শাহ আবদুল করিমের একটি ছবি আছে আমার পড়ার টেবিলে। উদাস শাহ করিম তাকিয়ে আছেন দিগন্তের পানে। নির্মোহ দৃ’ি। বড় মায়াময়। পার্থিব জগতে থেকে চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। অসীম দিগন্তের পানে তাকিয়ে মহাজনের সৃ’ি রহস্য নিয়ে গভীর চিন্তায় যেন মগ্ন। বিজ্ঞানীরা যেমন প্রকৃতির ধ্যান করেন, দার্শনিক-বাউলেরাও মগ্ন থাকেন সৃ’ির বিস্ময় নিয়ে। দেহ নামক কল গাড়ি নিয়ে তাদের ভাবনা ভিন্নতর। তারা সৃ’ির রহস্য উন্মোচন করতে গিয়ে স্র’াকে খুঁজেন।
‘চলে গাড়ি হাওয়ার ভরে/আজব কল গাড়ির ভিতরে/নিজে থেকে চাকা ঘোরে/নিজে থেকে চাকা ঘোরে/সামনে বাতি জ্বলে তার।’
এই যে কলের গাড়ি নিয়ে ভাবনা, গভীর ভাবনাই তাদের সাধনায় মগ্ন করে। এই সাধনার মধ্যে বিন্দু মাত্র অসুন্দরের স্পর্শ নেই। স্রষ্ঠার সৃ’িতে বিস্ময়াভূত তার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃ’ি। লোভ, লালসা, হিংসা, ঘৃণাসহ ষড় রিপুর কোন রিপু তাদের অন্তরে প্রবেশ করতে পারে না। মাঝে মাঝে মনে হয় এই অপূর্ব মূল্যবোধ, ভাব, ভাবনা, জাগতিক লোভকে পরিহার করার এই যে দর্শন সেই দর্শনের কথা শুনে শুনে বাঙালিদের বেড়ে ওঠা, তারপরও প্রকৃত অর্থে আমাদের মানুষ হওয়ার সাধনার কোন আন্তরিক ইচ্ছা নেই। লালন যখন বলেন,
‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে/লালন বলে জাতের কি রূপ/দেখলাম না এই নজরে।’
এরকম মানবিক বাণী শুনে আমরা ‘জাতের নামে বজ্জাতী’ করে যাই কী করে। ধর্মের মানবিক উপাদানকে ছুড়ে ফেলে ধর্মের খোলসকে ধর্ম ভেবে আমরা হিংস্র হয়ে যাই। যে মানুষ লালনের গান অনুধাবন করতে পারে সে মানুষ সত্য, সুন্দরের পূজারী না হয়ে অসত্যকে ধারণ করে কী ভাবে। জাতিগতভাবে আমাদের এই যে ‘দ্বৈত মান’ ইংরেজিতে যাকে বলে ডাবল স্ট্যান্ডার্ড তাকে কী বলা যায়? জানি না।
নকশীকাঁথার মাঠে একটি গাজীর গানের ব্যবহার দেখি আমরা। এই গানে যে বাণী ব্যবহার করা হয়েছে পৃথিবীতে এরকম বাণী খুব উচ্চ স্তরের দার্শনিকদের মুখেও আমরা কম শুনি। ভাবলে অবাক হতে হয়, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে দূরে থেকেও কী করে একজন গীতিকবি বলেন,
‘মত্স চেনে গহিন গম্ভ পঙ্খী চেনে ডাল; মায় সে জানে বিটার দরদ যার কলিজার শ্যাল! নানান বরণ গাভীরে ভাই একই বরণ দুধ; জগৎ ভরমিয়া দেখলাম একই মায়ের পুত। (গাজীর গান- নকশীকাঁথার মাঠ, নবম পর্ব)’। আহা এরকম মানবিক বাণী বিশ্ব সাহিত্য দর্শনে খুব বেশি কী আছে?
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কী আমাদের একটি কাঠামোতে ধীরে ধীরে বন্দি করে ফেলছে? এই বন্দিত্বের মুক্তি প্রয়োজন এ কথাটি যদি আমি বলি, জগত সংসারের সকল বিদ্বজ্জন (প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষিত) হৈ হৈ করে উঠবেন। বৈচিত্র্যের মধ্যে সৌন্দর্যের যে এই বাণী, যা নিয়ে হাজার হাজার দার্শনিক অজস্র অভিসন্দর্ভ রচনা করছেন, সব রচনার যে বার্তা, সে বার্তা কী আমাদের গাজীর গানের অনানুষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত দার্শনিক উচ্চারন করে যাননি। সমস্ত পৃথিবীজুড়ে মানুষ আবার কী মনুষ্যতের বাণী শোনার জন্য শিক্ষার প্রচলিত কাঠামোকে ভাঙ্গার চিন্তা করবে। কাঠামোবদ্ধ শিক্ষা জীবন, জগতের কাছ থেকে কী আমাদের দূরে সরিয়ে দিচ্ছে? এরকম ভাবনাকে অনেকেই হয়তো বিকৃত, মানসিক বৈকল্যের কারণ থেকে সৃষ্ট ভাবনা বলতে পারেন। তবে ভরসা করতে পারেন পৃথিবীর অতি সংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে আরও অপ্রতিষ্ঠানিক করা যায় কী না, আমি সে বিষয়ে চিন্তা করার কথা বলছি। কাঠামোকে ভেঙ্গে শিক্ষার উদ্দেশ্য সফল করে তোলার জন্য এরকম ভাবনা। কাঠামোবিহীন শিক্ষা অনেকটা সীমান্তহীন, বাধাহীন জ্ঞান চর্চার মতো ভাবা যায়। কাঠামোহীন শিক্ষা মুক্ত ভাবে ভাবার যে স্বাধীনতা দেয় সুসংগঠিত কাঠামো বন্দি শিক্ষা আমাদের কী ঠিক সেভাবে দিতে পারছে, সে বিষয়টি নিয়ে ভাবা বোধ হয় অপরাধ নয়। সক্রেটিস থেকে শুরু এরিস্টোটল, প্লেটো হয়ে পৃথিবীর তাবৎ দার্শনিক, মরমী সাধক আমাদের লালন, হাছন, রবীন্দ্রনাথ নজরুল কতটুকু কাঠামো বন্দি হয়ে জ্ঞান অর্জন করেছেন তা ভাবলেই ভিন্ন ধরনের জ্ঞানচর্চার পথ হয়তো খুলে যাবে। সব ভেঙ্গে খান খান করে দেয়ার কথা আমি বলছি না। ভাঙ্গার আগে গড়ার কথাও চিন্তা করতে বলছি।
আমাদের মরমী কবিরা মুক্তভাবে প্রকৃতির সাথে বিচরণ করা মানুষ। মূলত প্রকৃতির সাথে মিথষ্ক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের শিক্ষা। প্রকৃতি তাদের শিক্ষক কিংবা গুরু। তারা প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনে গভীর ভাবে মগ্ন থাকতেন, তীক্ষè দৃষ্টি থাকতো প্রকৃতির সন্তানদের আচরণের প্রতি। শিক্ষিত মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী তারা ছিলেন, অশিক্ষিত, বাউন্ডুলে। আজ যারা লিঙ্গ বৈষম্য নিয়ে নানা প্রশ্ন উত্থাপন করছেন পশ্চিমের দেশগুলোর বৈষম্যের কথাগুলোর প্রতিধ্বনি তুলছেন, শুভবুদ্ধি সম্পন্ন সব মানুষেরা কী লালনের গান গভীর ভাবে শোনার অবকাশ পেয়েছেন। তারা গান শুনেছেন কিন্তু এর মরমে প্রবেশ করেননি কিংবা করলেও নিছক সঙ্গীতের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
লালন যখন বলেন, ‘সুন্নত দিলে হয় মুসলমান/নারীলোকের কি হয় বিধান। /বামন চিনি পৈতে প্রমাণ/বামনী চিনি কি করে। ‘প্রশ্নগুলোর সাথে প্রচলিত লৈঙ্গিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে লালনের প্রশ্নকে তারা কোনভাবেই বিবেচনা করেননি। শতাধিক বছর পূর্বে মাঠে ঘাটে ঘুরে ফেরা স্বভাব দার্শনিক এরকম প্রশ্ন কী করে উত্থাপন করেন এ কথা ভেবে বিস্মিত হওয়া মানূষের সংখ্যা খুব কম। সব কিছু এড়িয়ে যাওয়া কিংবা উড়িয়ে দেওয়া গৌরবোজ্জ্বল অতীতকে অবজ্ঞা করা মানুষের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।
চ-ীদাস (১৩৭০-১৪৩০) মধ্যযুগের চতুর্দশ শতকের বাঙালি কবি। তিনি চৈতন্য-পূর্ব বাংলা সাহিত্যে বৈষ্ণব পদাবলী রচয়িতা হিসেবে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন। চন্ডীদাস যে বাণী বাঙালির মাধ্যমে বিশ্বজগতকে শুনিয়ে গেছেন সে বাণী আমরা কতোটুকু ধারণ করতে পেরেছি এবং বিশ্ব জগতে কতোটুকু ছড়িয়ে দিতে পেরেছি এ কথা ভাবলে আমাদের অযোগ্যতার কথা সামনে চলে আসে। মধ্যযুগে যখন সমগ্র বিশ্ব হিংসায় উন্মত্ত, রক্ত ঝরছে পৃথিবীর কোণে কোণে তখন আমাদের এই সুবর্ণ পলির দেশের কবি শুনিয়েছিলেন এক শাশ্বত কবিতা যার প্রাসঙ্গিকতা মনে হয় পৃথিবীতে চির দিন থেকে যাবে। চ-ীদাস হিংসায় উন্মত্ত পৃথিবীকে শুনিয়েছিলেন মানবতার সর্বশ্রেষ্ট বাণী- ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’ আমরা চ-ীদাস, মধ্য যুগের কবি আবদুল হাকিমের উত্তরাধিকার। স্বাভাবিক উত্তরাধিকারের ধারণাতে, আমরা কী আসলেই এসব আলোকিত মহৎ প্রাণের উত্তরাধিকার?
স্বাধীনতার প্রায় তিপ্পান্ন বছর পর আমরা যখন মূল্যবোধের সাধারণ মানসম্পন্ন জাতি গঠনে খুব বেশি সফল হতে পারিনি, আমাদের তাই ফিরে তাকাতে হবে গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের দিকে। আমরা হয়তো কাঠামোবদ্ধ শিক্ষায় অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছি বাঙালির মানবিকতার ঐতিহ্যকে কতোটুকু ধারণ করতে পেরেছি সে প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়। কাঠামো এবং অবকাঠামোর উন্নয়ন আর মানবিক গুণাবলীর উন্নয়ন কিন্তু সম-অর্থ বহন কওে না। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমাদের উন্নয়ন দক্ষিণ এশিয়ায় ঈর্ষা করার মতো; যথেষ্ট মানবিক গুণাবলী, সবক্ষেত্রে সুষম দৃষ্টি দেয়ার মতো নৈতিকতা অর্জন না করায় আমাদের সার্বিক উন্নয়নে অপর্যাপ্ততা থেকে যায়। সব চেয়ে বড় প্রশ্ন মানুষে মানুষে বৈষম্য বিলোপের জন্য আমরা কার্যকর কিংবা দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারিনি।
বৈষম্যের কারণে হতাশ মানুষদের জাতিগতভাবে বিভক্ত করা খুব সহজ। সাম্রদায়িকতা, মূল্যবোধের নিম্নযাত্রার জন্য অর্থনৈতিক বৈষম্য যে অনাকাংশে দায়ী এ কথাটি প্রমাণ করার জন্য প্রথাগত গবেষণা করার কোন প্রয়োজন নেই। অর্থনৈতিকভাবে বৈষম্যের শিকার মানুষকে যেমন দ্রুত সাম্প্রদায়িক করে তোলা যায় একইভাবে নানা অর্জনের জন্য ক্ষ্যাপা ষাঁড় হয়ে অনৈতিক কাজের দিকে ঠেলে দেয়াও যায় খুব সহজ। স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার পূর্বে বাঙালি ফিরে গিয়েছিলো চর্যাপদের যুগে। মধ্যযুগের সুবর্ণ সময়কে অন্তরে ধারণ করেছিলো, যখন ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করার জন্য চ-ীদাস, আবদুল হাকিম তৎপর ছিলেন। সেই সময়কে ধারণ করে আমরা মানবিক একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আধুনিক অস্ত্রের সামনে বাঁশের লাঠি নিয়ে লড়াই করতে পেরেছিলাম। যে কোন জাতিকে মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করতে অতীত ঐতিহ্য থেকে শক্তি ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হয়। তবে সবার প্রতি থাকতে হয় সমদৃষ্টি। আমরা কি পারবো লালন, হাছন, রাধারমনের ঐতিহ্যের বাংলাদেশকে মানবিক, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে। আমাদের পারতেই হবে, কেননা মানবিক একটি দেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেই ত্রিশ লাখ বাঙালি নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
[লেখক : প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]



