Thursday, March 5, 2026
হোমমতামতউপ-সম্পাদকীয়ভারতের নাগরিকত্ব আইন ঘিরে প্রশ্ন উঠছে কেন

ভারতের নাগরিকত্ব আইন ঘিরে প্রশ্ন উঠছে কেন

সম্পর্কিত সংবাদ

ভারতের আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের (২০২৪) ঠিক আগে সিএএ নিয়ে বিজেপির এই শোরগোল তোলার প্রথম ও প্রধান টার্গেট হলোÑ ভারতের সহ-নাগরিক মুসলমান সমাজ। তাদের ভারতের নাগরিকত্বহীন করবার জন্য দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক কর্মসূচি, হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শিবিরের সব থেকে বড় দানবীয় শক্তি সেই আরএসএস নিয়ে চলেছে। সঙ্ঘ ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার সময়কাল থেকে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে এটাকে রেখেছে। সেই অনুযায়ী সমস্ত ধরনের কর্মকা- চালাচ্ছে। সেটিকেই এখন নিজেদের অনুকূলে রাজনৈতিক পরিস্থিতির নিরিখে ব্যবহার করতে এই সময়টাকে বেছে নেওয়া।

এটাই হিন্দুত্ববাদী শক্তি শুরু করেছে পাকিস্তান আফগানিস্তান এবং বাংলাদেশ থেকে আগত মানুষদের নাগরিকত্ব দেওয়ার নাম করে। পশ্চিমবঙ্গে বাংলাভাষী মুসলমানদের ওপর একটা নতুন ধরনের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নামিয়ে এনে, গোটা ভারতে বাংলাভাষী মানুষ মানেই বাংলাদেশ থেকে আগত এবং রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সম্পর্কযুক্তÑ এমন একটা ভয়ংকর অপপ্রচার তারা করে চলেছে।

ভারতের নাগরিকত্ব আইন ঘিরে প্রশ্ন তোলাটা আরএসএসের রাজনৈতিক কর্মসূচির একটি অংশ। আরএসএসের এই প্রশ্ন তোলার লক্ষ্য কিন্তু কখনোই অন্য কোনো দেশ থেকে নানা রাজনৈতিক কারণে ভারতে আসা হিন্দুদের নাগরিকত্ব প্রধান ঘিরে নয়। নাগরিকত্ব আইন ঘিরে আরএসএস ভারতের স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকে তাদের রাজনৈতিক সংগঠন ভারতীয় জনসঙ্ঘ বা তার বিবর্তিত বর্তমান সংস্করণ ভারতীয় জনতা পার্টির মাধ্যমে যে ইস্যুগুলোকে প্রকাশ্যে আনে, সেই ইস্যুগুলি সঙ্ঘ তাদের সংগঠন এবং শাখা সংগঠনগুলোর মধ্য দিয়ে দেশজুড়ে প্রচার করে। এই ইস্যুর সমর্থনে একটা রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করে। আর সেই রাজনৈতিক মেরুকরণকেই তারা ব্যবহার করে সামাজিক মেরুকরণে।

এই দুই রকমের মেরুকরণের ফসল তারা তুলতে চায় তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির ভোটের বাক্সে। নাগরিকত্ব আইন ঘিরে আরএসএসের রাজনৈতিক কর্মসূচির এক এবং একমাত্র লক্ষ্য হলোÑ কিভাবে মুসলমান সম্প্রদায়কে ভারতে হয় নাগরিকত্বহীন অবস্থায় রাখতে পারা যায়, না হলে ভারতের নাগরিকদের মধ্যে শ্রেণীবিভাজন ঘটিয়ে, মুসলমান সমাজকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিককে পরিণত করতে পারা যায়।

ভারতের লোকসভা নির্বাচনের ঠিক মুখে যেভাবে সিএ নিয়ে দিল্লির বিজেপি সরকার আসরে নামল, তার পেছনেও কিন্তু একটা ধারাবাহিক কার্যক্রম আছে। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন গোটা দক্ষিণপন্থি রাজনৈতিক শিবির, বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশের নানা ধরনের তথাকথিত তত্ত্ব নিয়ে আসরে নামতো। এই অনুপ্রবেশ ঘিরে তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরির জন্য বহু সময় তারা বামপন্থিদের ভেতর থেকেও নানা ধরনের কলাকৌশলের ভিতর দিয়ে, কিছু কিছু বুদ্ধিজীবীদের সংগ্রহ করত।

বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ এবং মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি ঘিরে একেবারেই অবৈজ্ঞানিক এবং অসত্য তথ্যপূর্ণ একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গ্রন্থ রচনা করেছিলেন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ অধ্যাপক অমলেন্দু দে। তার গ্রন্থটি সেই, আট-নয়ের দশকেই বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ ঘিরে পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক পরিস্থিতিকে জটিল করবার কাজে, হিন্দুত্ববাদী শিবির ভয়ংকর রকমভাবে ব্যবহার করেছিল।

অমলেন্দু বাবুর গ্রন্থের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে, বিশিষ্ট বামপন্থি নেতা মানব মুখোপাধ্যায় একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। এটা দুর্ভাগ্যের বিষয় বলতে হয়, বামপন্থিরা তখনো হিন্দুত্ববাদী শিবির, এই তথাকথিত অনুপ্রবেশ তত্ত্ব ঘিরে, নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনের ভেতর দিয়ে, ভারতের সহ-নাগরিক মুসলমানদের নাগরিকত্ব হরণের যে দুরভিসন্ধি করেছে, সে সম্পর্কে সম্ভবত সম্যক ধ্যান-ধারণায় পৌঁছতে পারেনি। সেই কারণেই মানব বাবুর গ্রন্থটি ঘিরে, সেই সময়ে বামপন্থিদের যে সাংগঠনিক ক্ষমতা ছিল, তার ভিত্তিতে যেমন প্রচারের প্রয়োজন ছিল, সেই প্রচারটি কিন্তু হয়নি। ফলে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দু সমাজের একটা বড় অংশের ভিতরে হিন্দুত্ববাদী শক্তির বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ ইত্যাদি ঘিরে যে আজগুবি তথ্য এবং তত্ত্ব, তার প্রতি বিশ্বাসযোগ্যতাটা বেশি করে তৈরি হয়েছিল।

সিএএ ঘিরে লোকসভা ভোটের আগে বিজেপি তথা গোটা হিন্দুত্ববাদী শিবিরের যে তা-ব, সেটা কেবলমাত্র ভারতের নির্বাচনকে ঘিরে নয়। গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় সমস্ত ধরনের ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তি যাতে তাদের তা-ব করবার ক্ষমতা আরও বেশিভাবে অর্জন করে নিতে পারে, সেই লক্ষ্যটা সিএএ আইন জারির পেছনে হিন্দুত্ববাদীদের কোন অংশে কম নয়।

ভারতে বিজেপি সরকারের করা সিএএ আইন যে কেবলমাত্র ভারতের মুসলমান সমাজ এবং ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিকেই বিপদে ফেলতে চাইছে তা নয়। এই আইনের মধ্য দিয়ে একটা অংশের নিম্নবর্গীয় হিন্দু, যারা ভারত বা বাংলাদেশে অবস্থান করছেন, তাদের মুখ দিয়ে বাংলাদেশে মুসলমানের অত্যাচারের নানা ধরনের গল্প তৈরি করে ভারত-বাংলাদেশ এই দুই দেশেরই রাজনৈতিক এবং সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে চাইছে।

নিম্নবর্গীয় হিন্দুদের, বিশেষ করে যারা মতুয়া সম্প্রদায়ের আদর্শবোধ নিয়ে চলেন, তাদের নিজেদের মধ্যে নিজেদের লড়িয়ে দেওয়ার একটা বড় বিষয় হলো এই সিএএ আইন। দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে পড়া মতুয়া সম্প্রদায়ের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের বিষয়টি, না কেন্দ্রের বিজেপি সরকার নজর দিয়েছে, না রাজ্যের মমতা সরকার নজর দিয়েছে। বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেস, উভয়েই ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের উদ্দেশ্যে মতুয়া সম্প্রদায়কে ব্যবহার করেছে কেবলমাত্র ভোট ব্যাংক হিসেবে। এমনকি তাদের যে গুরুজনিত প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি আছে, সেই পদ্ধতিতেও নানা ধরনের বিবাদ-বিসংবাদ ঘটিয়ে, নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি করেছে।

সিএএ আইনে নিম্নবর্গীয়দের নাগরিকত্ব ঘিরে বিষয়টি এমন একটা জায়গায় হিন্দুত্ববাদীরা নিয়ে যেতে পেরেছে, যার দরুন উচ্চবর্গীয় হিন্দুদের ভেতর একটা বড় অংশ ইতোমধ্যেই ভাবতে শুরু করেছে যে, মুসলিম জাতীয়তার ওপর ভিত্তি করে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল। ঠিক তেমনভাবে জাতীয়তা, যাকে হিন্দুত্ববাদী শিবির ‘রাষ্ট্রবাদ’ বলে সম্মোধিত করে, সেই বিষয়টি এখন রাজনৈতিক হিন্দু চেতনার জাড়কে জাড়িত। ফলে ভারত থেকে নাগরিকত্ব হারিয়ে মুসলমান সমাজকে ভারত ছাড়তে হবে। আর ভারত হয়ে উঠবে রাজনৈতিক হিন্দুদের পৈতৃক সম্পত্তি।

এভাবেই পাকিস্তান এবং বিশেষ করে বাংলাদেশ যেখানে একটা বড় অংশের হিন্দু জনগোষ্ঠীর মানুষ আছেন, তাদের জীবন জীবিকার ক্ষেত্রেও একটা অনিশ্চয়তার পরিবেশ নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে বিজেপি করছে।

[লেখক : ভারতীয় ইতিহাসবিদ]

সম্প্রতি

আরও খবর