উল্টোও ভাবা যায়Ñ ভূমিকে বেশি ভালোবেসে নদী তার বক্ষে নিয়ে যায়।

এমন নদীর জয় থাকতে থাকতেই আবার ভূমি অঞ্চল এসে যায়। সেখানে নদী দুর্বল। এঁকে-বেঁকে নদী কোথাও সরু আবার কোথাও বৃহৎ।

প্রকৃতির এ চিহ্নগুলো আমাদের জীবনের সাথেও প্রচ- রকম মিল। নদী কোথাও ভূমিকে ছাড় দিয়ে আবার কোথাও ভূমি নদীকে আটকে রেখেছে। নদীর তলদেশে সামান্য একটু বাধা পেলেও সেখানে বালি আর পলি পড়তে পড়তে চর জেগে ওঠে। উল্লাস করে ভূমি। নদীকে বলে তুমি পারলে আর কই। দেখো তোমার বুকের উপর এখন আমার প্রাধান্য। আস্তে আস্তে একটা দুটো ঘাস, বড় বৃক্ষ, মানব বসতি তারপর দ্বীপ হয়ে পুরো অঞ্চল বিস্তার। নদীও সহ্য করে যায়। নদী ভাবে তুমি চর আছো বলেই তো আমার বয়ে চলা… বৃক্ষ আর বৃক্ষের স¤পর্ক!

একই সঙ্গে অনেক বৃক্ষ দাঁড়িয়ে থাকে। কিছু জায়গা আছে একই বৃক্ষ ছেয়ে রাখে পুরো জায়গায়। মূলত তখন সৃষ্টি হয় বৃক্ষের রাজত্ব। ওই জায়গাটুকু তাদের। তখন মনের সুখে তাদের জীবনটা তারা কাটায়। একে অপরের সাথে কথা হয় বেশি, দেখা হয় ঘুমের পর এবং আলোচনা হয় তাদের দৈনন্দিন কাজ নিয়ে। বৃক্ষের নিজেদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হলো তারা কোন মানুষকে ছায়া দিয়ে আনন্দ পায়।

একজন লোক প্রতিদিন চুরি করে। সে এসে বৃক্ষের ছায়াতলে চুরি করা টাকা গুনে। এক বৃক্ষ আরেক বৃক্ষের দিকে তাকায়। চুরি করা টাকাগুলো যার তার হিসাববিহীন টাকা থেকে এই কয়েকটা টাকা আনার পর সে কিছু জানেই না। এই লোকটির চুরি করা টাকায় বাঁচে মা, রোগাক্রান্ত ঘরের বউ।

বৃক্ষরা খুব চিন্তায় পড়ে যায়। ওদের হিসাব মিলতে চায় না। ওকে কিভাবে ছায়া দেবে। তারপর একজন আরেকজনকে বলে- মনে করে দেখ সকালে কে ছায়া নিতে এসেছিলো?

তখন ওই বৃক্ষের মনে ভেসে ওঠে নিদারুণ চিত্র! সারা রাত ধর্ষণের পর একটি মেয়ের মৃত্যু হয় এই বৃক্ষেরই কাছাকাছি। তারপর যে কজন ছিলো সবাই এসে এখানে আমাদের ছায়ায় বসেছে। কী বিভৎস ছিলো প্রতিটি মানুষের চেহারা। তোর গোড়াতেই তো কবর দিয়েছে মেয়েটিকে।

ওই বৃক্ষটির প্রচ- রকম জ্বালা শুরু হয়। বলে- আমার শরীরেও এই দুঃখীর রক্তগুলো প্রবাহমান হবে! পাশের বৃক্ষ বলে যাদের আমরা ছায়া দিতে বাধ্য হয়েছি তারা তো পাপি ছিলো। তাদের ছায়া দিতে পারলে মায়ের ওষুধের জন্য চুরি করা মানুষটিকে ছায়া দিতে পারবো না?

পাশের আরেক বৃক্ষ বলে- চোর তো চোরই। তারে ছায়া দেয়ার দরকার নেই। তখন আরেকটি বৃক্ষ বলে এমন একটা ভাব যেন পাপিরা বইলেই তরা ছায়া না দিয়া উইঠা যাইতে পারবি।

যে গাছটির নিচে ধর্ষিতাকে পুঁতে রাখা হয়েছিলো ও কাঁদতে শুরু করে। বিধাতার কাছে প্রশ্ন করে এমন নির্বোধ একটা জীবন আমাদের কেন দিলে তুমি ?

পাশের বৃক্ষটি বলে নির্বোধ বলছো কেন? উল্টো করে ভাবো। তোমার বয়স যদি পঞ্চাশের অধিক হয় তবে তুমি কতটি মানুষের রক্ত নিয়ে বেঁচে আছো? তোমার গোড়ায় বা আশপাশে কত ভালো মানুষ শুয়ে থেকে তাদের রক্ত তোমাকে দিয়ে গেছে। চিন্তায় পড়ে যায় বৃক্ষটি। জীবনের হিসাব মেলানোর চেয়েও ভাবনার সাগরে ডুব দিয়ে ভাবতে থাকে রহস্যময় পৃথিবীর গল্প!

বিকাল গড়িয়ে আসে। একজন সাদাসিধে লোক এসে বসে বৃক্ষ তলে। বৃক্ষের শিকড়ে থেকে একটু সরে গিয়ে বৃক্ষের দিকে তাকিয়ে বলে কেউ আমার কষ্ট নিলো না, তোর গায়ে চাপ দিয়ে বসে আর লাভ কী?

শীতল বাতাসে বৃক্ষরা সবাই মিলে লোকটিকে ভরিয়ে দেয়। যাওয়ার সময় সৃষ্টিকর্তাকে লোকটি ধন্যবাদ দিয়ে বলে প্রকৃতি তো আমাকে নিরাশ করেনি। বৃক্ষরাও খুশি হয়ে যায়। সব বৃক্ষরাই বলে দেখছিস এই লোকটিকে ছায়া দেয়া নিয়ে আমাদের কোনো দ্বন্দ্ব নেই। ও যদি মারাও যায় আমরা যে কেউ আমাদের পাশে ওর সমাধি নিতেও চাই।

রাত নেমে আসে। সারা দিনের ঘটনাগুলো বলতে বলতে বৃক্ষদের খাবারের সময় হয়। তাদের সামনে ঘটে যাওয়া রাতের ঘটনাগুলো চোখের সামনে আবার ভেসে উঠতে শুরু করে। এরই মধ্যে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে একজন এসে বসে বৃক্ষ ঘেঁষে। হঠাৎ কেউ লাইট মারার সাথে সাথে দৌড় দেয় লুঙ্গি আধা ধরা অবস্থায়ই। বৃক্ষরা সাক্ষী হয় লুকিয়ে কাজ সারারও।

চলে বৃক্ষ জীবন। অনেক বৃক্ষ এর সাথে সাথেই আরেক বৃক্ষকে মাথা তুলে দাঁড়াবার জন্য বুক পেতে দিয়ে রাখে। আমরা যাদের আগাছা বলে ছাটি বৃক্ষ তাদের উপরে তুলে দেয়।

তবে বৃক্ষ যে ইচ্ছে করলে অন্য বৃক্ষকে তুলে দেয়া বন্ধ রাখতে পারে তার বড় উদাহরণ ছায়া। ছায়া দিয়ে অন্য বৃক্ষের বড় হওয়াও বন্ধ করে দেয় কোনো কোনো বৃক্ষ। এমনটা হয় প্রকৃতির প্রতিশোধের জন্যই।

যাই হোক, সম্পর্ক মানেই একে অন্যের সাথে নানান বিষয়ের সংমিশ্রণ। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান মানুষের গোপনীয়তা দেখে এবং তাদের নিজেদের গোপনীয়তাও জানে। এখানেই প্রকৃতির সাথে মানুষের ভিন্নতা।

মানুষে মানুষের সম্পর্ক বিচিত্র। প্রশ্নাতীতভাবে প্রকৃতির মতোই সম্পর্কের মাত্রা এখানে ওঠানামা করে। মানুষ বুঝে স¤পর্ক করে বলে ব্যবধানটাও বেশি থাকে। যেক্ষেত্রে যার প্রত্যাশা বেশি থাকে সেক্ষেত্রে মানুষ বেশি সম্পর্কের ওঠানামা করে।

সম্পর্ক কখনো সমানভাবে বহমান থাকে না। ছাড় দেয়া ছাড়া সম্পর্কের ক্ষেত্র কখনই সুন্দর নয়। বরং সম্পর্ক মানেই হলো ছাড় দেয়া। সহ্য আর সম্পর্ক দুটো প্রকৃতির উদাহরণ কিন্তু মানুষে মানুষে সম্পর্ক হলো ছাড় দেয়া, নিজেকে সমর্পণ করা! যে যত বেশি ভালো চিন্তা করতে পারবে- সম্পর্ক নিয়ে সে তত বেশি জনপ্রিয় হবে। বটবৃক্ষ, পদ্মা, মেঘনা, যমুনার প্রশস্ত বক্ষও তো তাই বলে।

[লেখক : রসায়নবিদ]

সম্প্রতি

আরও খবর